ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদ: বড় কর্তাদের কিছুই হয় না, ছোটরা দুদকের জালে

638
রোজিনা ইসলাম | আপডেট: ০৯:১৭, আগস্ট ১০, ২০১৬ | প্রিন্ট সংস্করণ

মুক্তিযোদ্ধা সনদ ভুয়া প্রমাণিত হওয়ার পর ছোট পদের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলেও সরকারের পাঁচ সচিবের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং তাঁদের স্বেচ্ছায় অবসরে যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচ শিক্ষকের বিরুদ্ধেও একই অভিযোগ উঠেছিল। তাঁদের বিরুদ্ধেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদে চাকরি হওয়ার ঘটনায় গত সোমবার পুলিশের ১৯ জন সদস্য এবং গত বৃহস্পতিবার জয়পুরহাটে দুই কনস্টেবলকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। প্রশাসনের উপসচিব পর্যায় থেকে সচিব পর্যন্ত কর্মকর্তারা গতকাল প্রশ্ন তুলে বলেছেন, রাঘববোয়ালদের বিরুদ্ধে কেন কোনো ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না? তাহলে কি ক্ষমতাশালীরা অবসরে চলে গেলেই সব অন্যায় মাফ হয়ে যাবে?
১৯ পুলিশ সদস্য গ্রেপ্তারের বিষয়ে জানা যায়, তাঁরা মুক্তিযোদ্ধা কোটায় ২০১২ সালে কনস্টেবল পদে নিয়োগ পান। তাঁদের সনদ যাচাইয়ের জন্য পাঠানো হলে সেগুলো ভুয়া বলে প্রমাণিত হয়। এরপর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সিরাজগঞ্জের পুলিশ সুপারকে মামলা করার নির্দেশ দেয়। মামলা তদন্তের ভার দেওয়া হয় দুদককে। ওই কনস্টেবলরা অর্থের বিনিময়ে সনদ সংগ্রহ করেছিলেন বলে জানা গেছে।
সরকারের পাঁচ শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয় ২০১৪ সালে। ওই বছরের ২২ সেপ্টেম্বর তৎকালীন স্বাস্থ্যসচিব এম নিয়াজ উদ্দিন মিয়া, সরকারি কর্মকমিশনের (পিএসসি) তৎকালীন সচিব এ কে এম আমির হোসেন, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব কে এইচ মাসুদ সিদ্দিকী এবং একই মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব আবুল কাসেম তালুকদারের মুক্তিযোদ্ধা সনদ বাতিল করে গেজেট প্রকাশ করা হয়। আর সাবেক সচিব এবং বর্তমানে প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় বেসরকারীকরণ কমিশনের চেয়ারম্যান মোল্লা ওয়াহিদুজ্জামানেরও সনদ ও গেজেট বাতিল করা হয়। দুদকের তদন্তে তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলেও দুই বছরে কোনো মামলা হয়নি।
স্বাস্থ্যসচিবের মুক্তিযোদ্ধা সনদও বাতিল করা হয়েছে। পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক থাকতে তাঁর বিরুদ্ধে নিয়োগ-বাণিজ্যের অভিযোগ ছিল। মুক্তিযুদ্ধের সনদ জালিয়াতির প্রমাণ পাওয়ার পর তাঁর বিরুদ্ধে আইনগত ও বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে সুপারিশ করে দুদক। কিন্তু কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে তাঁকে স্বেচ্ছায় অবসরে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়।
জানতে চাইলে দুদকের সচিব আবু মো. মোস্তফা কামাল গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘আইন অনুযায়ী তো তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা। কিন্তু কেন নেওয়া হয়নি, নথিপত্র ঘেঁটে বলতে পারব।’
জনপ্রশাসনসচিব কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী অবশ্য বলেন, ‘অবসরে যাওয়ার পর কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আমরা ব্যবস্থা নিতে পারি না। এ ক্ষেত্রে এখতিয়ার মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের।’
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেন, ‘আমরা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে এ বিষয়ে আইনি ব্যবস্থা নিতে চিঠি দিয়েছিলাম। যদি তারা কোনো পদক্ষেপ এত দিনেও না নিয়ে থাকে, তাহলে আমরাই ফৌজদারি ব্যবস্থা নেব।’
‘চাকরির শেষ সময়ে মুক্তিযোদ্ধা সনদ নেওয়ার হিড়িক’ শিরোনামে ২০১৪ সালের ২২ জানুয়ারি প্রথম আলোতে প্রধান প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এরপর সরকারের পাঁচ শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা ‘অবৈধ প্রক্রিয়ায়’ মুক্তিযোদ্ধা সনদ নেন বলে তদন্তে বেরিয়ে এলেও কোনো মামলা করা হয়নি।
এ ছাড়া চাকরিতে যোগ দেওয়ার সময় নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা ঘোষণা করেননি, অথচ মুক্তিযোদ্ধা সনদ নিয়েছেন। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সুবিধাও নিয়েছেন কিংবা কেউ কেউ সুবিধা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছেন, এমন অভিযোগ পাওয়া যায় এক সচিবসহ আরও ১৬ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। তাঁদের বিরুদ্ধেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী বলেন, ‘১৬ জনের বিষয়ে তদন্ত চলছে, শুনানিও শুরু হয়েছে। তাঁদের একজন মারা গেছেন, যাঁর সনদ ভুয়া বলে প্রমাণিত হয়েছে, তাঁর গেজেট বাতিল করা হয়েছে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক: ভবিষ্যতে মুক্তিযোদ্ধা সনদ জমা দেবেন—এই শর্তে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচ অধ্যাপক এবং এক কর্মকর্তার চাকরির মেয়াদ এক বছর বাড়ানো হয়। ২০১৪ সালের ১ জুলাই থেকে চার শিক্ষক এবং এক কর্মকর্তা এই সুবিধা ভোগও করেছেন। শেষ পর্যন্ত সুবিধাপ্রাপ্তরা মুক্তিযোদ্ধা সনদ জমা দেননি।
পাঁচ শিক্ষক সনদ জমা দিয়েছিলেন কি না, জানতে চাইলে তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার সৈয়দ রেজাউর রহমান গতকাল বলেন, কাগজপত্র না দেখে বলা যাবে না। ওই সময় অবশ্য তিনি বলেছিলেন, তাঁদের কেউই এখনো মুক্তিযোদ্ধা সনদ জমা দেননি। তবে গতকাল মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী বলেন, তাঁর জানামতে তাঁরা সনদ জমা দেননি।
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ভুল ব্যাখ্যা এবং মিথ্যা তথ্য দেওয়ায় বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর মোট ২ হাজার ৫৯৪ জনের সনদ বাতিল করেছে। মন্ত্রণালয় থেকে এসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়ের করার জন্য সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকদের নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এসব নির্দেশ আমলে নেওয়া হচ্ছে না।
এই আড়াই হাজারের মধ্যে স্কুলশিক্ষক, ব্যাংকার, কর পরিদর্শক, প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা, রাজস্ব কর্মকর্তা, স্বাস্থ্য সহকারী, পুলিশ কর্মকর্তাসহ ছোট পদে কাজ করেন এমন কর্মকর্তা-কর্মচারীই বেশি। এ ছাড়া ভুয়া সনদধারী প্রায় তিন হাজার ব্যক্তির ভাতা বাতিল ও স্থগিত করা হয়েছে। তাঁরা ব্যক্তিগত, প্রাতিষ্ঠানিক ও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে নাম অন্তর্ভুক্ত করে যথারীতি এ সুবিধা নিয়েছেন। পরে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা, সরকারি দপ্তর ও এলাকাবাসীর সাক্ষ্যপ্রমাণে বেরিয়ে আসে যে তাঁরা মুক্তিযোদ্ধা নন।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর মুক্তিযোদ্ধা কর্মচারীদের চাকরির বয়সসীমা প্রথমে দুই বছর এবং পরে এক বছর বাড়িয়ে দেয়। এরপরই মুক্তিযোদ্ধা সনদ নেওয়ার হিড়িক পড়ে।
সর্বশেষ গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. হাফিজুর রহমান মুন্সীর মুক্তিযোদ্ধা সনদ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তদন্তও চলছে প্রায় এক বছর। কিন্তু এখনো কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি। অভিযোগ রয়েছে, মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে প্রাপ্য অতিরিক্ত সময়ে কর্মরত আছেন তিনি। সংসদীয় কমিটির চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, আইন সবার জন্য সমান। যেকোনো জালিয়াতির বিরুদ্ধে ফৌজদারি ব্যবস্থা নিতে হয়। সে ক্ষেত্রে জনপ্রশাসনের কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম। আর মিথ্যা তথ্য দিয়ে সনদ নেওয়া তো আরও বড় অপরাধ। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় বিভাগীয় ব্যবস্থা না নিতে পারলেও আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারত। এ ক্ষেত্রে অবসরে চলে যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়াটা যথার্থ হয়নি। এখনো সুযোগ আছে অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার।