সন্ত্রাসী জোসেফের সাজা মওকুফ করতে তোড়জোড়!

679
রোজিনা ইসলাম | আপডেট: ০২:৩৯, জুন ২৩, ২০১৬ | প্রিন্ট সংস্করণ

তোফায়েল আহমেদ জোসেফদেশের শীর্ষ সন্ত্রাসী তোফায়েল আহমেদ ওরফে জোসেফের সাজা মওকুফ করতে তোড়জোড় শুরু হয়েছে। বহুল আলোচিত এই সন্ত্রাসীর খুনের দায়ে প্রথমে মৃত্যুদণ্ড হয়েছিল। এই রায় বহাল রাখেন হাইকোর্ট। পরে আপিল শুনানি শেষে গত বছরের ডিসেম্বরে সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। কারা সূত্রের হিসাব অনুযায়ী, তাঁর সাজা ভোগ করা বাকি আছে আরও ২১ বছর ৭ মাস। জরিমানা না দিলে আরও এক বছর বেশি সাজা খাটতে হবে।
কারা সূত্র জানায়, জোসেফের মা রেনুজা বেগম ৭ জুন তাঁর সন্তানের সাজা মওকুফের জন্য আবেদন করেছেন। তাঁকে অন্যায়ভাবে সাজা খাটানো হচ্ছে বলে তিনি আবেদনে জানিয়েছেন। এখন দ্রুত সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন পাঠাতে বিশেষ তদবির চলছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। আইন মন্ত্রণালয়ের মতামত নিয়ে দু-এক দিনের মধ্যে এই সাজা মওকুফের প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হবে বলে জানা গেছে। অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে পুরো প্রক্রিয়াটি চলছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘জোসেফের সাজা মওকুফের আবেদন আমরা পেয়েছি। এখন আমরা আইন মন্ত্রণালয়ের মতামত নেব। মতামত পেলে প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের পর রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠাব।’ তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রের কাছে যে কেউ ক্ষমা চেয়ে আবেদন করতে পারেন। আমরা রাষ্ট্রপতির কাছে বিধি মোতাবেক সেই আবেদন পৌঁছে দেব। সংবিধান অনুযায়ী ক্ষমা করার ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির। তিনিই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেবেন।’
নব্বইয়ের দশকের এই শীর্ষ সন্ত্রাসী প্রায় ১০ মাস ধরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) প্রিজন সেলে রয়েছেন। কেন এত দিন হাসপাতালে আছেন, জানতে চাইলে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের কারাধ্যক্ষ নেসার আলম গতকাল রাতে প্রথম আলোকে বলেন, অসুস্থ বলেই হাসপাতালে আছেন। গত বছরের ১৩ সেপ্টেম্বর পিঠে ব্যথার কারণে তাঁকে বিএসএমএমইউর প্রিজন সেলে নেওয়া হয়। তখন থেকে তাঁর চিকিৎসা চলছে।
খুন, অস্ত্র মামলাসহ ১১ মামলার আসামি জোসেফের ১০ মাস ধরে চিকিৎসা নেওয়ার বিষয়টি গতকাল নিশ্চিত করেন বিএসএমএমইউর পরিচালক (হাসপাতাল) আবদুল মজিদ। তাঁর দপ্তরে গেলে প্রথম আলোকে তিনি বলেন, জোসেফের চিকিৎসা করছেন নিউরোলজি বিভাগের অধ্যাপক আবু নাসার রিজভী। তাঁর রোগের বিষয়ে জানতে চাইলে এই চিকিৎসক জানান, ‘ব্যাক পেইন। ফিজিওথেরাপি নিচ্ছে। ভালো না হলে অপারেশন লাগতে পারে।’
কারা সূত্র জানায়, সাজাপ্রাপ্ত এই কয়েদির বয়স ৪২ বছর। কারা বিবরণ অনুযায়ী, জোসেফ মোট সাজা খেটেছেন ১২ বছর ১২ দিন এবং সাজা মওকুফ (রেয়াত) পেয়েছেন ৯ মাস ১৪ দিন। তাঁর সম্ভাব্য মুক্তির তারিখ জরিমানা দিলে ২০৩৮ সালের ২৪ জানুয়ারি। আর জরিমানা না দিলে ২০৩৯ সালের ২৪ জানুয়ারি।
জানতে চাইলে মানবাধিকারকর্মী ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা সুলতানা কামাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘আইন হচ্ছে ন্যায়বিচারের জন্য। কিন্তু আমরা বিচারব্যবস্থাকে ক্ষমতার স্বার্থে ব্যবহার করে অপব্যবহার করছি। শীর্ষ সন্ত্রাসী, দলীয় লোকদের সাজা মওকুফ করে এমন বার্তা দিচ্ছি যে মানুষ কার ওপর আস্থা রাখবে বুঝতে পারছে না। এ বিষয়ে বুদ্ধিসম্পন্ন লোক ও জনগণের সোচ্চার হওয়া দরকার।’
১৯৯৬ সালের ৭ মে মোহাম্মদপুরে ব্যবসায়ী মোস্তাফিজুর রহমানকে গুলি করে হত্যা মামলার আসামি এই জোসেফ। ২০০৪ সালের ২৫ এপ্রিল ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল মামলার অন্যতম আসামি জোসেফ ও মাসুদ জমাদারকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেন এবং অন্য তিন আসামি আনিস আহমেদ, হারিস আহমেদ ও কাবিল সরকারকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ দেন।
পরে বিচারিক আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করেন জোসেফ, মাসুদ ও কাবিল। আসামি আনিস ও হারিস পলাতক থাকায় তাঁরা আপিল করতে পারেননি। ২০০৭ সালের ২০ সেপ্টেম্বর হাইকোর্টের রায়ে জোসেফ ও কাবিলের সাজা বহাল থাকে এবং মাসুদ খালাস পান। এ ছাড়া অস্ত্র মামলায় জোসেফসহ অন্য আসামিদের ১২ বছর ও ৭ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
কারা সূত্র জানায়, তৎকালীন সরকার কয়েকজন শীর্ষ সন্ত্রাসীকে ধরতে পুরস্কার ঘোষণা করে। ওই তালিকায় সন্ত্রাসী জোসেফকে ধরিয়ে দিতে ৫০ হাজার টাকা পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। এর বছর খানেক পর জোসেফকে নারায়ণগঞ্জ এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। সেই থেকে কারাবন্দী তিনি।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মিজানুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, রাষ্ট্রপতির যে বিশেষ ক্ষমতা রয়েছে, তা প্রয়োগ করতে হবে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে। যারা ফৌজদারি অপরাধ করেছে, আদালত যাদের সর্বোচ্চ সাজা দিয়েছেন, তাদের ক্ষেত্রে কোনোভাবেই এই বিশেষ ক্ষমা গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি বলেন, অপরাধীদের ক্ষমা করে দেওয়ার জন্য যখন কারা অধিদপ্তর বা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হয়, তখন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে, এ ধরনের আবেদন তাঁরা নথিভুক্ত করবেন কি না, বা আমলে নেবেন কি না। কেননা, যখন আবেদন নথিভুক্ত হয়ে যায়, তখন সরকারসহ সবার দায়বদ্ধতা চলে আসে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মোহাম্মদপুর এলাকার ছাত্রলীগ নেতা ছিলেন জোসেফ। জোসেফের বাবা ওয়াদুদ আহমেদ ছিলেন বিমানবাহিনীর কর্মকর্তা। পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে সবার ছোট জোসেফ বড় ভাই হারিস আহমেদের হাত ধরে রাজনীতির মাঠে পদার্পণ করেন। নব্বইয়ের দশকে জাতীয় পার্টি ছেড়ে হারিস যোগ দিয়েছিলেন যুবলীগে। তৎকালীন ৪৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলরও হয়েছিলেন তিনি। জোসেফ তাঁর বড় ভাইয়ের ক্যাডার বাহিনীর প্রধানের দায়িত্ব পালন করেন। এরপর থেকে মোহাম্মদপুর-হাজারীবাগসহ আশপাশের এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেন। যোগ দেন সুব্রত বাইনের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা আলোচিত সেভেন স্টার গ্রুপে। পুরো রাজধানী তখন সেভেন স্টার গ্রুপ ও ফাইভ স্টার গ্রুপ নামে দুটি বাহিনী নিয়ন্ত্রণ করত। এভাবেই শীর্ষ সন্ত্রাসীদের তালিকায় নাম উঠে আসে জোসেফের।