মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় অনিয়ম, স্থগিত

323

রোজিনা ইসলাম, ঢাকা১২ মার্চ ২০১৮, ১৬:৩০ 
আপডেট: ১২ মার্চ ২০১৮, ১৬:৫০

•মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করতে আবেদন জমা পড়ে দেড় লাখ 
•যাচাই-বাছাই করে জামুকায় নাম পাঠানো হয় প্রায় ২৫ হাজার 
•এসব আবেদনের অধিকাংশ তথ্যই ভুল

মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ার প্রয়োজনীয় তথ্য না থাকাসহ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ মেনে নিয়েই মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা তৈরির প্রক্রিয়া স্থগিত করেছে সরকার। দেশের জেলা-উপজেলা থেকে যাচাই-বাছাই কমিটি যেসব তালিকা পাঠিয়েছে, তা ত্রুটিপূর্ণ ও অসম্পূর্ণ হওয়ায় গতকাল রোববার আকস্মিক এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এ কাজের জন্য সংশ্লিষ্ট মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানী ও আনুষঙ্গিক খরচ বাবদ মন্ত্রণালয় সোয়া চার কোটি টাকা বরাদ্দ করেছিল।

দেশে এখন মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা দুই লাখের বেশি। মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করতে অনলাইনে ও সরাসরি আরও দেড় লাখ আবেদন জমা পড়ে। তাঁদের মধ্যে স্থানীয় পর্যায়ে যাচাই-বাছাই করে প্রায় ২৫ হাজার নাম পাঠানো হয়। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় হাজার পাঁচেক ব্যক্তির নাম মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতে চেয়েছিল।২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসের আগে নতুন মুক্তিযোদ্ধাদের নাম ঘোষণার কথা ছিল। প্রথম আলোসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের কাছে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক এ তালিকা প্রকাশের কথা বলেন।

গতকাল জানতে চাইলে আ ক ম মোজাম্মেল হক মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই কমিটির সব কার্যক্রম স্থগিত করার বিষয়টি নিশ্চিত করে প্রথম আলোকে বলেন, জেলা-উপজেলা থেকে যেসব প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে, তা বিবেচনার যোগ্য বলে মনে হয়নি। কেন একজন ব্যক্তিকে মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, প্রতিবেদনে তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি।

কবে নাগাদ যাচাই-বাছাই আবার শুরু হবে-জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, এসব প্রতিবেদন সঠিকভাবে না আসা পর্যন্ত এটা বলা যাবে না।

তবে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে জানান, নতুনভাবে যাচাই-বাছাই করা ছাড়া আর কোনো পথ সরকারের সামনে নেই।

পর্যালোচনায় দেখা যায়, নতুন সরকার এলেই মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা পরিবর্তন হয়, বেড়ে যায় সংখ্যাও। ৪৭ বছরে ছয়বার মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা সংযোজন-বিয়োজন হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধার বয়স, সংজ্ঞা ও মানদণ্ড ১১ বার পাল্টেছে। সর্বশেষ গত ১৬ জানুয়ারি মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার বয়সসীমা ছয় মাস কমানো হয়। অর্থাৎ সাড়ে ১২ বছরের গেজেটভুক্ত সবাই মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পাবেন।

মুক্তিযোদ্ধাদের বয়স নিয়ে এ সিদ্ধান্তের আগে গত বছরের ১২ জানুয়ারি মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাইয়ে কমিটি করার গেজেট প্রকাশ করা হয়। এসব কমিটিতে স্থানীয় সাংসদ, মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধি, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ মন্ত্রণালয় বা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিলের প্রতিনিধি ছিলেন। ৪৭২টি উপজেলা ও ৮টি মহানগর কমিটি কাজ শুরু করে ওই বছরের ২১ জানুয়ারি। এর মধ্যে ৩৬৫টি কমিটি প্রতিবেদন দিয়েছে, বাকি প্রতিবেদনগুলো জমা পড়েনি।

জমা হওয়া প্রতিবেদন পর্যালোচনার জন্য জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের (জামুকা) মহাপরিচালককে আহ্বায়ক করে কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটি গতকাল জামুকার সভায় জানিয়ে দিয়েছে, প্রতিবেদন ও তালিকা আরও পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

স্বাধীনতার ৪৭ বছর পর নতুন করে মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা তৈরির প্রক্রিয়া শুরুর পর থেকেই নানামুখী অনিয়মের খবর প্রকাশ পেতে থাকে। একের পর এক অভিযোগ আসতে থাকে মন্ত্রণালয়ে ও জামুকায়। কেউ কেউ কমিটির বিরুদ্ধে অভিযোগ এনে মামলাও করেছেন। প্রথম দিকে এসব খবর বা অভিযোগ আমলেই নেয়নি মন্ত্রণালয় বা জামুকা। কিন্তু মাঠের তালিকা পর্যালোচনা করতে গিয়ে গতকাল জামুকা মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই কমিটির কাছ থেকে পাওয়া প্রতিবেদনগুলোতে নানা অসংগতি খুঁজে পায়।

জামুকার মহাপরিচালক মিজানুর রহমান গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, কমিটিগুলো শুধু সুপারিশ করেই দায়িত্ব শেষ করেছে। কিন্তু কেন একজনকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সুপারিশ করল, তার ব্যাখ্যা নেই।

জামুকা সূত্র জানায়, প্রতিবেদনে কমিটির সব সদস্যের স্বাক্ষর নেই, মুক্তিযুদ্ধ করার প্রমাণ নেই, বয়স প্রমাণের সনদ নেই, যে ছকে তথ্য দেওয়ার কথা, তা যথাযথভাবে পূরণ করা হয়নি, কমিটির সভার কার্যবিবরণী নেই, কিছু কিছু এলাকার তালিকায় অস্বাভাবিক সংখ্যায় ব্যক্তির নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই কমিটির সভাপতি তোবারক হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের যেভাবে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল, আমরা সেভাবেই পাঠিয়েছি। বয়স প্রমাণ করার বিষয়টি কিছুটা জটিল। কেউ ভোটার আইডি কার্ড দিয়েছে, কেউবা দিয়েছে এসএসসির সনদ।’

ময়মনসিংহ সদর ও গৌরীপুর মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই কমিটির সভাপতি ও স্থানীয় সাংসদ নাজিম উদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘অনিয়ম এক শতাংশ হলেও হতে পারে। কিন্তু আমরা যা করেছি, তা সব সদস্যের সুপারিশেই করেছি।’

এ ছাড়া কমিটির ওপর চাপ প্রয়োগ ও অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে নাম অন্তর্ভুক্ত করার অভিযোগ এসেছে জামুকায়।

একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির প্রথম আলোকে বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার ১০ বছর ক্ষমতায় থাকার পরও মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই তালিকা চূড়ান্ত করতে না পারাটা দুঃখজনক। এটা তেমন কঠিন কাজ ছিল না। তিনি বলেন, ‘আমরা প্রথম থেকেই বলে আসছি, আমলানির্ভর তালিকা প্রণয়ন কখনোই সম্ভব নয়। এ যাচাই-বাছাই করতে গিয়ে যে অনিয়ম-দুর্নীতি হয়েছে, সে জন্য আমরা লজ্জিত।’

শাহরিয়ার কবির আরও বলেন, রাষ্ট্রীয় অর্থ, এত মানুষের শ্রম ও সময় খরচের পরও মুক্তিযোদ্ধাদের নির্ভুল তালিকা প্রণয়ন করা গেল না, এটা খুবই দুঃখজনক।