এবার আত্মহত্যার ঝুঁকির অজুহাতে হাসপাতালে আমিন হুদা

11

রোজিনা ইসলাম, ঢাকা
আপডেট: ৯ এপ্রিল ২০১৯, ১৩: ১০

• সাজার পর আমিন হুদা কারাগারে আছেন ছয় বছর ধরে
• প্রায় দুই বছর কাটিয়েছেন হাসপাতালের কেবিনে
• কখনো পিঠে ব্যথা, কখনো বুকে ব্যথার কথা বলেছেন
• ভিআইপি কেবিনের ভাড়া দিয়েছেন কোটি টাকার ওপরে
• টানা ১৯ মাস হাসপাতালে থাকারও নজির আছে
• সর্বশেষ হাসপাতালে যাওয়ার পর ৪৯ দিন পার হয়েছে

মাদক মামলায় ৭৯ বছরের সাজাপ্রাপ্ত সেই আমিন হুদা আবার হাসপাতালে এসেছেন। কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে ‘আত্মহত্যার ঝুঁকি’ এড়াতে ও বিষণ্নতা দূর করতে তাঁর চিকিৎসা দরকার।

কারাগার–সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, সাজা হওয়ার পর আমিন হুদা কারাগারে আছেন ছয় বছর ধরে। এর মধ্যে প্রায় দুই বছর (৭২০ দিন) কাটিয়েছেন হাসপাতালের কেবিনে অসুস্থতার নানা ছুতোয়। কখনো পিঠে ব্যথা, কখনো বুকে ব্যথার কথা বলেছেন। আমিন হুদা এই সময়ে কেবল হাসপাতালের ভিআইপি কেবিনের ভাড়াই দিয়েছেন ১ কোটি টাকার ওপরে। এর মধ্যে টানা ১৯ মাস হাসপাতালে থাকারও নজির আছে। সর্বশেষ হাসপাতালে যাওয়ার পর ৪৯ দিন পার হয়েছে।

আমিন হুদা এখন আছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের (বিএসএমএমইউ) প্রিজন সেলে। গত ১৯ ফেব্রুয়ারি তিনি এখানে এসেছেন। এবার কী রোগ নিয়ে তিনি এখানে এসেছেন, জানতে চাইলে আমিন হুদার রোগ নির্ণয়ে গঠিত মেডিকেল বোর্ড ও বিএসএমএমইউর মনোরোগ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান এম এম এ সালাউদ্দীন কাউসার গত রোববার রাতে প্রথম আলোকে বলেন, আমিন হুদার মধ্যে আত্মহত্যার চেষ্টা বা ঝুঁকি রয়েছে। এ ছাড়া তিনি বিষণ্নতায় ভুগছিলেন। তাই বোর্ডের সিদ্ধান্তে এখানে ভর্তি করা হয়েছে। তবে এখন আর এই অবস্থা নেই। তিনি এখন পুরোপুরি সুস্থ। দু-এক দিনের মধ্যে তাঁকে ছাড়পত্র দেওয়া হবে।

তবে কারাগারের কর্মকর্তা ও কারা চিকিৎসকদের সূত্র জানায়, তারা আমিন হুদার এ সমস্যার কথা জানে না। তাদের মতে, বোর্ড গঠন করে রোগ নির্ণয় করতেই তাঁকে হাসপাতালে রাখা হয়েছে। এর বেশি কিছু তাদের জানা নেই।

ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার ও হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, বারডেম হাসপাতালে কারাবন্দীদের রাখার নিয়ম নেই। কিন্তু এর আগে মাসের পর মাস সেখানে থেকেছেন সাজাপ্রাপ্ত ওই আসামি। কারা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সালের ১৩ জানুয়ারি প্রথম আমিন হুদাকে বারডেম হাসপাতালে নেওয়া হয়। তখন টানা এক মাস ছিলেন। এরপর ২০১৫ সালের ২৬ নভেম্বর থেকে ২০১৭ সালের ৭ মে পর্যন্ত প্রায় ১৮ মাস এবং ২০১৭ সালের ২২ জুন থেকে এক মাস দশ দিন একই তিনি হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে কারাবাস করেছেন। এরপর ২০১৮ সালের ৫ মার্চ থেকে ২৯ মার্চ (২৫ দিন) পর্যন্ত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে, ২৯ আগস্ট থেকে ১৪ নভেম্বর পর্যন্ত (২ মাস ১৭ দিন) বিএসএমএমইউতে ছিলেন।

আমিন হুদার হাসপাতালে ভর্তির জন্য সব সময়ই সুপারিশ করেছেন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে সম্প্রতি প্রত্যাহার হওয়া চিকিৎসক বিপ্লব কান্তি বিশ্বাস। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ২০১৩ সালে কারাগারে আসার পর আমিন হুদা নানা রোগের কারণে বাইরের হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য গেছেন। কারণ, কারাগারের ভেতরে ওসব চিকিৎসা দেওয়ার যন্ত্রপাতি নেই।

২০০৭ সালের ২৪ অক্টোবর মাদকসহ গ্রেপ্তার হন আমিন হুদা ও তাঁর সহযোগী আহসানুল হক ওরফে হাসান। এরপর গুলশানে তাঁর একটি ফ্ল্যাট থেকে ইয়াবা তৈরির সরঞ্জাম, উপাদানসহ বিপুল পরিমাণ ইয়াবা উদ্ধার করে র‍্যাব। ওই ঘটনায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে দুটি মামলা হয়। দুই মামলায় ২০১২ সালের ১৫ জুলাই আদালতের রায়ে আমিন হুদা ও তাঁর সহযোগী আহসানুল হকের বিভিন্ন ধারায় মোট ৭৯ বছর করে সশ্রম কারাদণ্ডাদেশ হয়। একই সঙ্গে জরিমানার আদেশও দেওয়া হয়। এরপর রায়ের বিরুদ্ধে আমিন হুদা হাইকোর্টে আপিল করে জামিন চান। ২০১৩ সালে হাইকোর্ট তাঁকে জামিন দেন। এর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ আবেদন করলে ওই বছরের ৫ মে আপিল বিভাগ জামিন বাতিল করে তাঁকে আত্মসমর্পণ করতে ও হাইকোর্টে আপিল নিষ্পত্তির জন্য নির্দেশ দেন। এরপর থেকে তিনি কারাগারে।

হাসপাতাল ও কারাগারের একাধিক কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, আমিন হুদা নানাভাবে প্রভাব খাটিয়ে কারাবাসের পরিবর্তে ঘুরেফিরে হাসপাতালে থাকেন। তাঁর কাছে সব সময় দর্শনার্থী, বন্ধু ও স্বজনেরা আসা-যাওয়া করছেন।

মাদক মামলায় সাজাপ্রাপ্ত এমন একজন আসামির প্রায় দুই বছর বিভিন্ন হাসপাতালে কাটানোর বিষয়ে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা চিকিৎসকদের কাছে জানতে চাইব কেন তাঁকে বারবার হাসপাতালে নেওয়া হয়। আমিন হুদা একজন বিতর্কিত আসামি। দেশে ইয়াবা ছড়িয়ে পড়ার জন্য আমিন হুদার দায় রয়েছে। বিষয়টি ভেবে তাঁকে সুযোগ-সুবিধা দেওয়া উচিত।’