স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের সাক্ষাৎ​কার: আইএস ঘাঁটি গাড়তে পারেনি

771
সোহরাব হাসান ও রোজিনা ইসলাম | আপডেট: ০২:২৮, এপ্রিল ২৭, ২০১৬ | প্রিন্ট সংস্করণ

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানজঙ্গি তৎপরতা দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের অংশ। আইএসের নামে জঙ্গিরা এ দেশে এসেছিল দু–একবার। কিন্তু তারা ঘাঁটি গাড়তে পারেনি। এদের বিরুদ্ধে সরকারের অবস্থান কঠোর। হয় তারা গ্রেপ্তার হবে, নয় দেশ থেকে পালাতে হবে। বাংলাদেশে কোনো জঙ্গি থাকতে পারবে না।
রাজশাহীতে শিক্ষক এবং ঢাকায় জোড়া খুনের প্রেক্ষাপটে প্রথম আলোকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এসব কথা বলেন। সাক্ষাৎ​কার নিয়েছেন সোহরাব হাসান রোজিনা ইসলাম


প্রথম আলো:
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে। পুলিশ কিছুই করতে পারছে না?

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী: এটা ঠিক নয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আমাদের পুলিশ ও গোয়েন্দারা কাজ করছে। এ কারণে আমরা ১০০ শতাংশ না পারলেও ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ ঘটনা বের করে ফেলেছি। অস্বীকার করার উপায় নেই যে অপরাধীরা যেসব প্রযুক্তি ব্যবহার করছে, সেই তুলনায় পুলিশের প্রশিক্ষণের ঘাটতি রয়েছে, দক্ষতার অভাব রয়েছে। তারপরও আমরা প্রশিক্ষণের জন্য তাদের বিভিন্ন স্থানে পাঠাচ্ছি। অভিজ্ঞদেরও এসব কাজে লাগাচ্ছি। পুলিশ এখন অনেক তৎপর।

প্রথম আলো: ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর জঙ্গিবিরোধী অভিযানে সরকারের অনেক সফলতা ছিল। কিন্তু এরপর রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার পাশাপাশি জঙ্গি তৎপরতা বেড়েছে। তারা কৌশল পরিবর্তন করেছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী: এটা ঠিক। এদের কৌশল পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সবকিছু পরিবর্তন হয়ে গেছে। এখন জঙ্গিরা মুঠোফোন ব্যবহার করে না। যদিও করে, সিম সঙ্গে সঙ্গে নষ্ট করে ফেলে। তারা ভাইবার, ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে।

প্রথম আলো: সমস্যাটি শুধু আইন-শৃঙ্খলাজনিত না রাজনৈতিকও? সে ক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে রাজনৈতিক কোনো উদ্যোগ আছে কি?

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী: অবশ্যই রাজনৈতিক কারণ আছে। সরকার এ পরিস্থিতি রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলায়ও কাজ করছে। রাজনৈতিক দলগুলো ধীরে ধীরে তাদের অবস্থান পরিবর্তন করছে।

প্রথম আলো: বিএনপির পক্ষ থেকেও তো বলা হচ্ছে তারা সহযোগিতা করতে চায়।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী: আসলে দেশে যতগুলো হত্যাকাণ্ড হয়েছে, সবগুলো ষড়যন্ত্র। সবগুলোর সঙ্গে বিএনপি-জামায়াত জড়িত রয়েছে। এসব ষড়যন্ত্র যখন বন্ধ হবে, তখন বলা যাবে তারা সহযোগিতা করতে চায়।

প্রথম আলো: এগুলোর সঙ্গে বিএনপি-জামায়াত যে জড়িত তার প্রমাণ কী?

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী: তাবেলা সিজারের ঘটনাটিতে আমরা প্রমাণ পেয়েছি। তাবেলা সিজারকে মেরে ফেলতে ছয় লাখ টাকায় চুক্তি হয়েছিল। পিস্তল কে দিয়েছিল, মোটরসাইকেল কে দিয়েছিল, তাদের আমরা চিহ্নিত করেছি।

কুনিও হোশির বিষয়টিও একই রকম। এ ছাড়া পঞ্চগড়ের ঘটনায় একই প্রমাণ মিলেছে। অর্থ বিনিয়োগ করেছে, একইভাবে টার্গেট কিলিং হয়েছে, নির্ধারিত লোক করেছে—এসব ক্ষেত্রে বিএনপি-জামায়াতের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া গেছে।

প্রথম আলো: যেকোনো অঘটন ঘটলে দেখা যায় পুলিশ প্রথমদিকে তৎপর থাকে। পরে স্তিমিত হয়ে যায়। কেন?

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী: আসলে একটার পর একটা ঘটনা ঘটে যায়। যেহেতু দক্ষ লোকের অভাব রয়েছে তাই যেখানে বেশি প্রয়োজন, সেখানে তারা কাজ করে। যেমন আমরা কাশিমপুরের ঘটনায় জড়িতদের ধরে ফেলতে পারব। এরপর জোড়া খুনের তদন্তও তারা করছে।

প্রথম আলো: আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আছে সাড়ে সাত বছর। কেন এখনো জঙ্গি হামলা বন্ধ হলো না। যখন কাউকে হত্যা করা হয়, তখনই সরকার থেকে মুক্তবুদ্ধির চর্চাকারীদের সতর্ক করা হয়। এতে কি জঙ্গিদের উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে না?

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী: না, প্রশ্নই আসে না। আপনারা নিশ্চিত থাকেন জঙ্গি গোষ্ঠীকে যেভাবে চেপে ধরেছি, তাতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে।

প্রথম আলো: গত আড়াই বছরে আপনার দায়িত্বকালে যতগুলো হত্যা হয়েছে, তার কয়টায় অপরাধী আটক বা বিচার হয়েছে?

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী: ব্লগারদের মধ্যে অভিজিৎ ছাড়া সবগুলোর আততায়ী চিহ্নিত হয়েছে। অভিজিৎ হত্যার পরিকল্পনাকারী কে তা আমরা জানি। কিন্তু এখনো অনেক তথ্য প্রয়োজন। হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি এখনো ধোঁয়াশা।

প্রথম আলো: আপনি বলেন হোম গ্রোন জঙ্গি। কিন্তু নিশ্চয়ই এদের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক রয়েছে। আপনি বলছেন আইএস নেই। কিন্তু আইএস হিসেবে তো অনেককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী: আমি সব সময় বলেছি, আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র রয়েছে। কিন্তু আইএস নামে যে একটা অর্গানাইজড সন্ত্রাসী চক্র রয়েছে, সেটার সঙ্গে এদের সম্পর্ক নেই।

প্রথম আলো: ২০১৩-১৪ সালে জঙ্গি ঘটনায় অনেকগুলো মামলা হয়েছে, যাদের আইএসের বাংলাদেশ সমন্বয়কারী হিসেবে অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী: হ্যাঁ, আমরা তো সেগুলো বলছি। একজন না দুজন ছিল, বাংলাদেশ বংশোদ্ভূত ইংল্যান্ডের এক নাগরিক এখানে এসেছিলেন, চেষ্টা করছিলেন, তাকে আমরা ধরে ফেলার আগেই চলে গিয়েছে। এবং আরেকজনকে আমরা ধরেছি। আইএস ট্যাবলেট গেলানোর জন্য এখানে মাঝে মাঝে এসেছে, কিন্তু আমরা সেগুলো ধরে ফেলেছি। আমাদের জনগণ কাউকে সমর্থনও দেয়নি, কোনো ভিত্তি রচনা করতেও পারেনি, ঘাঁটি গাড়তেও পারেনি।

প্রথম আলো: আইএসের সঙ্গে আনসারুল্লাহ বাংলা টিম, জেএমবি ও হুজিবির সম্পর্ক রয়েছে কি না?

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী: দেশের অভ্যন্তরে জঙ্গি সন্ত্রাসীরা সব সময়ই ছিল। এরা একেক সময় একেক নাম ধরে আসে। প্রথমে এরা ইসলামী ছাত্রশিবির, সে সময় পা কাটত, হাত কাটত; এরপর জেএমবি, বাংলা ভাই, হুজি, আনসারুল্লাহ—নানা নামে এরা তৎপরতা চালাচ্ছে। কিন্তু আমরা ক্ষমতায় আসার পর এগুলো নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

প্রথম আলো: কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ চায় নিয়ন্ত্রণ নয়, এটা নির্মূল হোক।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী: আমরাও চাই নির্মূল হোক। এ জন্য আমরা মাদ্রাসায় মাদ্রাসায় গিয়ে ছাত্রদের সঙ্গে কথা বলছি। আমরা বলছি, তোমাদের দোষ দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু আর এখন তো দেখছি উচ্চশিক্ষিতরাও জড়িয়ে গেছে।

প্রথম আলো: জামায়াত ও হেফাজত দুটোই মৌলবাদী দর্শনে বিশ্বাসী। কিন্তু সরকারের অবস্থান ভিন্ন। হেফাজতকে প্রশ্রয় দেওয়া হচ্ছে বলে জনমনে ধারণা রয়েছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী: ধারণাটি ঠিক নয়। যারা জঙ্গি, যারা সন্ত্রাসী, তারা তো চিহ্নিত। হেফাজত যেটা করতে চেয়েছিল, সেটা ওই ২০ দলের নেতার যোগসাজশে। তারা তাদের ভুল বুঝেছে।

প্রথম আলো: এখন জামায়াত যদি ভুল স্বীকার করে, রাজনৈতিকভাবে সহযোগিতা চায়, সরকার কি সহযোগিতা করবে?

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী: তাদের অনেকের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে। আর জামায়াতকে প্রমাণ করতে হবে, তারা সন্ত্রাস করছে না।

প্রথম আলো: আর বিএনপি?

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী: আমরা তো বিএনপি বা কোনো রাজনৈতিক দলের টুঁটি চেপে ধরিনি। তারা তো রাজনীতি করছে।

প্রথম আলো: জনগণ নিরাপত্তাহীনতায় আছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী: আমরা ইতিমধ্যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে ফেলেছি। প্রতিনিয়ত আমরা জঙ্গিদের ওপর নজর রাখছি। দৌড়ের ওপরে রাখছি। এরা অত্যন্ত ধূর্ত। তবে এরা সবাই গ্রেপ্তার হবে, না হলে বাংলাদেশ থেকে পালাতে হবে। বিরোধী দল বা জঙ্গিদের বড় ধরনের আক্রমণ করার সক্ষমতা নেই।

প্রথম আলো: সাংবাদিক শফিক রেহমানের বিরুদ্ধে এখানে কেন মামলা হলো? বিষয়টি তো যুক্তরাষ্ট্রের।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী: আমাদের কাছে শফিক রেহমানের বিষয়ে যেসব তথ্য আছে, তাতে মামলার উপাদান রয়েছে। আদালতই এর বিচার করবেন।

প্রথম আলো: জোড়া খুন ও কাশিমপুর কারাগারের সামনে ঘটনার অপরাধীরা কবে ধরা পড়বে?

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী: এখনো বলার মতো সময় আসেনি। কিছু আলামত হত্যাকারীরা রেখে গেছে, প্রত্যক্ষদর্শীও রয়েছে। পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করতে টার্গেট কিলিং করা হচ্ছে। আমরা এর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছি। জুলহাজ ও তনয় হত্যাকাণ্ডের দায়িত্ব স্বীকার করে আল-কায়েদার নামে বার্তা এসেছে। রাবি শিক্ষক হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকারের বার্তা এসেছিল মধ্যপ্রাচ্যের জঙ্গিগোষ্ঠী আইএসের নামে। এসব হত্যাকাণ্ড ‘২০-দলীয় জোটসহ সুবিধাভোগীরা’ করাচ্ছে। শিবির ও জঙ্গি সন্ত্রাসীরা কখনো জেএমবি, কখনো আনসারুল্লাহ বাংলা টিম বলে খুন করছে। আসলে জামায়াত-বিএনপি যাই হোক, শিকড় এক।