বাজেট ২০১৬–১৭: বাজেটে প্যাকেজ মূসক থাকছে

519
রোজিনা ইসলাম ও জাহাঙ্গীর শাহ | আপডেট: ০২:০০, জুন ০১, ২০১৬ | প্রিন্ট সংস্করণ

.ছোট ব্যবসায়ীদের দাবি শেষ পর্যন্ত মেনে নিতে যাচ্ছেন অর্থমন্ত্রী। আগামী অর্থবছরেও প্যাকেজ মূল্য সংযোজন কর (মূসক) ব্যবস্থা বহাল থাকছে। তবে পরিমাণ বেশ বাড়ানো হচ্ছে। এ ছাড়া, আগামী ১ জুলাই থেকে নতুন মূসক আইন বাস্তবায়ন না করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত আগামী বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ২০১৬-১৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট পেশ করবেন। সেখানে অর্থমন্ত্রী নিজেই এ ঘোষণা দিতে পারেন বলে অর্থ মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে জানা গেছে।
এনবিআরের সূত্রগুলো বলছে, আগামী অর্থবছরে ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এলাকায় প্যাকেজ মূসকের পরিমাণ সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা করা হতে পারে। বর্তমানে এসব এলাকায় প্যাকেজ মূসকের পরিমাণ ১৪ হাজার টাকা। বর্তমানে প্যাকেজ মূসকের পরিমাণ অন্য সিটি করপোরেশন এলাকায় ১০ হাজার টাকা এবং জেলা শহরের পৌর এলাকায় ৭ হাজার ২০০ টাকা। এ দুটি এলাকায়ও টাকার পরিমাণ ৮০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হতে পারে। এ ছাড়া অন্য এলাকায় ৩ হাজার ২০০ টাকার পরিবর্তে ৬ হাজার টাকার প্রস্তাব করা হতে পারে।
প্যাকেজ মূসক থেকে এনবিআর খুব বেশি অর্থ পায় না। এ খাত থেকে প্রতিবছর গড়ে ১০ কোটি টাকার মতো রাজস্ব আসে। মূলত ছোট দোকানদার ও খুচরা ব্যবসায়ীরা বার্ষিক থোক হিসেবে এ প্যাকেজ মূসক দেন। বর্তমানে আড়াই লাখ প্রতিষ্ঠানের মূসক নিবন্ধন আছে। এর মধ্যে মাত্র ৬৮ হাজার প্রতিষ্ঠান প্যাকেজ মূসক দেয়। নতুন আইনে প্যাকেজ মূসক ব্যবস্থা বাতিল করে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত বার্ষিক টার্নওভারে মূসক অব্যাহতির সুযোগ রাখা হয়েছে। কিন্তু প্যাকেজ মূসক ব্যবস্থা বহাল রাখার দাবিতে সারা দেশের ছোট ব্যবসায়ীরা আন্দোলন করছেন।
ব্যবসায়ী ঐক্য ফোরামের সাধারণ সম্পাদক আবু মোতালেব অবশ্য প্রথম আলোকে বলেন, টাকার পরিমাণ এত বেশি হলে দেওয়া সম্ভব নয়। এটা সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনতে হবে। এফবিসিসিআইয়ের সুপারিশ অনুযায়ী ঢাকা সিটি করপোরেশনে ১৮ হাজার টাকা হলে ছোট ব্যবসায়ীদের প্রত্যেকেই মূসক দিতে পারবে।
আয়কর: তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকদের ওপর রপ্তানিকালে উৎসে কর বাড়ানো হচ্ছে। নিট, ওভেন, টেরিটাওয়েল, কার্টন ও সরঞ্জামাদি রপ্তানির ক্ষেত্রে এ হার ১ শতাংশ করা হতে পারে। বর্তমানে এসব পণ্য রপ্তানি করলে দশমিক ৬০ শতাংশ কর দিতে হয়। তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকের রপ্তানি মূল্যের (এফওবি মূল্য) এ উৎসে কর দেন, যা চূড়ান্ত কর দায় হিসেবে বিবেচিত।
উৎসে কর বাড়ানো হলেও তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের করপোরেট কর হার অবশ্য কমানো হচ্ছে। এ হার হতে পারে ১৫ শতাংশ। বর্তমানে ৩৫ শতাংশ হারে তৈরি পোশাক খাতের ওপর করপোরেট কর আরোপ আছে।
এ বিষয়ে তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকের সংগঠন বিজিএমইএর সহসভাপতি মাহমুদ হাসান খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা উৎসে কর শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ করার দাবি করেছি। এটি না করে উল্টো যদি বাড়ানো হয়, তবে ছোট ও মাঝারি পোশাক কারখানা শেষ হয়ে যাবে।’ এমনিতেই তাঁরা ক্রেতাদের দুই জোট অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্সের কারখানা পরিদর্শন নিয়ে একধরনের চাপের মধ্যে আছেন। তাঁর মতে, করপোরেট কর যদি দাবি অনুযায়ী ১০ শতাংশ করা না হয়, তবে বিনিয়োগ হবে না। কেননা নতুন প্রস্তাবে কারখানার মালিকদের প্রদর্শিত মুনাফার পরিমাণ কম হবে, তাতে বিনিয়োগের জন্য সম্পদও কমে যাবে।
এ ছাড়া হিমায়িত খাদ্য, পাট, চামড়া, সবজি ও প্যাকেটজাত খাদ্য রপ্তানি করলেও উৎসে কর ১ দশমিক ২০ শতাংশ করার প্রস্তাব আসছে।
এদিকে ব্যক্তিশ্রেণির করমুক্ত আয়সীমা না বাড়লেও করপোরেট কর হারও পুনর্বিন্যাস করা হচ্ছে। শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত নয়, এমন কোম্পানির ক্ষেত্রে ব্যবসায় ও উৎপাদক এ দুটি ক্যাটাগরি করা হবে। উৎপাদক কোম্পানিকে কিছুটা ছাড় দিয়ে ব্যবসায় কোম্পানির চেয়ে আড়াই শতাংশ কম করপোরেট কর আরোপ হতে পারে।
ফ্ল্যাট কিনে কালোটাকা সাদা করার সুযোগ আগামী অর্থবছরেও অব্যাহত থাকবে। এখন আয়তনভিত্তিক নির্দিষ্ট পরিমাণ কর দিয়ে ফ্ল্যাট কেনা যায়। এ ক্ষেত্রে বিনিয়োগের উৎস জানাতে হয় না। এ ছাড়া শেয়ারবাজারে ছোট বিনিয়োগকারীদের কিছুটা ছাড় দেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত মুনাফায় কর নেই, এ সীমা কিছুটা বাড়ানো হতে পারে।
শুল্ক: শুল্ক স্তরে বড় পরিবর্তন আনা হচ্ছে। বর্তমানে আমদানি পর্যায়ে ১, ৫, ১০ ও ২৫—এ চার স্তরের আমদানি শুল্ক আছে। আগামী অর্থবছরে ১৫ শতাংশের আরেকটি নতুন স্তর তৈরি করা হচ্ছে। এনবিআরের প্রস্তাব অনুযায়ী, নতুন শুল্ক স্তর হবে ১, ৫, ১০, ১৫ ও ২৫ শতাংশ। এ ছাড়া নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক হার ৪ থেকে কমিয়ে ৩ শতাংশ করা হতে পারে। আর আমদানি পর্যায়ে শ খানেক পণ্যের ওপর সম্পূরক শুল্ক হ্রাস বা প্রত্যাহার করা হচ্ছে।
আমদানি শুল্কের ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ ও ২৫ শতাংশের স্তরে থাকা কিছু পণ্য ১৫ শতাংশ শুল্ক স্তরে নেওয়া হবে। এর ফলে কিছু পণ্যের আমদানি খরচ বাড়তে পারে, আবার কিছু পণ্যের আমদানি খরচ কমতে পারে।
১০ শতাংশ থেকে ১৫ শতাংশ শুল্ক স্তরে যাচ্ছে, এমন পণ্যের মধ্যে রয়েছে কর্নফ্লাওয়ার, ফাইবার অপটিক কেব্ল, ভার্নিশ রিমুভার, ট্যালকম পাউডার। আমদানি করা এসব পণ্যের দাম বাড়তে পারে।
এ ছাড়া ২৫ শতাংশ থেকে ১৫ শতাংশ স্তরে নামানো হচ্ছে, এমন পণ্যের মধ্যে রয়েছে সিম ও স্মার্ট কার্ডের ওপর স্ক্র্যাপের প্রলেপ বা কো-পলিমার কোটেড অ্যালুমিনিয়াম, ওয়াই-ফাই ও ওয়াইম্যাক্স ল্যান্ড কার্ড, অ্যাকসেস পয়েন্ট, ফায়ারওয়াল, পেট্রোলিয়াম জেলি (লিপ জেল), এলপিজি সিলিন্ডার (গ্যাস সিলিন্ডার), টায়ার-টিউব শিল্পে ব্যবহৃত গাম রেজিন, ইলেকট্রিক্যাল পণ্যের কাঁচামাল ইউরিয়া রেজিন। এসব পণ্যের দাম কমতে পারে।
আগামী বাজেটে শিশু-কিশোরেরাও বাদ যাচ্ছে না। দেশীয় প্রকাশনাশিল্পকে সুরক্ষা দিতে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যপুস্তক আমদানিতে আমদানি শুল্ক ১০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করা হতে পারে। আবার শিশুদের আঁকার বইয়ের ওপর আমদানি শুল্ক ৫ থেকে ১০ শতাংশ বৃদ্ধি করা হতে পারে। শিশুখাদ্য সাগুর ওপর শুল্ক বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করা হচ্ছে।
স্থানীয় কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে চাল আমদানিতে ১০ শতাংশের পরিবর্তে ২৫ শতাংশ করা হচ্ছে। তামাক ও তামাকজাতীয় পণ্য (বিড়ি বা সিগারেট) তৈরির যন্ত্রপাতি আমদানিতে আমদানি শুল্ক ১ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করা হতে পারে।
এ ছাড়া কিছু পণ্য আমদানির ওপর নতুন করে শুল্ক বসানো হচ্ছে। এর মধ্যে ফিঙ্গার প্রিন্ট স্ক্যানার, বায়োমেট্রিক স্ক্যানারে ৫ শতাংশ, মশা মারার ব্যাটে ২৫ শতাংশ শুল্ক বসতে পারে। মরদেহ রাখার জন্য মরচুয়ারি আমদানিতে ৩০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক তুলে নেওয়া হচ্ছে। আর এলইডি ল্যাম্পের ওপর আমদানি শুল্ক তুলে দেওয়া হচ্ছে।
দেশীয় কৃষি যন্ত্রপাতি প্রস্তুতকারকদের জন্য সুখবর আছে। বর্তমানে কৃষি খাতে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি আমদানিতে কোনো আমদানি শুল্ক নেই। এসব যন্ত্রপাতি আমদানিতে ১ শতাংশ শুল্ক বসছে।
তবে আবাসিক হোটেল নির্মাতার জন্য বাজেটে ভালো খবর নেই। অতি বিনিয়োগ প্রবণতা রোধে এসব অবকাঠামো নির্মাণে ব্যবহৃত উপকরণ আমদানিতে শুল্ক দ্বিগুণ হয়ে ১০ শতাংশ করা হতে পারে।
জনসাধারণের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখার জন্য অন্যবারের মতো ডাল, গম, ভোজ্যতেল, পেঁয়াজ আমদানিতে বিদ্যমান সুবিধা অব্যাহত থাকবে। ওষুধশিল্পের জন্য শুল্ক রেয়াত সুবিধা অব্যাহত থাকবে। নির্মাণ খাতে ব্যবহৃত সিমেন্টের কাঁচামাল ফ্লাই অ্যাশ, বড় পাথর (বোল্ডার) ও ছোট পাথর আমদানিতে শুল্ক কমানো হতে পারে।