বিধি সংশোধন করে বরাদ্দের আবেদন- নিজের টেলিভিশন চ্যানেলের জন্য প্লট চান সাংসদ

644
রোজিনা ইসলাম ও মামুনুর রশীদ
১৮ মার্চ ২০১৭, ০২:০০

নিজের টেলিভিশন চ্যানেলের জন্য জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের একটি প্রাতিষ্ঠানিক প্লট বরাদ্দ চেয়েছেন ঢাকা-১৫ আসনের সাংসদ ও বেসরকারি টিভি চ্যানেল মোহনা টেলিভিশনের চেয়ারম্যান কামাল আহমেদ মজুমদার। তবে গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের বরাদ্দ নির্দেশিকায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক প্লট বরাদ্দ দেওয়ার বিধান নেই।
কামাল মজুমদার একই সঙ্গে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং একই কমিটি কর্তৃক গঠিত ২ নম্বর উপকমিটির আহ্বায়ক। এই কমিটির অন্যতম কাজ হলো ভূমি বরাদ্দের ক্ষেত্রে অনিয়ম অনুসন্ধান ও তা মূল কমিটিকে অবহিত করা।
রাজধানীর মিরপুরে রূপনগর আবাসিক এলাকার ১০ ও ১১ নম্বর সড়কের মধ্যবর্তী স্থানে জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের এক নম্বর প্রাতিষ্ঠানিক প্লটটির আয়তন প্রায় দুই বিঘা। ২০১৪ সালের মে মাসে প্লটটি মোহনা টেলিভিশনের নামে বরাদ্দের জন্য কামাল মজুমদার গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ বরাবর আবেদন করেন।
জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের ২০০৮ সালের বরাদ্দ নির্দেশিকায় বলা আছে, ‘সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো স্ব স্ব মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পেশ করবেন। মন্ত্রণালয় থেকে প্রস্তাব পাওয়ার পর বোর্ড সভা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।’
গত বছরের ১৭ নভেম্বর গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির ২ নম্বর উপকমিটির একটি বৈঠকের ৪ নম্বর আলোচ্যসূচি ছিল, ‘মোহনা টেলিভিশনের নামে প্লট বরাদ্দে বিলম্বের কারণ সম্পর্কে আলোচনা’। বিলম্বের কারণসংবলিত ব্যাখ্যায় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে বলা হয়, কামাল আহমেদ মজুমদারের আগেই রূপনগর লিটল অ্যাঞ্জেলস প্রাইমারি স্কুল নামের একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তাদের অনুকূলে ১ নম্বর প্রাতিষ্ঠানিক প্লটটি বরাদ্দ দেওয়ার জন্য আবেদন করে। কিন্তু বরাদ্দ নির্দেশিকায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে প্রাতিষ্ঠানিক প্লট বরাদ্দের নির্দেশনা থাকায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির নামে এটি বরাদ্দ দেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে মোহনা টেলিভিশনের অনুকূলে প্লট বরাদ্দের বিষয়ে প্রশাসনিক মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত জানতে চেয়ে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়। এতে বলা হয়, মোহনা টেলিভিশনের অনুকূলে প্লটটি বরাদ্দ দিতে হলে বরাদ্দ নির্দেশিকায় এ-সংক্রান্ত বিধান সংশোধন করা প্রয়োজন।
জানতে চাইলে জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান খন্দকার আখতারুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, ‘বরাদ্দ বিধি সংশোধন না করে মোহনা টেলিভিশনকে প্রাতিষ্ঠানিক প্লট দেওয়ার কোনো সুযোগ না থাকার বিষয়টি আমরা মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছি। মন্ত্রণালয় করণীয় ঠিক করবে।’
তবে বিধি সংশোধন করে হলেও মোহনা টেলিভিশনের নামে প্লট বরাদ্দের জন্য চাপ থাকার কথা জানিয়েছেন গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের একাধিক কর্মকর্তা। অভিযোগ অস্বীকার করে কামাল আহমেদ মজুমদার গত সোমবার প্রথম আলোকে বলেন, ‘চাপ দেব কেন? এটার জন্য তথ্য মন্ত্রণালয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়েছে। তারা অন্যান্য চ্যানেলকে প্লট বরাদ্দ দিচ্ছে। তাহলে মোহনাকে দেবে না কেন?’
তবে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বিএনপি সরকারের সময়ে কয়েকটি গণমাধ্যম প্লট পেয়েছিল। সেগুলো ছিল বাণিজ্যিক প্লট, প্রাতিষ্ঠানিক প্লট ছিল না।
রূপনগরের তিনটি প্রাতিষ্ঠানিক প্লটের দুটিই মনিপুর স্কুল অ্যান্ড কলেজের নামে বরাদ্দ। জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের নকশা অনুসারে রূপনগর আবাসিক এলাকার তিনটি প্রাতিষ্ঠানিক প্লট একই সারিতে অবস্থিত। এর মধ্যে ২ ও ৩ নম্বর প্রাতিষ্ঠানিক প্লটের ওপর গড়ে উঠেছে মনিপুর উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজের ১ নম্বর শাখা। ৪ বিঘা আয়তনের ২ নম্বর প্রাতিষ্ঠানিক প্লটটি প্রতিষ্ঠানটির নামে বরাদ্দ দেওয়া হয় ১৯৯৯ সালের জুন মাসে। একই প্রতিষ্ঠানের নামে ৩(এ) নম্বর প্লটের ৩৬ দশমিক ১৬ কাঠা জায়গা বরাদ্দ দেওয়া হয় ২০১২ সালের মার্চে। সাংসদ কামাল আহমেদ মজুমদার মনিপুর উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজের প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রতিষ্ঠানটির গভর্নিং বডির সভাপতি। ৩ নম্বর প্লটটির কিছু অংশ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষা ও পুনর্বাসনের জন্য গঠিত সংগঠন ব্লাইন্ড এডুকেশন অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের (বিইআরডিও) নামে।
সরেজমিনে দেখা যায়, ৩ ও ২ নম্বর প্লটের পাশে প্রায় দুই বিঘা আয়তনের এক নম্বর প্রাতিষ্ঠানিক প্লটে অবৈধভাবে গড়ে উঠেছে শতাধিক কাঁচা-পাকা ঘর। আছে বেশ কয়েকটি দোকান ও ‘মুক্তিযোদ্ধা বহুমুখী সমবায় সমিতি লিমিটেড’-এর কার্যালয়।
একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবে বিধি সংশোধন করে সরকারি প্লট বরাদ্দ নেওয়ার এই চেষ্টার বিষয়টিকে ‘অনৈতিক ও ক্ষমতার অপব্যবহার’ হিসেবে দেখছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, একই সঙ্গে বিষয়টি স্বার্থের দ্বন্দ্বপ্রসূত। সাংসদ নিজে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য। জনপ্রতিনিধি হিসেবে তাঁর কাছ থেকে এ ধরনের আচরণ কোনোভাবেই আশা করা যায় না।