গুলশান হামলা: শোকার্ত বাংলাদেশ দক্ষ ইউনিটের অভাববোধ করছে সরকার

519
রোজিনা ইসলাম | আপডেট: ০৩:০৯, জুলাই ০৪, ২০১৬ | প্রিন্ট সংস্করণ

.রাজধানীর গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলা সামাল দেওয়ার অভিজ্ঞতা থেকে সরকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি ‘চৌকস-দক্ষ ইউনিট’-এর অভাব অনুভব করছে। আবার এ ধরনের বড় সন্ত্রাসী ঘটনায় কী ধরনের অভিযান পরিচালনা করা হবে এবং কোন বাহিনী তা পরিচালনা করবে, তা নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতেও দেরি হয়েছে বলে মনে করছেন নীতিনির্ধারণী ব্যক্তিরা। হামলার প্রায় ১২ ঘণ্টা পর অভিযান শুরু করাকে অনেকে ‘বিলম্ব’ বলে মন্তব্য করেছেন।
তবে সরকার মনে করে, তড়িঘড়ি করে জিম্মিদের উদ্ধার করতে গেলে ক্ষয়ক্ষতির দায় তাদের ঘাড়ে এসে পড়তে পারত। যৌথ বাহিনীর বন্দুকযুদ্ধেই দেশি-বিদেশিরা নিহত হয়েছে কি না—এমন প্রশ্ন উঠত। কয়েকজন মন্ত্রী, সচিব ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে এসব ভাবনার কথা জানা গেছে।
প্রশাসনেরই প্রায় সব পক্ষ থেকে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, কীভাবে এসব অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে জঙ্গিরা গুলশানের ওই রেস্তোরাঁয় গিয়ে হাজির হলো। সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী প্রথম আলোকে বলেন, এই হামলাটি যে সুপরিকল্পিত, তা পরিষ্কার। এই অভিযানে দেশি-বিদেশি যেসব অস্ত্রশস্ত্র ও বিস্ফোরক দ্রব্য, তথা বোমা এবং গ্রেনেড, সাউন্ড গ্রেনেড, সরঞ্জাম ব্যবহার করা হয়েছে, তা এক দিনে নেওয়া হয়নি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের চোখ ফাঁকি দিয়ে কীভাবে এসব নেওয়া হলো গুলশানের মতো একটি এলাকায়, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কেননা, গুলশানে চেকপোস্টে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরই ঢুকতে দেওয়া হয়। অসতর্কতা, অবহেলা ও ঢিলেঢালা গোয়েন্দা নজরদারি এর কারণ বলে মনে করা হচ্ছে। তবে রেস্তোরাঁর কর্মচারীদের কেউ এর সঙ্গে জড়িত কি না, তাও খতিয়ে দেখছে পুলিশ ও সিআইডি।
আলোচনায় এসেছে ঘটনাস্থল থেকে জঙ্গিদের প্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয়ও। সরকারের একটি সূত্র জানায়, জিম্মি হওয়া ও নিহত ব্যক্তিদের মুঠোফোনের ইন্টারনেট ব্যবহার করেই তারা বিদেশি ওয়েবসাইটে রক্তাক্ত মানুষের ছবি পোস্ট করে দায় স্বীকার করেছে। এ ছাড়া রেস্তোরাঁর ভেতর থেকেই মুঠোফোন দিয়ে তারা সর্বক্ষণ যোগাযোগ রেখেছে। যেসব মুঠোফোন নম্বরে জঙ্গিরা যোগাযোগ করেছে, সেসব নম্বর খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
পুলিশের একজন কর্মকর্তা বলেন, সন্ত্রাসীরা বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বলে মনে হয়েছে। যেভাবে দেশি-বিদেশি নাগরিকদের জিম্মি করে রেখেছিল তারা, তাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মনে এই সন্দেহ জেগেছে। এ ঘটনায় আরও যারা জড়িত বা নির্দেশদাতা, তারা ঢাকা ও এর আশপাশেই রয়েছে বলে নীতিনির্ধারকদের ধারণা। তাদের সঙ্গে আন্তর্জাতিক যোগাযোগও রয়েছে।
অভিযানের পর পুলিশ রেস্তোরাঁর সিসি ক্যামেরা সচলই পেয়েছে বলে জানা গেছে। কিন্তু রেকর্ডের বাটন (দৃশ্য ধারণ করা সুইচ) বন্ধ পাওয়া গেছে। তাই কোনো কিছু রেকর্ড হয়নি।
অভিযান শেষ হওয়ার পর ২ জুলাই র্যা বের মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ, ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়াসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের কাছে পুরো ঘটনা তুলে ধরেন। সেখান থেকে নীতিনির্ধারকদের মধ্যে আরও নতুন চিন্তা আসছে বলে জানা গেছে।
সরকারের ঊর্ধ্বতন একাধিক সূত্র জানায়, এ ধরনের অভিযান পরিচালনার জন্য ঢাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে পুরোপুরি দক্ষ মনে করেনি সরকার। ওই পরিপ্রেক্ষিতে শুক্রবার গভীর রাতে অভিযান পরিচালনার জন্য সিলেটে অবস্থিত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একমাত্র প্যারা কমান্ডো ব্যাটালিয়নকে তলব করা হয়। প্যারা কমান্ডো ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল ইমরুলের নেতৃত্বে সিলেটের জালালাবাদ ক্যান্টনমেন্টের বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ১০০ প্যারা কমান্ডোকে সেনাবাহিনীর বিশেষ বিমানে ঢাকায় নিয়ে আসা হয়। এতে কিছুটা সময় লাগে। সাঁজোয়া যান নিয়ে আসে সাভার নবম পদাতিক ডিভিশনের একটি দল। নৌবাহিনীর কমান্ডোরা গুলশান লেকে বিশেষ নৌযান নামান। এ ছাড়া বিজিবিকে লেক পাহারা দিতে বলা হয়।

জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান প্রথম আলোকে বলেন, সন্ত্রাসীরা ঢুকে কোনো সময়ই নেয়নি। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে সবাইকে হত্যা করা হয়েছে। এরপর সারা রেস্তোরাঁয় তলোয়ার নিয়ে ঘুরেছে তারা। সাইটে ছবি দেওয়া, মুঠোফোনে কথা বলা ও অন্য সব যোগাযোগ সন্ত্রাসীরা করেছে নিহত ও জিম্মি ব্যক্তিদের মুঠোফোন ব্যবহার করে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ওই ঘটনার সময় কয়েকজন জ্যেষ্ঠ পুলিশ সুপার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাসায় ছিলেন। তাঁদের কাছে জঙ্গি হামলার প্রথম খবরটি আসে গুলশান পুলিশের বেতারবার্তায়। গুলশান বিভাগের উপকমিশনার মুশতাক আহমেদ বেতারবার্তার মাধ্যমে তাঁর এলাকার সব ফোর্সকে ঘটনা সম্পর্কে প্রাথমিক তথ্য দেন। পরিস্থিতি মোকাবিলার নির্দেশনাও দেন তিনি। খবর পেয়ে নিজ নিজ অবস্থান থেকে ঘটনাস্থলের দিকে ছুটে যান সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যরা। একই সঙ্গে ঘটনাস্থলে ছুটে যায় র্যা বের বেশ কয়েকটি দল।
সর্বশেষ রাত প্রায় দুইটার দিকে যৌথ অভিযানের প্রস্তুতি নেয় পুলিশ, র্যা ব, বিজিবি, সোয়াটসহ অন্যান্য বাহিনী। চারটি আর্মড পার্সোনেল ক্যারিয়ার (এপিসি) ঘটনাস্থলে নেওয়া হয়। রাত পৌনে তিনটার দিকে সেনাপ্রধান, পুলিশ ও র্যা বপ্রধান গণভবনে যান প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করার জন্য। প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ভোর পর্যন্ত পুরো অভিযান তদারক করেন।
প্রশাসনের কয়েকজন কর্মকর্তা বলেন, কয় দিন ধরে কিছু নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় একধরনের অস্বস্তি তৈরি হয়েছিল। কিন্তু গুলশানের রেস্তোরাঁর রক্তাক্ত ঘটনার মধ্য দিয়ে দেশে সন্ত্রাসী হামলার নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। হামলা সামাল দিতে সরকারের পক্ষ থেকে সমন্বয়ের কিছুটা অভাব দেখা গেছে। রযার ব এ অভিযান পরিচালনায় ইচ্ছা প্রকাশ করলেও ঊর্ধ্বতন ব্যক্তিরা রাজি হননি বলে জানা গেছে। মূলত জঙ্গি দমনে প্রশাসনের যে কৌশল-রক্ষণশীল কৌশল, তা সফল হচ্ছে না বলে মনে করছেন তাঁরা।
এ অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ বাহিনীর আদলে গড়া সোয়াটের অবস্থাও পর্যালোচনায় এসেছে। শুধু এই বাহিনীকে দিয়ে গুলশানের জিম্মি উদ্ধারে অভিযান চালাতে আস্থা পাননি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। ফলে এখন ভারতের ন্যাশনাল সিকিউরিটি গার্ড ‘ব্ল্যাক ক্যাট’-এর আদলে নতুন কোনো বাহিনী বা ইউনিট গঠনের কথা ভাবছে সরকার। ভারতে মাওবাদী গেরিলাদের মোকাবিলা করতে এই এলিট বাহিনীর সাহায্য নেয় সে দেশের সরকার।
সরকারের একটি সূত্র বলছে, তারা আরও বড় ধরনের হামলার আশঙ্কা করছে। তাই আগাম তথ্য পেতে গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানোর পাশাপাশি জননিরাপত্তার বিষয়ে আরও বেশি সতর্ক হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেন, ‘বিশেষায়িত বা ব্ল্যাক ক্যাট-এর আদলে এ ধরনের বাহিনীর প্রয়োজন রয়েছে। আমরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে বিষয়টি চূড়ান্ত করব।’