জঙ্গিগোষ্ঠীর সাম্প্রতিক হামলা: সরকারি হিসাবের সঙ্গে বাস্তবের মিল নেই

532
রোজিনা ইসলাম | আপডেট: ০২:২২, মে ০১, ২০১৬ | প্রিন্ট সংস্করণ

ব্লগার হত্যা ও জঙ্গিগোষ্ঠীর হামলার সংখ্যা নিয়ে সরকারের দেওয়া তথ্যের সঙ্গে বাস্তবের কোনো মিল নেই। এ-সংক্রান্ত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক হিসাবে গত তিন বছরে (জানুয়ারি ২০১৩ থেকে) ২৫টি হামলার কথা বলা হয়েছে। এসব হামলায় নিহত হয়েছেন ১৯ জন। আর ছয়টি ঘটনা হলো হত্যাচেষ্টার লক্ষ্যে হামলা। কিন্তু বাস্তবে গত তিন বছরে দেশে এ ধরনের ৪২টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এতে নিহত হন মোট ৪২ জন।
এই হিসাবে গত সোমবার রাজধানীর কলাবাগানে জুলহাজ মান্নান ও মাহবুব তনয় হত্যার ঘটনা ধরা হয়নি। এই জোড়া খুনের পরপর এর আগের মামলাগুলোর অবস্থা বা অগ্রগতিবিষয়ক স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নথিতে ২৫টি হামলার কথা বলা হয়।
কিন্তু বাস্তবে এই জোড়া খুনের আগ পর্যন্ত ৪২টি হামলার ঘটনা গণমাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে। তারপরও কেন ১৭টি হামলার ঘটনা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আমলে নেয়নি? এ প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল গতকাল শনিবার প্রথম আলোকে বলেন, ‘চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই বা ছোট ঘটনাকে তো আমরা ব্লগার হত্যা বা জঙ্গিদের মাধ্যমে হত্যা হয়েছে বলতে পারি না। আমাদের হিসাবে গত তিন বছরে ২৫টি হত্যা বা হত্যাচেষ্টার ঘটনা ঘটেছে। আমরা অনেকগুলোর অভিযোগপত্র দিয়েছি।’
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকা থেকে যেসব ঘটনা বাদ পড়েছে, সেগুলো হলো ২০১৩ সালের ৮ আগস্ট খুলনায় উম্মুল মোমেনিন দাবিদার কথিত ধর্মীয় নেতা তৈয়বুর রহমান ও তাঁর ছেলেকে জবাই করে হত্যা, ওই বছরের ২১ ডিসেম্বর ঢাকায় ইমাম মাহদীর প্রধান সেনাপতি দাবিদার লুৎফর রহমানসহ ছয়জনকে জবাই, ২০১৪ সালের ২৬ আগস্ট টেলিভিশন উপস্থাপক মাওলানা নুরুল ইসলাম ফারুকীকে জবাই, ২৩ ফেব্রুয়ারি ময়মনসিংহে প্রিজন ভ্যানে হামলা এবং এক পুলিশকে হত্যা করে জেএমবির দণ্ডপ্রাপ্ত তিন শীর্ষ নেতাকে ছিনিয়ে নেওয়া, গত বছরের ২১ এপ্রিল আশুলিয়ায় বাংলাদেশ কর্মাস ব্যাংকে ডাকাতি ও আটজনকে হত্যা, ৪ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামে লেংটা ফকির রহমতউল্লাহ ও তাঁর খাদেমকে জবাই, ১২ নভেম্বর সৈয়দপুরে শিয়া সম্প্রদায়ের এক ব্যক্তিকে হত্যাচেষ্টা, ১৮ নভেম্বর দিনাজপুরে খ্রিষ্টান মিশনারির ফাদার পিয়েরো পিচমকে গুলি করে হত্যাচেষ্টা, ৩০ নভেম্বর দিনাজপুরের চিরিরবন্দরে ইসকনের এক নেতাকে গুলি করে হত্যাচেষ্টা, ১০ ডিসেম্বর দিনাজপুরে ফিলিং স্টেশনে ডাকাতি ও এক জঙ্গির মৃত্যু, একই দিন চুয়াডাঙ্গায় এক সাধুকে কুপিয়ে হত্যা, ১২ ডিসেম্বর চুয়াডাঙ্গার একটি দরবার শরিফে ওরসে হামলা, ১৮ ডিসেম্বর চট্টগ্রামে নৌবাহিনীর ঘাঁটির দুটি মসজিদে জুমার নামাজের সময় বোমা হামলা, চলতি বছরের ৭ জানুয়ারি ঝিনাইদহে খ্রিষ্টধর্মে ধর্মান্তরিত ছামির আলীকে হত্যা, ১৪ মার্চ ঝিনাইদহে শিয়া মতাদর্শের আবদুর রাজ্জাককে কুপিয়ে হত্যা এবং ২৩ এপ্রিল গোপালগঞ্জে হিন্দু সাধু পরমানন্দকে হত্যা।
এসব ঘটনার মধ্যে সাতটিতে জেএমবি জড়িত বলে পুলিশের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে বলা হয়েছে। চারটিতে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক জঙ্গিগোষ্ঠী আইএস (ইসলামিক স্টেট) দায় স্বীকার করেছে। বাকিগুলোতেও জেএমবি প্রধান সন্দেহভাজন।
এ ছাড়া পাঁচটি মামলায় আসামি গ্রেপ্তার আছেন, যাঁরা জেএমবির সদস্য। একটিতে এক জঙ্গি আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি, অপর একটিতে পুলিশ অভিযোগপত্র দিয়েছে। বাকি মামলার কোনো কুলকিনারা এখনো করতে পারেনি পুলিশ।
সরকারি হিসাবের সঙ্গে বাস্তবের এই অমিলের কারণ কী হতে পারে, জানতে চাইলে পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক মো. নুরুল হুদা প্রথম আলোকে বলেন, গণমাধ্যম যেভাবে ঘটনাগুলোকে গুরুত্ব দিয়েছে, মামলার ক্ষেত্রে হয়তো সেভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। এ কারণে হয়তো সংখ্যার এই ব্যত্যয় হয়েছে।
অপর দিকে সরকারি হিসাবে যে ২৫টি হামলার উল্লেখ করা হয়েছে, তার মধ্যে কেবল একটির (ব্লগার রাজীব হত্যা) বিচার শেষ হয়েছে। চারটির বিচার চলছে। বাকি ২০টি মামলার তদন্ত চলছে বলে নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
সরকারি নথিতে তদন্ত চলছে বলা হলেও বাস্তবে কয়েকটি ছাড়া বেশির ভাগ মামলার কোনো কুলকিনারা করতে পারেনি পুলিশ। এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, অনেক ক্ষেত্রে সন্দেহভাজন আসামি গ্রেপ্তার করা হলেও জড়িত ব্যক্তিদের ব্যাপারে বিস্তারিত কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। জঙ্গিগোষ্ঠীর সদস্যদের অনেক ছদ্মনাম থাকে। ফলে প্রকৃত নাম-ঠিকানা বের করতে বেগ পেতে হয়। এ ছাড়া এ ধরনের মামলার তদন্তে দক্ষ কর্মকর্তারও অভাব রয়েছে।