এক জঙ্গির লাশ চেয়ে মার্কিন দূতাবাসের মাধ্যমে চিঠি

757
রোজিনা ইসলাম | আপডেট: ০১:৪৯, অক্টোবর ১৪, ২০১৬ | প্রিন্ট সংস্করণ

রাজধানীর কল্যাণপুরে পুলিশের অভিযানে নিহত সন্দেহভাজন জঙ্গিদের একজনের লাশ নিতে চেয়েছে পরিবার। তাঁর নাম শেহজাদ অর্ক রউফ। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। তাই মার্কিন দূতাবাসের মাধ্যমে চলতি মাসের শুরুতে লাশ চেয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছে অর্কের পরিবার। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, অর্কসহ নয় জঙ্গির লাশ ২৮ সেপ্টেম্বর বেওয়ারিশ হিসেবে ঢাকার জুরাইন কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে।

পরিবারের পক্ষ থেকে লাশ চাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘এত দিন তারা ঘৃণা প্রকাশ করেছে, আর এখন এসে লাশ চাচ্ছে। আশ্চর্য, এরা কী করে এদের লাশ চাচ্ছে ঠিক আমার বোধগম্য নয়!’ তিনি বলেন, যারা জঙ্গিদের লাশ চাইবে, তাদেরও নজরদারিতে রাখা হবে।

এদিকে নারায়ণগঞ্জে অভিযানে নিহত জঙ্গিনেতা ও বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কানাডার নাগরিক তামিম চৌধুরীর মরদেহের কী হবে, এ ব্যাপারে বাংলাদেশের সিদ্ধান্ত জানতে চেয়েছে ঢাকার কানাডীয় হাইকমিশন। এর বাইরে আরও দুজনের পরিবার লাশ নিতে আগ্রহী ছিল বলে তারা প্রথম আলোকে জানায়।

গত ২২ ও ২৮ সেপ্টেম্বর দুই দফায় ১৫ জঙ্গির লাশ বেওয়ারিশ হিসেবে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের মাধ্যমে দাফন করা হয়েছে। যদিও এই ১৫ জনের মধ্যে ১৪ জনের পূর্ণাঙ্গ পরিচয় এর আগেই গণমাধ্যমে প্রকাশ পায় এবং তাঁদের অনেকেরই স্বজনদের ডেকে ডিএনএ নমুনা নিয়ে লাশের পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে। এই ১৫ জনের মধ্যে ৬ জন ১ জুলাই গুলশানের হলি আর্টিজানে সেনা কমান্ডোদের অভিযানে এবং ৯ জন ২৬ জুলাই ঢাকার কল্যাণপুরে জঙ্গি আস্তানায় পুলিশের অভিযানে নিহত হন।

কল্যাণপুরে নিহত জঙ্গিদের একজন শেহজাদ অর্ক রউফ। তিনি নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির ছাত্র ছিলেন। অর্ক গুলশানে হামলায় জড়িত জঙ্গিদের একজন নিবরাস ইসলামের বন্ধু ছিলেন। তাঁরা তাওসিফ হোসেন নামের আরেক বন্ধুসহ চলতি বছরের ৩ ফেব্রুয়ারি বাড়ি ছাড়েন। তাওসিফ ২৭ আগস্ট নারায়ণগঞ্জে পুলিশের অভিযানে তামিম চৌধুরীর সঙ্গে নিহত হন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো থেকে জানা গেছে, অর্কের লাশ চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসের মাধ্যমে পরিবার যে চিঠি দিয়েছিল, সেটা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো হয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। এর পরিপ্রেক্ষিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ৪ অক্টোবর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক চিঠিতে বলেছে, মার্কিন নাগরিক শেহজাদ অর্ক রউফের মৃতদেহ গ্রহণের জন্য কোনো ওয়ারিশ যোগাযোগ না করায় সেটি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হিমাগারে সংরক্ষিত ছিল। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অজ্ঞাতনামা নয়টি লাশ কাউন্টার টেররিজম ইউনিটকে গত ২৮ সেপ্টেম্বর বুঝিয়ে দেয়। কাউন্টার টেররিজম ইউনিট ও ঢাকা মহানগর পুলিশ ওই দিনই লাশ দাফনের জন্য আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের কাছে হস্তান্তর করে। আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম ওই দিনই লাশ জুরাইন কবরস্থানে দাফন করে। বেওয়ারিশ হিসেবে লাশের দাফন হয়ে যাওয়ায় অর্কের মৃতদেহ তাঁর বাবা তৌহিদ রউফের কাছে হস্তান্তর করা সম্ভব হয়নি।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে প্রথম আলোর পক্ষ থেকে তৌহিদ রউফের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কিছু বলতে রাজি হননি।

কানাডীয় হাইকমিশনের চিঠি: ঢাকায় কানাডীয় হাইকমিশন থেকে গত মাসে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক চিঠিতে পুলিশের অভিযানে নিহত তামিম চৌধুরীর পুরো পরিচয় নিশ্চিত করতে অনুরোধ করা হয়েছে। একই সঙ্গে তামিমের মরদেহের কী হবে, এ ব্যাপারে বাংলাদেশের সিদ্ধান্ত জানতে চেয়েছে হাইকমিশন।

এসব বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘ডিএমসি থেকে তামিমের লাশ নিয়ে যেতে তাঁর চাচাকে আমরা বলেছি। তামিমের স্বজনেরা যদি তাঁর লাশ কানাডায় নিতে চান, নিতে পারবেন। কেউ যদি মরদেহ দাবি না করে, নিয়ম অনুযায়ী যা করার তা-ই করা হবে।’

গত ২৭ আগস্ট নারায়ণগঞ্জে অভিযানে নিহত তামিমসহ তিনজনের লাশ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে সংরক্ষণ করা হচ্ছে।

লাশ চেয়েছিল আরও দুই পরিবার: গুলশান হামলায় অংশ নিয়ে ও পরে জিম্মি উদ্ধার অভিযানে নিহত পাঁচ জঙ্গির দুজন বগুড়ার শফিকুল ইসলাম ওরফে উজ্জ্বল ও খায়রুল ইসলাম ওরফে পায়েলের লাশ নিতে চেয়েছিল পরিবার।

উজ্জ্বলের বাবা বগুড়ার ধুনটের বানিয়াজান চল্লিশপাড়া গ্রামের কৃষক ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সদস্য বদিউজ্জামান গত বুধবার প্রথম আলোকে বলেন, তাঁকে ও তাঁর আরেক ছেলেকে পুলিশ ঢাকায় ডেকে নিয়ে গিয়েছিল। উজ্জ্বলের লাশ শনাক্ত করতে পুলিশ তাঁদের দুজনের রক্ত নিয়েছিল, তবে লাশ দেখতে দেয়নি। তখন পুলিশ কর্মকর্তারা তাঁকে বলেছিলেন, উজ্জ্বলের লাশ দাফনের জন্য বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হবে। তাই তাঁরা লাশের অপেক্ষায় ছিলেন।

খায়রুলের মা পেয়ারা বেগম গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, তাঁকে ছেলের লাশ ফেরত দেওয়ার আশ্বাসও দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু পরে কিছু জানানো হয়নি। ঈদুল ফিতরের আগে তাঁকে বগুড়া থেকে ঢাকায় আনা হয়েছিল। সে সময়ও তিনি তাঁর ইচ্ছার কথা জানিয়েছিলেন।

জঙ্গিদের লাশ পরিবারকে দেওয়া হবে কি না, জানতে চাইলে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘লাশ তো অনেক দিন মর্গে পড়ে ছিল, কেউ নেয় না বলেই আমরা আঞ্জুমানকে দিয়েছি। প্রায় তিন মাস পর লাশগুলো জুরাইন কবরস্থানে দাফন করা হয়।’ তিনি বলেন, এখন কেউ যদি চায় লাশ দেওয়া হবে। যাদের দাফন হয়ে গেছে, সেগুলো নিতে হলে আদালতের অনুমতি লাগবে।