কঠোর আইন, শিথিল প্রয়োগ

724
রোজিনা ইসলাম | আপডেট: ০১:১৯, অক্টোবর ০৭, ২০১৬ | প্রিন্ট সংস্করণ

অ্যাসিড–সন্ত্রাসঅ্যাসিড-সন্ত্রাসে ঝলসে যাওয়া বগুড়ার মিথিলা পারভীন ও তাঁর মা বিউটি খাতুন ১০ বছর ধরে বিচারের জন্য অপেক্ষা করছেন। স্বামী-সন্তানসহ অ্যাসিড-সন্ত্রাসের আরেক শিকার নরসিংদীর মরিয়ম বেগম প্রায় আট বছর ধরে বিচারের আশায় ঘুরছেন। এমন আরও অনেকেই বিচার পাচ্ছেন না। অথচ অ্যাসিড অপরাধ দমন আইন, ২০০২ অনুযায়ী, ৯০ কর্মদিবসের মধ্যে মামলার বিচারের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার কথা।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ১৪ বছরে অ্যাসিড-সন্ত্রাসের মামলায় ১৪ জন আসামির মৃত্যুদণ্ড হয়েছে, কিন্তু এখনো কোনো মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়নি। এ ছাড়া যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছে ১১৯ জনের। অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় ১ হাজার ৮৩৫ জন আসামি খালাস পেয়েছেন।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ২০০২ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত মোট ১৪ বছরে অ্যাসিড-সন্ত্রাসের ঘটনায় সারা দেশে মামলা হয়েছে ২ হাজার ৫৭টি। অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি দাবি করে ৮২২টি মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়েছে পুলিশ। এর মধ্যে সাজাপ্রাপ্ত মামলার সংখ্যা মাত্র ১৮৮। বর্তমানে তদন্ত চলছে ৫৫টি মামলার। বাকি ৪৬৯টি মামলা মুলতবি আছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান ও অ্যাসিড সারভাইভারস ফাউন্ডেশনের (এএসএফ) তথ্য বলছে, বাংলাদেশে অ্যাসিড হামলার ঘটনা কমে এসেছে। কিন্তু এসব হামলার সঙ্গে জড়িত বেশির ভাগ আসামিই খালাস পেয়ে গেছে। মাত্র ২৫ শতাংশ মামলায় অভিযুক্তদের সাজা হয়েছে। ২০০২ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত অ্যাসিড আক্রমণ-সংক্রান্ত ২ হাজার ১৯টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় অভিযুক্তের সংখ্যা ছিল পাঁচ হাজারের বেশি। এর মধ্যে মাত্র ১২ শতাংশ মামলায় অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করা হয়। বাকি ৮৮ শতাংশ অভিযুক্ত পুলিশের ধরাছোঁয়ার বাইরে। পরিসংখ্যান বলছে, ১৯৯৯ থেকে ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে অ্যাসিড-সন্ত্রাসের ঘটনা ঘটেছে ৩ হাজার ৩৩৯টি। এসব ঘটনায় অ্যাসিডে দগ্ধ হয়েছেন ৩ হাজার ৭০৪ জন। অ্যাসিড হামলা হয়েছে প্রায় সাড়ে ৩ হাজারবার।
এএসএফের তথ্য অনুযায়ী, ২০০২ সালে সর্বোচ্চসংখ্যক ৪৯৪টি ঘটনায় ৪৯৬ জন অ্যাসিড-সহিংসতার শিকার হয়েছিলেন। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এ সংখ্যা কমে এসেছে। গত দুই বছরে অ্যাসিড-সন্ত্রাসের ঘটনা ছিল ৭৪টি করে। এ বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অর্থাৎ নয় মাসে অ্যাসিড হামলার সংখ্যা ৩৬। এর মধ্যে আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে এই সংখ্যা সবচেয়ে বেশি ছিল, অন্তত সাতটি করে। এসব ঘটনায় আক্রান্ত হয়েছেন ৪২ জন। এর মধ্যে একজন নারী মারা গেছেন।
হঠাৎ করে গত দুই মাসে পরপর কয়েকটি ঘটনা ঘটায় অ্যাসিড-সন্ত্রাসের প্রবণতা আবার ফিরে আসার আশঙ্কা করছেন এএসএফের নির্বাহী পরিচালক সেলিনা আহমেদ। তিনি বলেন, অ্যাসিড নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০০২ অনুযায়ী অ্যাসিড-সন্ত্রাস জামিন অযোগ্য অপরাধ। অথচ দেখা যাচ্ছে, অ্যাসিড হামলা মামলার আসামিরা জামিন পেয়ে যাচ্ছেন, প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। এমনকি তাঁদের অনেকে আবার উল্টো আক্রান্ত ব্যক্তির পরিবারকে হুমকি দিচ্ছেন। এতে অপরাধীদের অপরাধপ্রবণতা বেড়ে যাচ্ছে।
সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, অ্যাসিড-সংক্রান্ত মামলায় বাদী ও তাঁর স্বজনদের শরীরের বিভিন্ন স্থানে অ্যাসিডের ক্ষত থাকলেও বেশির ভাগ মামলায় পুলিশ চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়। সরকারের তথ্য-প্রমাণ বলছে, বাদী চূড়ান্ত প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে নারাজি আবেদন দেওয়ার পর অনেকটা বাধ্য হয়েই আদালতে অভিযোগপত্র দিচ্ছে পুলিশ। এরপর সাক্ষী পাওয়া যায় না। আইনজীবীদের অনেকেও জড়িয়ে পড়ছেন অনৈতিক চর্চায়। আবার রাজনৈতিক প্রভাবে অনেক মামলা ভিন্ন খাতে নেওয়া হচ্ছে। এক পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘসূত্রতা ও সময়ক্ষেপণের কারণে অ্যাসিড মামলার অপরাধীরা ছাড়া পেয়ে যাচ্ছে।
গত মাসে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত জাতীয় অ্যাসিড নিয়ন্ত্রণ কাউন্সিলের সভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এত অধিকসংখ্যক মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি পুলিশ অধিদপ্তরকে এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন দিতে বলেন।
জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘পুলিশের পক্ষ থেকে নানা ধরনের ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। তারা বলতে চাইছে, ব্যাটারির পানিকেও কেউ কেউ অ্যাসিড বলেছে, আবার অনেক ক্ষেত্রে সাক্ষী পাওয়া যায়নি। সে কারণে আমরা পুরো বিষয়টি জানতে চেয়েছি। অ্যাসিড-সন্ত্রাস অনেক ভয়ানক ব্যাপার। এই মামলায় কেন এতসংখ্যক চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে তা জানতে চেয়েছি।’
এএসএফের নির্বাহী পরিচালক প্রথম আলোকে এ বিষয়ে বলেন, অ্যাসিডের দাগ দৃশ্যমান এবং এ ক্ষেত্রে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়ে দেওয়া হয়। অ্যাসিড অপরাধ দমন আইন, ২০০২ অনুযায়ী, ৯০ কার্যদিবসের মধ্যে এ-সংক্রান্ত মামলার বিচারকাজ শেষ করতে বলা হলেও তা কখনোই হয় না। নিরাপত্তার অভাবে প্রায় ক্ষেত্রেই সাক্ষীরা পিছিয়ে যান।
প্রথম আলোর অনুসন্ধানে দেখা যায়, যাঁরা অ্যাসিড-সন্ত্রাসের শিকার হয়েছেন, তাঁরা বেশির ভাগই অপরাধীর পূর্বপরিচিত—স্বামী, প্রেমিক অথবা আত্মীয়। আর নারীর ওপর অ্যাসিড নিক্ষেপকারী সবাই পুরুষ। কিছু কিছু ক্ষেত্রে পুরুষও অ্যাসিড-সন্ত্রাসে আক্রান্ত হন।
অ্যাসিডদগ্ধদের নিয়ে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান কাজ করলেও নিয়মিত কাজ করছে এএসএফ ও প্রথম আলো ট্রাস্ট। ১৯৯৯ সালে অ্যাসিডদগ্ধদের জন্য কাজ শুরু করে এএসএফ। ২০০০ সালে গঠিত হয় অ্যাসিডদগ্ধ নারীদের জন্য প্রথম আলো সহায়ক তহবিল। এএসএফ এ পর্যন্ত প্রায় সাড়ে হাজার অ্যাসিডদগ্ধ নারীকে দেশে-বিদেশে চিকিৎসাসেবা দিয়েছে এবং আইনি সাহায্য করেছে। প্রথম আলো সহায়ক তহবিল এ পর্যন্ত চিকিৎসা, আইনি সহায়তা, শিক্ষাবৃত্তি, জমি, ঘরবাড়ি, দোকান-ভ্যান, গাভি প্রদানসহ নানাভাবে পুনর্বাসনে সাহায্য করেছে অ্যাসিডদগ্ধ প্রায় ৪৫০ নারীকে। একই সঙ্গে প্রথম আলো নারীর ওপর অ্যাসিড-সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী সভা-সমাবেশ ও বিভিন্ন কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে।
এএসএফের আইনজীবী অনিমেষ চন্দ্র সরকার বলেন, ২০০২ সালের অ্যাসিড অপরাধ দমন আইন ও অ্যাসিড নিয়ন্ত্রণ আইন দুটি খুবই ভালো। কিন্তু বাস্তবে আইন দুটি সঠিকভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে না। বিশেষ করে, থানায় মামলা হওয়ার পর সঠিকভাবে তদন্ত হয় না। ক্ষেত্রবিশেষে তদন্ত কর্মকর্তা দায়সারাভাবে ও অবহেলা করে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেন অথবা দুর্বল অভিযোগ আদালতে দাখিল করেন। অনেক সময় আসামিপক্ষের সঙ্গে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ ওঠে। এ কারণে অনেক আসামির নাম অভিযোগপত্র থেকে বাদ পড়ে।
সরকার ও এএসএফের হিসাব অনুযায়ী, নারীরাই বেশির ভাগ সময় অ্যাসিড-সন্ত্রাসের শিকার হন। তবে শিশু ও পুরুষেরাও এর শিকার হচ্ছেন। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত যে ৪২ জন অ্যাসিড-সন্ত্রাসের শিকার হয়েছেন, তাঁদের ২৫ জন নারী, ১০ জন পুরুষ, ৫ জন কন্যাশিশু ও ২ জন ছেলেশিশু। ২০১৫ সালেও নারীরাই বেশি অ্যাসিড-সন্ত্রাসের শিকার হয়েছেন, যার সংখ্যা ৪১। আর এ সময়ে পুরুষ আক্রান্ত হয়েছেন ২৩ জন এবং শিশু ১০টি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মানবাধিকারকর্মী ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা সুলতানা কামাল বলেন, সাক্ষীদের সুরক্ষা না থাকার কারণে তাঁরা ঠিকমতো আদালতে হাজির হন না। আর এ কারণে বিচার বিলম্বিত হয়। পুলিশ প্রভাবিত হয়ে চূড়ান্ত রিপোর্ট দেয়। তাই রাষ্ট্রের চোখে সবাই সমান হলেও কার্যক্ষেত্রে তা দেখা যায় না। অপরাধীরা চোখের সামনে ঘুরে বেড়ালেও পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার করে না।

অ্যাসিড–সন্ত্রাস
১৪ বছরে মামলা ২০৫৭
১৪ জন আসামির মৃত্যুদণ্ড
৮২২ মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন
মাত্র ২৫% মামলায় অভিযুক্তদের সাজা হয়েছে