জেলে বসে ছাত্রলীগ নেতাকে হত্যার নির্দেশ সাংসদের

835
সাংসদ আমানুর, ছাত্রলীগ নেতা সাঈদ

আদালতে এক আসামির স্বীকারোক্তি, পুলিশ সদর দপ্তরের বিশেষ প্রতিবেদন

রোজিনা ইসলাম | ১৩ জানুয়ারি ২০১৭, ০৩:০১  

সাংসদ আমানুর রহমান খান ওরফে রানা কারাগারে বসেই টাঙ্গাইলের এক ছাত্রলীগ নেতাকে হত্যার পরিকল্পনা করেছেন। এরপর সাংসদের নির্দেশেই এলাকায় তাঁরই ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত অস্ত্রধারীরা ঘাটাইল ব্রাহ্মশাসন গণবিশ্ববিদ্যালয় (জিবিজি) কলেজ ছাত্রসংসদের সহসভাপতি (ভিপি) ছাত্রলীগের নেতা আবু সাঈদ ওরফে রুবেলকে হত্যার জন্য হামলা চালায়। এই হত্যাচেষ্টার মামলায় গ্রেপ্তার এক আসামি আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে এই স্বীকারোক্তি দিয়েছেন। পুলিশ সদর দপ্তর এ ব্যাপারে একটি ‘বিশেষ প্রতিবেদন’ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে।
টাঙ্গাইল-৩ আসনের আওয়ামী লীগের সাংসদ আমানুর রহমান খান এলাকার আলোচিত একটি হত্যা মামলার অভিযোগপত্রভুক্ত আসামি হিসেবে চার মাস ধরে কারাগারে আছেন। এলাকায় অত্যন্ত প্রভাবশালী ও দাপুটে হিসেবে খান পরিবারের পরিচিতি রয়েছে।
গত বছরের ৯ নভেম্বর রাতে ঘাটাইল এলাকায় অস্ত্রধারীরা ছাত্রলীগের নেতা আবু সাঈদের ওপর হামলা চালায়। গুরুতর জখম আবু সাঈদকে প্রথমে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এখন পঙ্গু অবস্থায় তিনি নিজ বাসায় ফিরে গেছেন।
ঘটনার পরদিন ১০ নভেম্বর ১৭ জনকে আসামি করে মামলা করা হয়। আসামিরা সবাই সাংসদ আমানুরের ঘনিষ্ঠ সহযোগী। পুলিশ ঘাটাইল থেকে আ. জুব্বার ওরফে বাবু, আদালতে হাজিরা দিতে যাওয়ার সময় ছাত্রলীগের নেতা আতিকুর রহমান এবং মধুপুর থেকে যুবলীগের নেতা আজিজুল হক রুনুকে গ্রেপ্তার করে। জুব্বার সাংসদ আমানুরের ঘাটাইল উপজেলা সদরের স মিল রোডের বাড়িটি দেখাশোনা করতেন। আতিকুর ও আজিজুলও সাংসদ আমানুরের ঘনিষ্ঠ বলে এলাকায় পরিচিত।
পুলিশের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, জুব্বার ২০ ডিসেম্বর টাঙ্গাইলের জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম শেখ সামিদুল ইসলামের আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে বলেছেন, সাংসদ আমানুরের নির্দেশেই তাঁরা ছাত্রলীগের নেতা আবু সাঈদের ওপর হামলা করেন। কারাগারে সাংসদ আমানুরের সঙ্গে সাক্ষাতে এবং তাঁর ঘাটাইলের বাসায় বসে কয়েক দফায় হামলার পরিকল্পনা করা হয়।
হামলার শিকার আবু সাঈদ গতকাল বৃহস্পতিবার প্রথম আলোকে বলেন, সাংসদ আমানুরের বিরোধী প্যানেল থেকে জিবিজি কলেজ ছাত্রলীগের নেতা নির্বাচিত হওয়ায় প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে সাংসদ তাঁর লোকজন দিয়ে হামলা করেছেন। ধারালো অস্ত্র দিয়ে তাঁর ওপর ৩৮টি আঘাত করা হয়েছে। তাঁর হাতের দুটি আঙুল কেটে ফেলে হামলাকারীরা। সাঈদ এখন হাঁটতে পারেন না, হুইলচেয়ারে চলাফেরা করেন।
স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতা মুক্তিযোদ্ধা ফারুক আহমেদ হত্যা মামলার আসামি সাংসদ আমানুর দীর্ঘদিন পলাতক থাকার পর গত বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর আদালতে আত্মসমর্পণ করেন। একই মামলার আসামি তাঁর তিন ভাই টাঙ্গাইল পৌরসভার সাবেক মেয়র সহীদুর রহমান খান ওরফে মুক্তি, ব্যবসায়ী নেতা জাহিদুর রহমান খান ওরফে কাঁকন এবং কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি সানিয়াত খান ওরফে বাপ্পা গা ঢাকা দিয়ে আছেন।
পুলিশের প্রতিবেদনে বলা হয়, জুব্বার তাঁর জবানবন্দিতে জানিয়েছেন, সাংসদ আমানুরের সঙ্গে কাশিমপুর কারাগারে দেখা করতে গেলে তিনি ছাত্রলীগের নেতা আবু সাঈদকে কিছু করতে না পারার কারণে তাঁদের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করেন। পরে আরেক দিন দেখা করতে গেলে তাঁর সহযোগী খোরশেদ আলমকে দিয়ে ‘কাজটা’ (হামলা ও হত্যা) করতে বলেন। এরপর সাংসদ আমানুরের ঘাটাইলের বাড়িতে চার দিন ধরে হত্যার পরিকল্পনা হয়। ওই বৈঠকে জুব্বার ছাড়াও আজিজুল হক, খোরশেদ, পিচ্চি সেলিম উপস্থিত ছিলেন।
পুলিশ সদর দপ্তর থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো ‘এক বিশেষ প্রতিবেদনে’ এই জবানবন্দি যুক্ত করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিবের কাছে পাঠানো এই প্রতিবেদনে আবু সাঈদকে কুপিয়ে হত্যাচেষ্টার পেছনের কারণ তুলে ধরে এ বিষয়ে করণীয় কী জানতে চাওয়া হয়েছে।
জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘কারাগারে বসে সাংসদ যদি এমন সন্ত্রাসী কার্যক্রম করেন, তবে অবশ্যই তাঁর বিরুদ্ধে আমরা আরও কঠোর হব। তিনি যতই চেষ্টা করুন না কেন, তাঁকে ছাড় দেওয়া হবে না। আর প্রমাণিত হলে এ ঘটনায় তাঁর বিরুদ্ধে অবশ্যই মামলা হবে।’
ঘাটাইল উপজেলা আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ এই হামলার জন্য স্থানীয় সাংসদ আমানুরের অনুসারীদের দায়ী করে। ঘটনার পরপরই তারা টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ সড়কের ঘাটাইল সদর এলাকা এক ঘণ্টা অবরোধ করেছিল।
ঘাটাইল উপজেলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক শহীদুল ইসলাম গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ছাত্রলীগের নেতা আবু সাঈদ এলাকায় সাংসদ আমানুরের একচ্ছত্র প্রভাবের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন বলেই তিনি তাঁকে হত্যার চেষ্টা করেন। আবু সাঈদকে সরিয়ে দিতে পারলে এলাকায় তাঁর বিরুদ্ধে কথা বলার আর কেউ থাকবে না।
কারাগারে বসে সাংসদ কীভাবে এসব পরিকল্পনা করেছেন, জানতে চাইলে কাশিমপুর-১ কারাগারের জ্যেষ্ঠ কারা তত্ত্বাবধায়ক সুব্রত কুমার বালা প্রথম আলোকে বলেন, ‘সাংসদ প্রথম শ্রেণির মর্যাদাপ্রাপ্ত আসামি। কখন কে আসেন, কার সঙ্গে কী পরিকল্পনা করেন, সেটা শোনার বা জানার আমাদের এখতিয়ার নেই। তবে তাঁর কাছে অনেক লোক আসেন এটা সঠিক। আমরা চেষ্টা করি দৃষ্টির সীমানার মধ্যে রাখতে।’
পুলিশের ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বর্তমানে ঘাটাইল উপজেলা আওয়ামী লীগের নেতারা দুটি দলে বিভক্ত হয়ে পৃথকভাবে দলীয় কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। একটি গ্রুপের নেতৃত্ব দিচ্ছেন ঘাটাইল উপজেলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক শহিদুল ইসলাম লেবু। অপরটির নেতৃত্বে আমানুর রহমান খান।
জবানবন্দিতে যা বলা হয়েছে
জবানবন্দিতে জুব্বার বলেন, সাংসদের নির্দেশে আবু সাঈদকে হত্যার জন্য কয়েক দফা চেষ্টা চালানো হয়। হামলার আগে রাতে সাংসদ আমানুরের বাসায় খোরশেদ, আতিক, পিচ্চি সেলিম, আজিজুল ও খোরশেদের দুই সহযোগী বৈঠক করে হত্যার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেন।
জবানবন্দিতে জুব্বার বলেন, ‘পরিকল্পনা অনুযায়ী খোরশেদ গরু কাটার পাঁচটি ছুরি নিয়ে মোটরসাইকেলে করে তাঁর একজন সহযোগীসহ আগেই ঘটনাস্থলে চলে যান। অন্যরা রিকশায় ও হেঁটে যান। আমি ও পিচ্চি সেলিম পরিকল্পনা অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন সময়ে ওয়াজের মাঠে পৌঁছাই। আমাদের দায়িত্ব ছিল রুবেল (আবু সাঈদ) বের হলে তাঁদের জানানো।’
সাংসদ আমানুর কারাগারে থাকায় এ ব্যাপারে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে তাঁর আইনজীবী আবদুল বাকী বলেন, সাংসদ যে মামলার আসামি, তিনি সেই মামলা সম্পর্কে খোঁজ রাখেন। আবু সাঈদ হত্যাচেষ্টা মামলা সম্পর্কে তিনি কিছু জানেন না।