সংসদীয় কমিটির প্রতিবেদন~ গুলশান লেকে ওয়াসার প্রকল্পে কাজ হয়নি

671
রোজিনা ইসলাম ও সামছুর রহমান | আপডেট: ০১:৫৭, নভেম্বর ০৩, ২০১৬ | প্রিন্ট সংস্করণ

গুলশান-বাড্ডা লিংক রোড অংশের গুলশান লেকে এভাবেই ফেলা হচ্ছে ময়লা–আবর্জনা। ছবিটি গতকাল সকালে তোলা l প্রথম আলোগুলশান-বারিধারা লেক সরাসরি পয়োবর্জ্য এবং মানুষের তৈরি অন্যান্য বর্জ্যের মাধ্যমে দূষিত হচ্ছে। গুলশান-বারিধারা লেকের দূষণ রোধে ঢাকা ওয়াসার নেওয়া ৫০ কোটি টাকার প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পরে তা সফল হয়নি। ঢাকা ওয়াসার পাশাপাশি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) ও রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া লেকটি দূষণমুক্ত রাখা সম্ভব নয়।
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। কমিটি চলতি বছরের আগস্ট মাসে গুলশান-বারিধারা লেক সরেজমিনে পরিদর্শন করে সংসদীয় কমিটিতে প্রতিবেদনটি জমা দিয়েছে।
এ বছরের ৩ এপ্রিল স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির ১১তম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। তাতে গুলশান-বারিধারা লেক দূষণ রোধে ঢাকা ওয়াসার গৃহীত ‘পলিউশন কন্ট্রোল মেজারস অব গুলশান-বারিধারা লেক বাই ডাইভার্টিং দ্য ড্রেনেজ আউটলেটস’ শীর্ষক প্রকল্পটি সফল হয়েছিল কি না, সফল না হয়ে থাকলে কী কারণে পুনরায় দূষণ হচ্ছে এবং এর জন্য দায়ী কারা, তা চিহ্নিত করতে একটি তদন্ত কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়।
স্থানীয় সরকার বিভাগের যুগ্ম সচিব অমিতাভ সরকারকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যর কমিটি গঠন করা হয়। তাতে ঢাকা ওয়াসার প্রতিনিধি ছিলেন নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আতিকুর রহমান। কমিটি সরেজমিনে পরিদর্শন করে ২৪ আগস্ট প্রতিবেদন জমা দেয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গুলশান-বারিধারা লেকের দূষণ রোধে ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ের একটি প্রকল্প গ্রহণ করে ঢাকা ওয়াসা। প্রকল্পটির মেয়াদকাল ছিল ২০১০ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পরে তা সফল হয়নি। এখনো গুলশান-বারিধারা লেক সরাসরি পয়োবর্জ্য এবং মানুষের তৈরি অন্যান্য বর্জ্যে দূষিত হচ্ছে। লেকের পানির দূষণের মাত্রা গ্রহণযোগ্য সীমার অনেক বেশি।
পরিদর্শনের সময় তদন্ত কমিটি দেখতে পায়, আগে যেসব নির্গমন মুখের মাধ্যমে বর্জ্য গুলশান-বারিধারা লেকে ফেলা হতো, সেগুলোর শুধু দিক পরিবর্তন করে উত্তর থেকে দক্ষিণে গুলশান-বারিধারা লেকের পশ্চিমে অবস্থিত বনানী লেকে ফেলা হচ্ছে। বনানী লেকটি হাতিরঝিলের মাধ্যমে দক্ষিণ-পূর্বে গুলশান-বারিধারা লেকের সঙ্গে সংযুক্ত। ফলে বনানী লেকে যে বর্জ্য ফেলা হচ্ছে, তা পুনরায় গুলশান লেকেই এসে পড়ছে। এ ছাড়া লেকের সব থেকে উত্তরে বারিধারা অংশে দুটি নির্গমন মুখের মাধ্যমে প্রচুর বর্জ্য গুলশান-বারিধারা লেকে পড়ছে।
গুলশান-বারিধারা লেকের দূষণ রোধ করতে ঢাকা ওয়াসার প্রকল্পটি খুব বেশি প্রভাব ফেলতে পারেনি বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। লেকে এখনো অনেকগুলো পয়োবর্জ্য নির্গমন মুখ থাকলেও সেগুলো অপসারণ বা বন্ধ করতে ঢাকা ওয়াসা কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। দূষণ বন্ধ করার বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি কোনো পরিকল্পনা বা সামগ্রিক কর্মসূচি না হওয়ায় লেকের দূষণ রোধে ঢাকা ওয়াসার প্রকল্পটি কাঙ্ক্ষিত উদ্দেশ্য অর্জন করতে পারেনি।
এ বিষয়ে কথা বলতে ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাকসিম এ খানের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।
ঢাকা ওয়াসার পাশাপাশি ডিএনসিসি ও রাজউকের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া লেকটির দূষণ রোধ সম্ভব নয় বলে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়। প্রতিবেদনে ডিএনসিসি ও রাজউকের নিয়মিতভাবে দৈনিক ভিত্তিতে লেকটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার উদ্যোগ গ্রহণের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। লেকটি দূষণমুক্ত রাখতে স্থানীয় মানুষের সচেতনতাও জরুরি বলে মন্তব্য করা হয়েছে ওই প্রতিবেদনে।
গতকাল বুধবার সরেজমিনে দেখা যায়, লেকের পারে গড়ে ওঠা দোকানপাট ও ঘরবাড়ি থেকে ময়লা-আবর্জনা লেকে ফেলা হচ্ছে। কড়াইল বস্তি এলাকায় কয়েক হাজার পরিবারের বাস। কড়াইল বস্তির পয়োবর্জ্যের সংযোগ গুলশানে লেকের সঙ্গে হওয়ায় লেকের দূষণ বাড়ছে। গুলশান-বারিধারা সংযোগ সড়কের উন্নয়নকাজের মাটি, সুরকি, ইটের ভাঙা অংশ ফেলা হচ্ছে লেকে।