৩ বছরে ৩৯ কর্মকর্তা–কর্মচারী বরখাস্ত

709

*বেশি অভিযোগ দুর্নীতির

* দুদকের মামলা সাতটি

রোজিনা ইসলাম ও মুসা আহমেদ | আপডেট: ০১:৫৯, নভেম্বর ০৬, ২০১৬ | প্রিন্ট সংস্করণ

বিভিন্ন অভিযোগে গত তিন বছরে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ৩৯ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। বর্তমানে ২৭ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী বরখাস্ত রয়েছেন। এর মধ্যে ছয়জনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) করা সাতটি মামলা চলমান রয়েছে।

ডিএসসিসির নথিপত্রে দেখা যায়, ক্ষমতার অপব্যবহার, নিজ ও অন্যকে লাভবান করে ডিএসসিসির জায়গা অবৈধ বরাদ্দ ও মার্কেট নির্মাণ করে অর্থ আত্মসাৎ, দোকান বরাদ্দে অনিয়ম, রাজনৈতিক দলের মিছিল-মিটিংয়ে অংশগ্রহণ, জাল সনদ নিয়ে চাকরি, বর্জ্য অপসারণে গাফিলতি ও দায়িত্ব পালনে অবহেলা এবং অসদাচরণের কারণে তাঁদের বিরুদ্ধে ওই ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এ ছাড়া তাঁদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা চলমান রয়েছে। ২০১৩ সালের জুন থেকে গত ১৬ আগস্ট পর্যন্ত তাঁদের বিরুদ্ধে এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়৷

ডিএসসিসির বরখাস্ত হওয়া কর্মকর্তারা হলেন সম্পত্তি বিভাগের সার্ভেয়ার আলী আহাম্মদ, বাচ্চু মিয়া, ফারুক হোসেন, মোতালেব হোসেন, কানুনগো মোহাম্মদ আলী, ট্রেসার আবু শাহাদত মো. সারেন, ফুলবাড়িয়া বাস টার্মিনালের সহকারী ব্যবস্থাপক মোহসীন উদ্দিন মোড়ল ও তত্ত্বাবধায়ক গোলাম ছরোয়ার, পরিবহন দপ্তরের স্টেনোগ্রাফার মহাব্যবস্থাপক মতিয়ার রহমান, অঞ্চল-৫-এর স্বাস্থ্য বিভাগের ইপিআই তত্ত্বাবধায়ক আবদুল কুদ্দুস চৌধুরী, স্প্রেম্যান শরীফ হোসেন ও অঞ্চল-৫-এর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের পরিচ্ছন্ন পরিদর্শক আসিফ হোসেন, অঞ্চল-২-এর সহকারী সমাজকল্যাণ কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলী, কর সার্কেল-১-এর নিম্নমান সহকারী কাম-মুদ্রাক্ষরিক তৈয়বুর রহমান, ভান্ডার ও ক্রয় বিভাগের সহকারী ভান্ডার ও ক্রয় কর্মকর্তা লিয়াকত হোসেন, ভান্ডাররক্ষক বিনোদ চন্দ্র সরকার, নিম্নমান সহকারী কাম-মুদ্রাক্ষরিক রফিকুল ইসলাম, অভ্যন্তরীণ অডিট বিভাগের অডিটর বেগম ফারজানা নাসরিন।

ওই কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে আলী আহাম্মদ, মোহসীন উদ্দিন মোড়ল, মোহাম্মদ আলী, বাচ্চু মিয়া, ফারুক হোসেন, মোতালেব হোসেনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় পৃথক মামলা করেছে দুদক। আলী আহাম্মদের বিরুদ্ধে নিম্ন আদালত ও দুদকে পৃথক দুটি মামলা রয়েছে৷

জানতে চাইলে ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা খান মোহাম্মদ বিলাল গতকাল শনিবার প্রথম আলোকে বলেন, প্রতিটি ঘটনায় একটি করে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল৷ এই কমিটির প্রতিবেদন অনুযায়ী অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে৷ তবে প্রতিবেদন সন্দেহ হলে কিছু ক্ষেত্রে পুনরায় তদন্ত করা হয়৷ আইন অনুযায়ী দোষী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে৷

ডিএসসিসি সূত্র জানায়, ২৩ জুন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির ১২তম বৈঠকে ডিএসসিসির বরখাস্ত হওয়া ওই কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি তালিকা তৈরির নির্দেশনা দেওয়া হয়। এর মধ্যে আগে যাঁদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা ছিল না, তাঁদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে মামলার নির্দেশনাও দেওয়া হয়৷ পরে গত ১৮ আগস্ট ওই ৩৯ জনের একটি তালিকা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়৷ এই সময়ের মধ্যে তিন কর্মচারীর বিরুদ্ধে করা বিভাগীয় তিনটি মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে।

কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অপরাধের ধরন ও বরখাস্ত: ক্ষমতার অপব্যবহার করে ডিএসসিসির মালিকানাধীন নর্থ সাউথ রোডের পাশে ১ হাজার ৩২ বর্গফুট জায়গায় অস্থায়ী বরাদ্দপত্রের শর্ত লঙ্ঘন করে অবকাঠামো নির্মাণের অনুমতি দেন সম্পত্তি বিভাগের সার্ভেয়ার আলী আহাম্মদ। এই অপরাধে ২০১২ সালের ১২ জুলাই তাঁর বিরুদ্ধে বংশাল থানায় একটি মামলা করে দুদক। পরে ২০১৩ সালের ১৮ জুন তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত করে ডিএসসিসি। এর আগে ২৯ জানুয়ারি তাঁর বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। এ ছাড়া ২০১৪ সালের ২৪ আগস্ট এক অপরাধীর পক্ষে আদালতে হাজিরা দিতে গিয়ে তিনি ধরা পড়েন। এই অপরাধে তাঁর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করা হয়।

২০১৪ সালে বঙ্গবাজার ও ঢাকা ট্রেড সেন্টারের দোকান বরাদ্দের নথির নোটশিট অবৈধভাবে পরিবর্তন ও দুর্নীতি করায় ফুলবাড়িয়া বাস টার্মিনালের সহকারী ব্যবস্থাপক মোহসীন উদ্দিন মোড়ল, সম্পত্তি বিভাগের কানুনগো মোহাম্মদ আলী, সার্ভেয়ার বাচ্চু মিয়া ও ফারুক হোসেনের বিরুদ্ধে পৃথক মামলা করে দুদক। ওই বছরই তাঁদের সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। এভাবে ওই কর্মকর্তারা বিভিন্ন অনিয়ম করেছিলেন৷

অভিযোগ থেকে অব্যাহতি ও সতর্ক: বিভিন্ন অভিযোগে বাজার শাখা-৩-এর রেন্ট অ্যাসিস্ট্যান্ট আছমত আলী, অঞ্চল-৫-এর রাজস্ব বিভাগের কর কর্মকর্তা মো. ইকবাল আহমেদ, অঞ্চল-১-এর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের পরিচ্ছন্ন পরিদর্শক শফিকুল ইসলাম, পরিবহন বিভাগের ব্যবস্থাপক খোন্দকার মিল্লাতুল ইসলামসহ নয় কর্মকর্তাকে বিভাগীয় মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়৷ বিভিন্ন অভিযোগে তাঁরা প্রত্যেকে সাময়িক বহিষ্কৃত ছিলেন৷ বর্তমানে তাঁরা বিভিন্ন বিভাগে কর্মরত রয়েছেন৷

বিভাগীয় মামলা চলমান: বর্তমানে জনসংযোগ বিভাগের ভিডিও ক্যামেরাম্যান আবদুল্লাহ আল করিম, অঞ্চল-৩-এর হিসাব সহকারী ইলিয়াস চৌধুরী, উপ-কর কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন, কর কর্মকর্তা আবুল খায়েরসহ আরও নয় কর্মকর্তার বিরুদ্ধে পৃথক বিভাগীয় মামলা চলমান রয়েছে৷ তাঁরা প্রত্যেকে সাময়িক বহিষ্কৃত রয়েছেন৷