সংশোধন আইনের খসড়া আজ মন্ত্রিসভায় উঠছে: জেলা পরিষদে সরাসরি ভোটের সুযোগ নেই

617
রোজিনা ইসলাম | আপডেট: ০৩:২৬, আগস্ট ২৯, ২০১৬ | প্রিন্ট সংস্করণ

অন্য সব স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে সরাসরি নির্বাচনের বিধান থাকলেও জেলা পরিষদে সেই সুযোগ থাকছে না। এর ফলে শক্তিশালী জেলা পরিষদ নিশ্চিত হবে না বলে মনে করছেন স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞরা।
একই সঙ্গে যে আইনের অধীনে জেলা পরিষদ নির্বাচন হতে যাচ্ছে, তা সংবিধানের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। সংবিধানের ৫৯ ধারা অনুযায়ী, সব প্রশাসনিক এককে সরকারি কার্য ও কর্মচারী থাকবে সরাসরি নির্বাচিত প্রতিনিধির অধীনে। জেলা পরিষদ আইনের সংশোধনীতে এ সুযোগ রাখা হয়নি।
স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমেদ মনে করেন, যে আইনের অধীনে দেশে প্রথম জেলা পরিষদ নির্বাচন হতে যাচ্ছে, তা ত্রুটিপূর্ণ। কারণ, এ আইনে জনগণের সরাসরি ভোট দেওয়ার সুযোগ নেই। এ ছাড়া এই পরিষদের চেয়ে তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ
এবং চেয়ারম্যানের ক্ষমতা অনেক বেশি।
সরকারের যুক্তি হলো, এত বড় একেকটি জেলায় সাধারণ ভোটারদের নিয়ে নির্বাচন করা সম্ভব নয়। সে জন্য সাধারণ মানুষ ভোট দিয়ে যাঁদের প্রতিনিধি নির্বাচন করেছেন, তাঁদের ভোটের মাধ্যমে জেলা পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারও নির্বাচকমণ্ডলীর মাধ্যমে জেলা পরিষদ নির্বাচনের বিরোধিতা করেন। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, এভাবে পরোক্ষ নির্বাচন দিয়ে জেলা পরিষদ গঠিত হলে তা তেমন শক্তিশালী হবে না। বরং প্রতি ওয়ার্ড থেকে একজন করে নির্বাচিত প্রতিনিধি দিতে হবে। প্রতিনিধিরা চেয়ারম্যান নির্বাচন করবেন। এর সঙ্গে ৪০ শতাংশ নারী প্রতিনিধি থাকতে হবে। সে ক্ষেত্রে নির্বাচন সরাসরি না হলেও প্রতি ওয়ার্ডের প্রতিনিধি থাকবেন।
জেলা পরিষদ (সংশোধন) আইন, ২০১৬-এর খসড়াটি নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য আজ সোমবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে তোলার কথা রয়েছে।
স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে পাঠানো সারসংক্ষেপে বলা হয়েছে, জেলা পরিষদের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে কিছু ধারা সংশোধন করা হয়েছে। প্রস্তাবে জাতীয় সংসদ না থাকায় জরুরি বিবেচনায় অধ্যাদেশ আকারে জারি করার অনুমোদন চাওয়া হয়েছে।
জানতে চাইলে স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব আবদুল মালেক গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, দ্রুতই জেলা পরিষদ নির্বাচন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ জন্য প্রয়োজনীয় আইন সংশোধন করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে ওয়ার্ডের সীমানা নির্ধারণের বিধিমালা জারি হয়েছে।
সাধারণ মানুষের ভোটের সুযোগ ছাড়া জেলা পরিষদ শক্তিশালী হবে কি না, জানতে চাইলে সচিব বলেন, ‘ইলেক্টোরাল কলেজ’ পদ্ধতির মাধ্যমে এই নির্বাচনে স্থানীয় সরকারের অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর জনপ্রতিনিধিরা ভোটার হবেন। কিন্তু প্রার্থীদের কোনো ভোটাধিকার থাকবে না। এর ফলে কোনো সমস্যা হবে না।
স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে পাঠানো আইনের সংশোধনীতে বলা হয়েছে, প্রতিটি জেলার অন্তর্ভুক্ত সিটি করপোরেশনের মেয়র, কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত আসনের কাউন্সিলর, উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান, পৌরসভার চেয়ারম্যান ও কমিশনার এবং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, সদস্য ও সংরক্ষিত আসনের সদস্যদের সমন্বয়ে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এবং সদস্য নির্বাচনের জন্য নির্বাচকমণ্ডলী গঠিত হবে। জনপ্রতিনিধিদের পদের নামসংক্রান্ত কিছু বিষয় সংশোধন করা হয়েছে। বিদ্যমান আইনে উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যানরা ভোটার ছিলেন না। আবার একজন ব্যক্তি একাধিক স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না।
সংশোধনীতে জেলা পরিষদ আইনে যেকোনো সম্পত্তি দান, বিক্রয়, বন্ধক, ইজারা বা বিনিময়ের মাধ্যমে বা অন্য যেকোনো উপায়ে হস্তান্তরের ক্ষেত্রে সরকারের অনুমতি লাগবে। বিদ্যমান আইনে সরকারের অনুমতির বিষয়টি উল্লেখ ছিল না।
এ ছাড়া ফৌজদারি মামলায় অভিযোগপত্র গৃহীত হলে অথবা জনস্বার্থ-পরিপন্থী কোনো কাজ করলে সংশ্লিষ্ট চেয়ারম্যান ও সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করতে পারবে সরকার। মূল আইনে চেয়ারম্যান ও সদস্যদের সাময়িক বরখাস্তের কোনো বিধান ছিল না। একইভাবে সংশোধনীতে পুনর্বহালের বিধানও রাখা হয়েছে। পরিষদের কোনো নির্বাচিত চেয়ারম্যান বা সদস্য বা সংরক্ষিত আসনের কোনো নারী সদস্য অপসারিত হলে তা পুনর্বিবেচনা করে আবার ওই আদেশ বাতিল করা যাবে।
নির্বাচিত প্রতিনিধিদের শপথ গ্রহণকালে তাঁদের পরিচিতির জন্য পিতা বা স্বামীর নামের সঙ্গে মায়ের নাম অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। নির্বাচনের বিধি প্রণয়নের ক্ষমতা আগে মন্ত্রণালয়ের হাতে ছিল। প্রস্তাবিত অধ্যাদেশে তা নির্বাচন কমিশনের (ইসি) হাতে দেওয়া হয়েছে। নির্বাচনী অপরাধে আচরণবিধি ভঙ্গের বিষয়টি অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাব করা হয়েছে। নির্বাচনের আচরণবিধি ভঙ্গের জন্য অনধিক ৫০ হাজার টাকা জরিমানা এবং অনধিক ছয় মাসের কারাদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে প্রস্তাবিত অধ্যাদেশে। এ ছাড়া কারাদণ্ডের মেয়াদ সাত বছরের অধিক হবে না।
অধ্যাপক তোফায়েল আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, আইনে যে ধারাটি জরুরিভাবে অবশ্যই সংশোধন করা উচিত ছিল, তা হচ্ছে সাধারণ জনগণের ভোট দেওয়ার ক্ষমতা। নির্বাচকমণ্ডলীর পরিবর্তে জেলার জনসংখ্যা, আকার ও ভোটার সংখ্যার ভিত্তিতে জেলা পরিষদের নির্বাচনী ওয়ার্ড সৃষ্টি করে জনগণের সরাসরি ভোটে জেলা পরিষদের সদস্যদের নির্বাচিত হওয়া উচিত।
পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলা বাদে বাকি ৬১টি জেলা পরিষদে ২০১১ সালের ১৫ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাদের প্রশাসক নিয়োগ করে সরকার। তখন স্থানীয় সরকার বিভাগসহ সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিরা বলেছিলেন, ছয় মাসের মধ্যে নির্বাচন দিয়ে জেলা পরিষদ গঠন করা হবে। কিন্তু সেই নির্বাচনের উদ্যোগ নেওয়া হলো সাড়ে চার বছর পর।