বন্দী সন্ত্রাসীর ‘মুক্ত’ জীবন

552
রোজিনা ইসলাম | আপডেট: ০২:০২, জুন ২৯, ২০১৬ | প্রিন্ট সংস্করণ

মেয়ের সঙ্গে শীর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াসিন খান ওরফে পলাশ l ছবি: সংগৃহীত (সম্পাদকীয় নীতির কারণে মেয়েটির চেহারা অস্পষ্ট করা হয়েছে)কারাগারে ১৪ বছর ধরে বন্দী শীর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াসিন খান ওরফে পলাশ, যিনি কাইল্যা পলাশ নামেও পরিচিত। কিন্তু আক্ষরিক অর্থে পরিবার থেকে তিনি বিচ্ছিন্ন নন। রামপুরার বাসায় প্রতি মাসে দু-তিনবার আসা-যাওয়া করতেন তিনি। রোগী সেজে কারাগার থেকে বিভিন্ন হাসপাতালেও ভর্তি হয়েছেন। এ সময় পরিবারের অবাধ যাতায়াত ছিল হাসপাতালের কক্ষে। ১৪ বছর কারাবন্দী হওয়া সত্ত্বেও ইয়াসিন খানের চার বছর বয়সী একটি সন্তান আছে। পরিবারের সদস্যরা আশা করছেন, কোনো না কোনো কৌশল করে এবার তিনি নিজ বাসায় পরিবারের সঙ্গেই ঈদুল ফিতর উদ্যাপন করবেন।
কাশিমপুর, মুন্সিগঞ্জ, রাজশাহী, দিনাজপুর কারাগার ঘুরে ইয়াসিন খান এখন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে।
যুবদল নেতা মিজানুর রহমান মিজান হত্যা মামলায় যাবজ্জীবন সাজা ভোগ করছেন ইয়াসিন খান। ২০০২ সালের ২৯ মে রামপুরায় যুবদল নেতা মিজানকে গুলি করে হত্যার মামলায় বিচারিক আদালত তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলেন। উচ্চ আদালত তাঁর সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন।
গত সপ্তাহে ইয়াসিন খানের রামপুরার সাততলা বাড়ির নিচতলায় বসে প্রথমে কথা হয় তাঁর ভগ্নিপতি লিয়াকত আলীর সঙ্গে। দুঃখ প্রকাশ করে প্রথম আলোকে তিনি বলেন, শুধু ইয়াসিন খান ওরফে পলাশ নয়, তাঁর (লিয়াকত আলী) একমাত্র সন্তান ইব্রাহিম হোসেন খান ওরফে তুষারও চাঁদাবাজির মামলায় মুন্সিগঞ্জের জেলে। তাঁর দাবি, ইয়াসিন খান গ্রেপ্তার না হলে তাঁকে মেরে ফেলা হতো। অন্যদিকে এলাকাবাসীর দাবি, মামা-ভাগনে (পলাশ-তুষার) মিলে রামপুরায় চাঁদাবাজি ও ছিনতাই করতেন বলে পুলিশের কাছে অনেকেই অভিযোগ করেছেন।
কথা হয় ইয়াসিন খানের স্ত্রী মাহমুদা খানমের সঙ্গে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, খুনের মামলায় ২০০৩ সালে গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকে জেলে আছেন তাঁর স্বামী। ২০১২ সালের অক্টোবরে মুন্সিগঞ্জ হাসপাতালে জন্ম হয় তাঁদের মেয়ে খাদিজার। মাহমুদা প্রথম আলোর কাছে স্বীকার করেন, কারাগার থেকে আদালতে হাজিরা দিয়ে ফেরার পথে রামপুরার বাসায় দেখা করে যেতেন ইয়াসিন খান। আগে মাসে দু-তিনটা হাজিরা থাকত, তখন বেশি আসতেন—এখন কম। কখনো কয়েক ঘণ্টা, কখনো সারা দিন পরিবারের সঙ্গে থাকেন। প্রিজন ভ্যানে নয়, মাইক্রোবাসে করেই ইয়াসিন খান আসা-যাওয়া করতেন। বাড়ির বাইরে পুলিশ পাহারা দিত।
ইয়াসিন খানের বিরুদ্ধে কারাগারে বসে ছিনতাই-চাঁদাবাজির অভিযোগ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে মাহমুদা বলেন, ‘আমি তো দেখি না।’ ইয়াসিন খানের বোন ডালিয়া খান অবশ্য বলেন, এলাকার নানা দ্বন্দ্বের কারণেই তাঁর একমাত্র ভাই ও একমাত্র সন্তান কারাগারে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এলাকাবাসী এই প্রতিবেদককে বলেন, ইয়াসিন খান কারাগারে থেকেও নিয়মিত বাসায় আসা-যাওয়া করেন। এসব নিয়ে এলাকায় প্রশাসনের খুব সমালোচনা হয়। এর মধ্যে তিনি সন্তানেরও বাবা হয়েছেন। এলাকাবাসী আরও বলেন, ইয়াসিন খানের নামে এখনো এলাকায় চাঁদাবাজি হয়। আগে তাঁর ভাগনে করতেন। এখন তিনি জেলে। তাঁর অন্য সহযোগীরা করেন।
বিষয়টি নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তার সঙ্গে আলাপ করলে তিনি বলেন, ইয়াসিন খান ওরফে পলাশ অনেক জেলার কারাগারে ঘুরেছেন। দিনাজপুর, রাজশাহী, গাজীপুর—যেখানেই পাঠানো হোক, তদবির করে তিনি ঢাকায় চলে আসেন। এ ক্ষেত্রে পুলিশের গাফিলতি রয়েছে।
জানতে চাইলে কারা অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, আদালতে শুনানির দিনক্ষণ নির্ধারণ এবং আদালতে উপস্থাপন—এ দুটি দায়িত্বের কোনোটির সঙ্গেই কারা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পৃক্ততা নেই। তাঁরা বলেন, ইয়াসিন খান গত দুই বছরে মামলার হাজিরা দিতে ৫৩ বার ঢাকায় এসেছেন। কাশিমপুর থেকে ঢাকার বিভিন্ন আদালতে হাজিরা দেওয়ার সময় পুলিশি পাহারায় প্রিজন ভ্যানে যাতায়াত করেছেন তিনি। পথিমধ্যে প্রহরা বা আদালতে উপস্থাপন করার দায়িত্ব পুলিশ কর্তৃপক্ষের। কারাগারের ভেতর থেকে কিংবা আদালতে হাজিরার পথে বা আদালত চত্বর থেকেও তিনি মুঠোফোন ব্যবহার করে থাকতে পারেন।
স্ত্রী মাহমুদা প্রথম আলোকে বলেছেন, পুলিশের সহযোগিতায় তাঁর স্বামী রামপুরার বাসায় আসা-যাওয়া করতেন মাইক্রোবাসে। প্রিজন ভ্যানে কখনো আসেননি।
এসব অভিযোগের বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে প্রশ্ন করা হলে তিনি খোঁজ নিয়ে পরে প্রথম আলোকে বলেন, ‘এ তো ভয়ংকর ঘটনা! একজন আসামি কারাগারে থাকা অবস্থায় তাঁর সন্তান হয়েছে! এর আগে বিয়ের ঘটনা শুনেছিলাম আরেকজনের।’ তিনি বলেন, ইয়াসিন ওরফে পলাশ কোন কারাগার থেকে কতবার হাজিরা দিয়েছেন, তা অনুসন্ধান করে ওই কাজে যাঁরা দায়িত্বে ছিলেন, তাঁদের সবার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ জন্য তিনি একজন কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেন বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে।
রামপুরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রফিকুল ইসলাম গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, এলাকার ভুক্তভোগী লোকজন বিভিন্ন সময় অভিযোগ করেন, পলাশ ও তুষারের নামে তাঁদের কাছে চাঁদা চাওয়া হচ্ছে। রেকর্ড বিশ্লেষণ করে কারাগারে থেকেও অনেক সিম ব্যবহারের তথ্য পেয়েছে পুলিশ। তবে প্রকৃতপক্ষে কারা চাঁদা দাবি করছেন, কাদের মাধ্যমে এটা করা হচ্ছে—সবই খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তিনি বলেন, ইয়াসিন খান ওরফে পলাশের বিরুদ্ধে এমনও অভিযোগ রয়েছে, তিনি হাতকড়া পরা অবস্থায় এলাকায় এসে গুলি চালিয়েছেন।