খুনি বিপ্লবের আরও সাজা মাফের তোড়জোড়

745
রোজিনা ইসলাম | আপডেট: ০১:৫০, জুন ১৭, ২০১৬ | প্রিন্ট সংস্করণ

তাহেরপুত্র বিপ্লবলক্ষ্মীপুরের তাহেরপুত্র এইচ এম বিপ্লব ফাঁসির দণ্ড থেকে মাফ পাওয়ার পর একের পর এক বিশেষ সুবিধা পেয়েই যাচ্ছেন। রাষ্ট্রপতির ‘বিশেষ ক্ষমায়’ একটি হত্যা মামলায় ফাঁসির দণ্ড থেকে রেহাই ও দুটি হত্যা মামলায় যাবজ্জীবন সাজা আংশিক মওকুফ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুপারিশে একটি হত্যা মামলা থেকে নাম প্রত্যাহারের পর বিপ্লবের আরও এক বছর ছয় মাস চার দিন সাজা মাফ করেছে কারা কর্তৃপক্ষ। বাকি সাজা মাফ করাতেও চলছে তোড়জোড়।
‘মানবিক দিক’ বিবেচনায় বিপ্লবের আরও ৬০ দিন সাজা মাফের (জেল রেয়াত সুবিধা) জন্য সম্প্রতি কারা মহাপরিদর্শকের কাছে আবেদন করা হয়েছে। আবেদনের কথা প্রথম আলোকে নিশ্চিত করেছেন বিপ্লবের ভাই সদর উপজেলা চেয়ারম্যান ও যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক এ কে এম সালাউদ্দিন (টিপু)।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা আবেদন পেয়েছি। এবার আইন মন্ত্রণালয়ের মতামত চাইব। মতামত পেলে পরবর্তী ব্যবস্থা নেব।’
লক্ষ্মীপুর পৌরসভার মেয়র ও আওয়ামী লীগের বিতর্কিত নেতা আবু তাহেরের ছেলে বিপ্লব বর্তমানে লক্ষ্মীপুর কারাগারে সব সুযোগ-সুবিধা নিয়ে কারাভোগ করছেন। কারাগারে থেকে ২০১৪ সালে তিনি বিয়েও করেছেন।
কারা কর্তৃপক্ষের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, কয়েদির কাজ ও ভালো আচরণ দেখে সন্তুষ্ট হলে সংশ্লিষ্ট কারাগারের তত্ত্বাবধায়ক প্রতি মাসে সর্বোচ্চ সাত-আট দিন সাজা মওকুফ করতে পারেন। এটাকে বলা হয় জেল রেয়াত। সাধারণত তিন মাস পর পর এ ধরনের সাজা মাফের হিসাব হালনাগাদ করা হয়। এ ছাড়া টানা ভালো আচরণ ও ভালো কাজ করলে প্রতি তিন বছরে আরও ৬০ দিন সাজা মওকুফ করতে পারেন কারা মহাপরিদর্শক।
বিপ্লবের মতো দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী, যিনি তিনটি পৃথক খুনে জড়িত ছিলেন বলে আদালতে প্রমাণিত হয়েছে এবং টানা ১০ বছর পলাতক ছিলেন, তাঁকেও কারা কর্তৃপক্ষ ৫৪৯ দিন জেল রেয়াত দিয়েছে। তিনি ২০১১ সালে আত্মসমর্পন করার পর প্রতিবছর গড়ে ১১০ দিন করে এই সাজা মাফ পেয়েছেন।
বিপ্লবের এই সাজা কমানোর তথ্য নিশ্চিত করে লক্ষ্মীপুর কারাগারের তত্ত্বাবধায়ক ফণীভূষণ দেবনাথ গত রাতে মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, বিপ্লব ভালো আচরণ ও ভালো কাজ করায় তাঁকে এই জেল রেয়াত দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, এই জেল রেয়াত তিন মাস পর পর হালনাগাদ করা হয়। বিপ্লব ২০১৯ সালে মুক্তি পাওয়ার কথা। রেয়াত সুবিধা কার্যকর হওয়ার পর তিনি ২০১৭ সালের শেষের দিকে মুক্তি পাবেন।
লক্ষ্মীপুর জজকোর্টের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) জসিম উদ্দিন গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিপ্লব বর্তমানে কামাল ও মহসিন হত্যা মামলায় জেলে রয়েছেন। ইতিমধ্যে তাঁর এক বছর ছয় মাস চার দিন সাজা মাফ করেছে কারা কর্তৃপক্ষ। আমাদের পক্ষ থেকে বিজয় দিবসে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি আবেদন করা হয়।’
বিপ্লবের আরও ৬০ দিনের সাজা মওকুফ করতে বিপ্লবের মা নাজমা সুলতানা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেন। সরকারের ঊর্ধ্বতন ব্যক্তিদের সুপারিশে আবেদনটি বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট একধিক সূত্র জানায়।
বিপ্লবের মায়ের আবেদনে বলা হয়, ‘লক্ষ্মীপুর জেলা কারাগারে সাজা ভোগরত বিপ্লব অত্যন্ত বিনয়ী, ধার্মিক, আদর্শবান, কঠোর পরিশ্রমী ও মেধাবী। সে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে মিথ্যা ও ষড়যন্ত্রমূলকভাবে সাজানো মামলায় অন্য সদস্যদের মতো আমার বড় সন্তান বিপ্লবকেও জড়ানো হয়।’
মামলার নথিপত্র থেকে জানা যায়, বিপ্লবের বিরুদ্ধে হওয়া সব মামলাই বিগত আওয়ামী লীগ সরকার আমলের (১৯৯৬-২০০১)। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ১০ বছর তিনি পলাতক ছিলেন।
লক্ষ্মীপুরের বহুল আলোচিত আইনজীবী নুরুল ইসলাম হত্যা মামলায় বিপ্লবের মৃত্যুদণ্ড হয়েছিল। ২০১১ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান তাঁর সেই সাজা মাফ করে দেন। পরের বছর আরও দুটি হত্যা মামলায় (কামাল ও মহসিন হত্যা) বিপ্লবের যাবজ্জীবন সাজা কমিয়ে ১০ বছর করেন রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান। বাকি ছিল ফিরোজ হত্যা মামলা। ২০১২ সালের নভেম্বরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ‘রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহারসংক্রান্ত জাতীয় কমিটির’ সুপারিশে সেই মামলা থেকেও বিপ্লবের নাম প্রত্যাহার করা হয়। তার আগে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পরপর জাহেদ হত্যা ও এতিমখানায় অগ্নিসংযোগের মামলা থেকে বিপ্লবের নাম প্রত্যাহার করে নেয় রাষ্ট্রপক্ষ।
বিশিষ্ট আইনজীবী শাহদীন মালিক প্রথম আলোকে বলেন, বিপ্লবকে যেসব সুবিধা এ পর্যন্ত দেওয়া হয়েছে, তার সবই রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। ভালো কাজের জন্য যত সুযোগ-সুবিধা আইনে বলা আছে, সবই এই আসামির ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হচ্ছে।
স্থানীয় একাধিক রাজনৈতিক নেতা প্রথম আলোকে বলেন, সন্ত্রাসী বিপ্লবকেন্দ্রিক এই রাষ্ট্রীয় তৎপরতার ফলে আবারও শঙ্কিত হয়ে পড়ছেন এলাকার রাজনৈতিক নেতা-কর্মীরা। লক্ষ্মীপুর আবারও ‘সন্ত্রাসের জনপদ’ অভিধা পেতে পারে বলে আশঙ্কা তাঁদের।
স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, বিগত (১৯৯৬-২০০১) আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আবু তাহের ও তাঁর ছেলেদের নেতৃত্বে সন্ত্রাসী বাহিনীর নানা অপরাধমূলক তৎপরতার কারণে লক্ষ্মীপুর ‘সন্ত্রাসের জনপদ’ নামে পরিচিতি পায়। বিপ্লব ছিলেন তখন এলাকায় মূর্তিমান আতঙ্ক।