অর্থ পাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধ: ঝুঁকিমুক্ত হতে প্রস্তুতি নিতে পারেনি বাংলাদেশ

653
রোজিনা ইসলাম | আপডেট: ০২:০৯, এপ্রিল ২৫, ২০১৬ | প্রিন্ট সংস্করণ

অর্থ পাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিকভাবে ‘ঝুঁকিপূর্ণ দেশ’-এর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকা সত্ত্বেও এ বিষয়ে এখনো প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে পারেনি বাংলাদেশ। এ বিষয়ে অগ্রগতি জানতে এশিয়া প্যাসিফিক গ্রুপ অন মানি লন্ডারিংয়ের (এপিজি) একটি প্রতিনিধিদল আগামী ২ মে ঢাকায় আসছে। এ নিয়ে আজ সোমবার অর্থ মন্ত্রণালয়ে বৈঠক ডাকা হয়েছে।
‘অর্থ পাচার ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে অর্থায়ন’ বিষয়ে মানদণ্ড নির্ধারণকারী এশিয়া অঞ্চলের সংস্থা এপিজি অনেক আগেই তাদের খসড়া মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বাংলাদেশকে এ বিষয়ে সতর্ক করেছিল।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, আগামী জুলাইয়ে এপিজির বার্ষিক সভায় বাংলাদেশ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়ে গেলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বিদেশি বিনিয়োগসহ নানা ক্ষেত্রে ক্ষতির মুখে পড়বে বাংলাদেশ।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল প্রথম আলোকে বলেন, বাংলাদেশের অবস্থান সুদৃঢ় করার জন্য তাঁরা কাজ করছেন।
অর্থ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র জানায়, আইনকানুন তৈরিতে বাংলাদেশ এগিয়ে থাকলেও এর বাস্তবায়ন করতে পারছে না। ঝুঁকিপূর্ণ দেশের তালিকা থেকে মুক্ত থাকতে হলে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছয়টি জঙ্গি সংগঠন শাহাদাত-ই-আল হিকমা, জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি), জাগ্রত মুসলিম জনতা বাংলাদেশ (জেএমজেবি), হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামি বাংলাদেশ (হুজি-বি), হিযবুত তাহ্রীর ও আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করতে হবে। এসব সংগঠনের বিষয়ে জারি করা আদেশ বা সিদ্ধান্ত প্রতিবেশী দেশগুলোকে জানাতে হবে। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার এখন পর্যন্ত এসব নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের কোনোটিরই কোনো সম্পদ বাজেয়াপ্ত করতে পারেনি।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা বলেন, এসব জঙ্গি সংগঠনের নামে কোনো সম্পদ নেই। তাই এমন কোনো সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা সম্ভব হয়নি। জঙ্গি সংগঠনের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করতে কী ব্যবস্থা নেওয়া যায় তা জানতে চেয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গত সপ্তাহে পুলিশকে চিঠি দিয়েছে।
এপিজির প্রতিনিধিদলের আসন্ন ঢাকা সফরকে সামনে রেখে গত ৫ এপ্রিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এক সভা হয়। সভার কার্যবিবরণীতে বলা হয়, মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে বাংলাদেশের অবস্থা নির্ণয়ের লক্ষ্যে প্রণীত তৃতীয় দফা মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার খসড়া প্রতিবেদন এরই মধ্যে এপিজির কাছ থেকে পাওয়া গেছে। উক্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশের অবস্থান আরও সুদৃঢ় করার সুযোগ আছে।
এ ছাড়া সন্ত্রাস দমনে বাংলাদেশ সরকারের অবস্থান, গৃহীত কার্যক্রম ও অনুসরণীয় প্রক্রিয়া বর্ণনা করে নথি (ডকুমেন্ট) তৈরি এবং এ-সংক্রান্ত ভারতের জমে থাকা পারস্পরিক আইনি সহায়তার (এমএলএ) ১৩টি অনুরোধের বিষয়ে অবহিত করতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে তাগিদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে ওই সভায়। তাতে বলা হয়, বিষয়টি ইতিপূর্বে বাংলাদেশ-ভারত স্বরাষ্ট্রসচিব পর্যায়ের সভায়ও আলোচিত হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি পুনরায় ভারতকে অবহিত করে এপিজির প্রতিবেদন থেকে বাদ দেওয়ার জন্য ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অবহিত করতে হবে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জামায়াত-শিবির এবং শাহাদাত-ই-আল হিকমাসহ নিষিদ্ধ সংগঠনের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কার্যক্রমে অর্থ জোগান দেওয়ার অভিযোগ আছে। এসব সংগঠনের নিয়ন্ত্রণে থাকা বিভিন্ন সংস্থা-প্রতিষ্ঠানের নামে যেসব ব্যাংক হিসাব রয়েছে, সেগুলোর অর্থ উত্তোলন করে শাখার দায়িত্বে যেসব নেতা রয়েছেন, তাঁদের নামে যৌথ হিসাব খুলে রাখা হচ্ছে। এ ছাড়া আনসারুল্লাহ বাংলা টিম, হুজি-বি, জেএমবিকে অর্থায়নকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে চিহ্নিত করার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের সহায়তা চেয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পাঠানো চিঠির জবাবে বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, আনসারুল্লাহ বাংলা টিমসহ জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পরিচিতিমূলক তথ্য যেমন: নাম, মা-বাবার নাম, ঠিকানা এখনো পাওয়া যায়নি। পুলিশের কাছে থাকা জঙ্গি কার্যক্রমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অভিযুক্ত এবং গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের পরিচিতিমূলক তথ্য সময়ে সময়ে সরবরাহ করা হলে জঙ্গি অর্থায়নবিষয়ক অনুসন্ধান কার্যক্রম অধিকতর কার্যকর করা যাবে। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহে কোনো হিসাব পরিচালিত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেলে তা যথাসময়ে তাদের জানাতে অনুরোধ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে জানা গেছে, এর আগে গত মাসে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে সম্পর্কিত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বাংলাদেশ ব্যাংককে চিঠি দিয়েছিল অর্থ মন্ত্রণালয়। চিঠির সঙ্গে জামায়াত-শিবিরের সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন আর্থিক, সেবামূলক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ ৫৬১টি প্রতিষ্ঠানের তালিকা দেওয়া হয়। গত বছর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কাছে পুলিশও জামায়াতের সঙ্গে সম্পৃক্ত ১২৭টি প্রতিষ্ঠানকে চিহ্নিত করে একটি প্রতিবেদন দিয়েছিল। জামায়াত নিয়ন্ত্রিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংককে যে চিঠি দেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে এখনো কোনো তথ্য মন্ত্রণালয়ে আসেনি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, তাঁরা ওই তথ্যের অপেক্ষায় রয়েছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক শুভংকর সাহা প্রথম আলোকে বলেন, জঙ্গি সংগঠনগুলোর সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কাজ শুরু করেছে। জামায়াত-শিবির নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে তালিকা ও চিঠি পাওয়ার পরই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ইতিমধ্যে এসব প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নাম, ঠিকানাসহ বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।
এর আগে ২৩ মার্চ বাংলাদেশ ব্যাংকের ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) থেকে এপিজির মূল্যায়নে বাংলাদেশের ‘মান অবনতি’ ঘটার আশঙ্কার কথা জানিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিবের কাছে চিঠি পাঠানো হয়। তাতে বলা হয়, কারিগরি কর্মপন্থায় (টেকনিক্যাল কমপ্লায়েন্স) ভালো করলেও বাস্তবায়ন বা প্রায়োগিক দিক থেকে বাংলাদেশের মান আশানুরূপ নয়। এপিজির খসড়া মূল্যায়নে ১১টি মানদণ্ডের মধ্যে বাংলাদেশ একটিতে শক্তিশালী, পাঁচটিতে মধ্যম ও পাঁচটিতে নিম্ন মানভুক্ত হয়েছে। অর্থাৎ ১১টি মানদণ্ডের মধ্যে ১০টিতে নিম্ন ও মধ্যম মানে রয়েছে বাংলাদেশ। এ অবস্থা বিদ্যমান থাকলে বাংলাদেশ ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ দেশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হবে। সেটি যাতে না হয়, সে জন্য মধ্যম মানপ্রাপ্ত দুটি মানদণ্ডে ‘শক্তিশালী’ অবস্থান নিশ্চিত করার সর্বাত্মক ব্যবস্থা নিতে হবে।
এ ছাড়া বাংলাদেশ অর্থ পাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন-সংক্রান্ত যে ঝুঁকি নিরূপণ প্রতিবেদন ও কৌশলপত্র তৈরি করেছে, তাতে সন্ত্রাসে অর্থায়নকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করা হয়নি বলে জানিয়েছে এপিজি। এ বিষয়ে বাংলাদেশের দালিলিক কোনো কৌশলপত্র নেই বলে এপিজির মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলা হয়।