আত্মসমর্পণ না করে মামলা পুনঃতদন্তের আবেদন সাংসদের

634
রোজিনা ইসলাম | আপডেট: ০২:০০, এপ্রিল ১৮, ২০১৬ | প্রিন্ট সংস্করণ
আমানুর রহমান খানটাঙ্গাইলের সাংসদ আমানুর খুনের মামলার পলাতক আসামি। তিনি আদালতে না গিয়ে সরকারের কাছে আবেদন করতে পারেন কি না প্রশ্ন উঠেছে

টাঙ্গাইলের সরকারদলীয় সাংসদ আমানুর রহমান খান (রানা) একটি খুনের মামলার আসামি। গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হলেও তিনি আত্মসমর্পণ করছেন না, পালিয়ে বেড়াচ্ছেন দেড় বছর ধরে। সম্প্রতি এই সাংসদ খুনের মামলাটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে না পাঠিয়ে পুনঃতদন্ত করার অনুরোধ জানিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছেন।

সাংসদ আমানুর একা নন, তাঁরা চার ভাই ফারুক আহমেদ হত্যা মামলার আসামি। নিহত ফারুক স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতা ও মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেই পুলিশ তদন্ত শেষে এই মামলার অভিযোগপত্র আদালতে দাখিল করে।
গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির পরও খুনের মামলার আসামি আত্মসমর্পণ না করে সরকারের কাছে মামলা পুনঃতদন্তের আবেদন করতে পারেন কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশিষ্ট আইনজীবী শাহদীন মালিক এ বিষয়ে প্রথম আলোকে বলেন, পুনঃতদন্ত হচ্ছে আদালতের সিদ্ধান্ত। বিচারাধীন মামলার বিষয়ে আদালতই সিদ্ধান্ত দেবেন। কিন্তু প্রথম কথা হলো, আসামিকে অবশ্যই আদালতে আত্মসমর্পণ করতে হবে। আসামি সাংসদ হলেও কোনোভাবেই মন্ত্রীর কাছে এ ধরনের আবেদন করে আধা সরকারি পত্র বা চিঠি দিতে পারেন না।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো পত্রে সাংসদ আমানুর রহমান লিখেছেন, ফারুক আহমেদ আততায়ীর হাতে নিহত হন। এই নির্মম হত্যার দায় প্রশাসনের মধ্যে ঘাপটি মেরে থাকা বিএনপি-জামায়াতের অনুগত এবং অনুচরের। টাঙ্গাইল জেলা আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করতে পূর্বপরিকল্পিতভাবে তাঁর ও তাঁর ভাইদের ওপর এর দায়ভার চাপানো হয়েছে।
পত্রে আরও বলা হয়েছে, সাংসদ বিশ্বস্ত সূত্রে জানতে পেরেছেন, হত্যা মামলাটি দ্রুত বিচার আদালতে নেওয়ার অপচেষ্টা চালাচ্ছে ষড়যন্ত্রকারীরা। তিনি দাবি করেন, তাঁদের কাছে থাকা তথ্য সুনিশ্চিতভাবে প্রমাণ করবে যে, তিনি ও তাঁর পরিবার এ হত্যায় মোটেও জড়িত নন। তাঁরা ষড়যন্ত্রের শিকার। ন্যায়বিচারের স্বার্থে মামলাটি দ্রুত বিচারে না দিয়ে পুনঃতদন্ত করে প্রকৃত হত্যাকারীদের বিচারের মুখোমুখি করার অনুরোধ জানান তিনি।
সাংসদ ও তাঁর তিন ভাইকে আসামি করে ফারুক হত্যা মামলার অভিযোগপত্র দেওয়া হয় এ বছরের ৩ ফেব্রুয়ারি। এরপর ৬ এপ্রিল সাংসদ ও তাঁর তিন ভাইসহ পলাতক ১০ আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আদেশ দেন টাঙ্গাইলের সদর উপজেলা আমলি আদালত।
সাংসদের তিন ভাই হলেন টাঙ্গাইল পৌরসভার সাবেক মেয়র ও টাঙ্গাইল শহর আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সহিদুর রহমান খান (মুক্তি), ব্যবসায়ী নেতা জাহিদুর রহমান খান (কাকন) এবং কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি সানিয়াত খান (বাপ্পা)। অন্য ছয় আসামি হলেন আমানুরের ঘনিষ্ঠ সহযোগী কবির হোসেন, স্থানীয় গ্লোবাল ট্রেনিং সেন্টারের দারোয়ান বাবু মিয়া, যুবলীগের তৎকালীন তিন নেতা আলমগীর হোসেন (চাঁন), নাসির উদ্দিন (নুরু) ও ছানোয়ার হোসেন এবং সাবেক পৌর কমিশনার মাছুদুর রহমান।
ফারুক টাঙ্গাইল জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতি ছিলেন। একাত্তরে মুক্তাঞ্চল থেকে প্রকাশিত রণাঙ্গন নামের একটি পত্রিকার সহসম্পাদক ছিলেন তিনি। পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর ‘প্রতিরোধযুদ্ধে’ অংশ নিয়ে পঙ্গু হন তিনি।
সাংসদ আমানুরের চিঠির বিষয়ে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘হত্যা মামলার পুনঃতদন্তের বিষয়ে আমানুর রহমান খানের একটি আবেদন পেয়েছি। আমরা যাচাই-বাছাই করে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত দেব।’ আধা সরকারি পত্র সাংসদ নিজে মন্ত্রণালয়ে দিয়ে গেছেন কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, বোধ হয় ডাকযোগে পাঠিয়েছেন।
যোগাযোগ করা হলে টাঙ্গাইলের পুলিশ সুপার (এসপি) সালেহ মোহাম্মদ তানভীর গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, তদন্তে কোনো ভুল থাকলে তিনি পুনঃতদন্ত চাইতে পারেন। তবে এ বিষয়ে পুরো এখতিয়ার আদালতের। পুলিশ সুপার বলেন, আড়াই বছর ধরে সাংসদ অনেক কিছুই বলেছেন। কিন্তু তথ্য-প্রমাণই কথা বলবে। এ ছাড়া দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিষয়টি অনুমতির জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যাবে। সেখান থেকেই গেজেট প্রকাশ হবে। এর ৯০ দিনের মধ্যে এ মামলার বিচার হবে।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর খান পরিবার টাঙ্গাইল শহরে প্রভাবশালী হয়ে ওঠে। তাদের দাপটে এলাকায় ও দলে কেউ মুখ খুলতে সাহস পেতেন না। ফলে চার ভাইয়ের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে অর্ধশত মামলা হলেও বাদী ও সাক্ষী আদালতে উপস্থিত হননি। এ কারণে অনেক মামলা নিষ্পত্তি হয়ে গেছে। আবার কিছু মামলা রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রত্যাহারের সুপারিশ করা হয়েছে। কিন্তু ফারুক হত্যা মামলায় নাম আসার পর থেকে সাংসদ আমানুর ও তাঁর ভাইদের আর প্রকাশ্যে দেখা যায়নি।
প্রসঙ্গত, ২০১৩ সালের ১৮ জানুয়ারি রাতে জেলা আওয়ামী লীগের নেতা মুক্তিযোদ্ধা ফারুক আহমেদের গুলিবিদ্ধ লাশ তাঁর কলেজপাড়া এলাকার বাসার সামনে থেকে উদ্ধার করা হয়। ঘটনার তিন দিন পর তাঁর স্ত্রী নাহার আহমেদ বাদী হয়ে টাঙ্গাইল সদর থানায় মামলা করেন। এতে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করা হয়। ডিবির তদন্তে ওই হত্যাকাণ্ডে সাংসদ আমানুর ও তাঁর ভাইদের জড়িত থাকার তথ্য বেরিয়ে আসে।