শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইন ও সাজ্জাদকে ফেরত দেবে ভারত

604

রোজিনা ইসলাম | ২১ মার্চ, ২০১৬

ভারতে বন্দী চট্টগ্রামের আট খুন মামলার আসামি ও শিবিরের দুর্ধর্ষ ক্যাডার পলাতক সাজ্জাদ হোসেন ও তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইনকে ফিরিয়ে দিতে সম্মত হয়েছে ভারত সরকার।
তবে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের যে বন্দী প্রত্যর্পণ চুক্তি রয়েছে, সেই চুক্তির আওতায় নয়, তাঁদের ফিরিয়ে দেওয়া হবে পুশইন-পুশব্যাক হস্তান্তর প্রক্রিয়ায়। ভারতের আদালতের নানা বিষয়সহ এই বন্দীদের ফেরত দেওয়ার বিষয়ে নানা জটিলতা থাকায় সরাসরি হস্তান্তর করতে চায় ভারত। ভারতের এ প্রস্তাবে রাজি হয়েছে বাংলাদেশ সরকারও। এ বিষয়ে পরবর্তী কর্মপন্থা ঠিক করে জরুরি ভিত্তিতে জানাতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
পররাষ্ট্রসচিবকে পাঠানো এ চিঠিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, রেড নোটিশধারী আসামি সাজ্জাদ হোসেন ও সুব্রত বাইনকে ভারতের কর্তৃপক্ষের সুবিধাজনক তারিখ ও সময়ে হস্তান্তর-প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশে নিয়ে আসার বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্মত হয়েছে। ওই আসামিদের বাংলাদেশে নিয়ে আসার বিষয়ে পরবর্তী কর্মপন্থা নিরূপণে সর্বশেষ অবস্থা জানতে চায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, দ্রুত তাঁদের দেশে ফিরিয়ে আনা হবে।
গত বছরের নভেম্বরে বাংলাদেশ ও ভারতের স্বরাষ্ট্রসচিব পর্যায়ের বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ৩৬ জন শীর্ষস্থানীয় সন্ত্রাসী ও দাগি আসামির তালিকা ভারতের কাছে তুলে দেওয়া হয়। ওই তালিকার শুরুতেই রয়েছে সাজ্জাদ হোসেন খান ও সুব্রত বাইনের নাম। অন্য বন্দীদের মধ্যে জাফর আহমেদ, হোসেন নবী, বিশ্বাস প্রকাশ কুমার, রফিকুল ইসলাম, মাসুদ মোল্লা, আহমেদ শামীম, জিসান যীশু, খন্দকার তানভীর ইসলাম প্রমুখের নামও ছিল।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ভারতে বন্দী চট্টগ্রামের আট খুন মামলার আসামি ও শিবিরের দুর্ধর্ষ ক্যাডার পলাতক সাজ্জাদ হোসেন খানকে চার বছরেও দেশে ফিরিয়ে আনা যায়নি। তাঁকে ফিরিয়ে আনতে ২০১২ সাল থেকে ভারতকে সাতটি স্মারকে বহিঃসমর্পণ প্রস্তাব পাঠানো হলেও সেগুলোর তথ্য আংশিক ও অসম্পূর্ণ থাকায় এখনো বার্তা চালাচালি চলছে। এসব জটিলতার অবসান ঘটিয়ে সাজ্জাদকে দেশে ফিরিয়ে আনতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বহিঃসমর্পণ প্রস্তাব পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ভারত ওই প্রক্রিয়ায় যেতে চাচ্ছে না।
সাজ্জাদের বিষয়টি নিয়ে নানা জটিলতা রয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলেন, নতুন জটিলতা দেখা দিয়েছে সাজ্জাদ ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কাছে নিজেকে মো. আবদুল্লাহ বলে দাবি করায়। বাংলাদেশ থেকে পাঠানো প্রস্তাবে তাঁর নাম কোথাও সাজ্জাদ খান আবার কোথাও সাজ্জাদ হোসেন খান উল্লেখ করা হয়েছে। বর্তমানে তিনি দিল্লির তিহার কারাগার থেকে জামিনে ছাড়া পেয়েছেন বলেও জানা গেছে। সূত্র জানায়, একটি অস্ত্র মামলায় সন্ত্রাসী সাজ্জাদের ১০ বছরের কারাদণ্ড হয়েছে। আট খুন মামলায় বিচারিক আদালতে মৃত্যুদণ্ডাদেশ হলেও হাইকোর্টে তিনি অব্যাহতি পান। তাঁর বিরুদ্ধে ১১টি মামলা বিচারাধীন এবং সাতটি মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র বলেছে, সম্প্রতি নয়াদিল্লির বাংলাদেশ হাইকমিশন থেকে পাঠানো এক বার্তায় পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে, চট্টগ্রামে আট খুনের মামলার আসামি সাজ্জাদ ভারত সরকারের কাছে জোরালো দাবি করেছেন, তিনি ‘মো. আবদুল্লাহ’। তাঁর নাম ‘সাজ্জাদ হোসেন খান’ নয়। তিনি কর্তৃপক্ষের কাছে তাঁর পাসপোর্টও ফেরত চেয়েছেন। ভারতের কর্তৃপক্ষ বলেছে, বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে তাঁকে ফিরিয়ে আনার জন্য যেসব তথ্য পাঠানো হয়েছে, তা বিচ্ছিন্ন ও অসম্পূর্ণ। আসামির নামের ক্ষেত্রেও রয়েছে অমিল। কোনো কোনো স্থানে ‘সাজ্জাদ খান’, আবার কোনো কোনো স্থানে ‘সাজ্জাদ হোসেন খান’ উল্লেখ করা হয়েছে।
পাঠানো এফিডেভিটে মামলার সংক্ষিপ্ত বিবরণ, অভিযোগসংশ্লিষ্ট আইনের ধারার উদ্ধৃতি, আসামি গ্রেপ্তার ও জামিনসংক্রান্ত বিস্তারিত কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি। বার্তায় বলা হয়, ২০১২ সালের নভেম্বর থেকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র চেয়ে যোগাযোগ করা হলেও এবং ‘অতি জরুরি’ বলা হলেও ‘আংশিক’ কাগজপত্র পাঠানো হচ্ছে। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ বলেছে, সাজ্জাদের বিষয়ে যথাযথ ও পূর্ণাঙ্গ কাগজপত্র দিতে হবে। না হলে তিনি ছাড়াও পেয়ে যেতে পারেন। তাই যথাযথ নথি ও কাগজপত্রসহ নতুন বহিঃসমর্পণ প্রস্তাব পাঠাতে ওই বার্তায় অনুরোধ জানানো হয়।
পুলিশের সূত্র বলেছে, ২০০০ সালের ১২ জুলাই চট্টগ্রাম নগরের বহদ্দারহাটে মাইক্রোবাস থামিয়ে ছাত্রলীগের ছয় নেতা-কর্মীসহ আটজনকে গুলি করে হত্যা করে ইসলামী ছাত্রশিবিরের ক্যাডাররা। এ মামলায় সাজ্জাদসহ চারজনের মৃত্যুদণ্ড ও তিনজনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ দেন আদালত। ২০০৮ সালের ২৭ মার্চ চট্টগ্রামের একটি আদালত এ রায় ঘোষণার আগেই সাজ্জাদ দুবাই পালিয়ে যান। হাইকোর্টে ওই মামলায় তিনি খালাস পান।
সূত্র বলেছে, ২০০১ সালের ২ এপ্রিল সাজ্জাদ একে-৪৭ রাইফেলসহ চট্টগ্রামে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। এর বছর দেড়েক পর জামিনে কারাগার থেকে বের হন। চট্টগ্রামের কারা ফটক থেকে তাঁকে জামায়াতে ইসলামীর তৎকালীন একজন সাংসদ নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এরপর তিনি গোপনে দুবাই চলে যান। অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ আইনের একটি মামলায় তাঁকে ১০ বছরের কারাদণ্ডাদেশ দেন চট্টগ্রামের একটি আদালত।
২০১২ সালের ৭ নভেম্বর ভারতের পাঞ্জাবের অমৃতসরে গ্রেপ্তার হন সাজ্জাদ। তাঁকে গ্রেপ্তারের জন্য বাংলাদেশ থেকে আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের কাছে বার্তা পাঠানো হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ভারতের পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে।
মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র বলেছে, সাজ্জাদকে দেশে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে জটিলতা হতে পারে। কারণ, সাজ্জাদ দেশে ফিরতে চান না। তিনি পাঞ্জাবের এক মেয়েকে বিয়ে করেছেন। তাঁদের একটি সন্তানও আছে। ভারত থেকে সাজ্জাদকে ফিরিয়ে আনার সময় সেখানকার মানবাধিকার সংস্থাগুলো সাজ্জাদের স্ত্রী-সন্তানের বিষয়ে প্রশ্ন তুলে বিষয়টি জটিল করে দিতে পারে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইনকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় ২০০৮ সালের ১১ অক্টোবর গ্রেপ্তার করে সেখানকার গোয়েন্দা পুলিশ ও পুলিশের স্পেশাল টাস্কফোর্স (এসটিএফ)। কলকাতায় সুব্রতর বিরুদ্ধে অনুপ্রবেশ ও অস্ত্র রাখার দায়ে মামলা রয়েছে। কলকাতা থেকে জামিনে মুক্তি পেয়ে নেপালে পালান সুব্রত। সেখানে নিজের নাম বদলে তিনি আত্মগোপন করে ছিলেন। কলকাতার গোয়েন্দা পুলিশ ও কলকাতা পুলিশের স্পেশাল টাস্কফোর্স (এসটিএফ) যৌথভাবে অভিযান চালিয়ে দক্ষিণ কলকাতার পাম অ্যাভিনিউ থেকে সুব্রতকে গ্রেপ্তার করে। এ সময় সুব্রতর কাছে একটি নাইন এমএম পিস্তল পাওয়া যায়। সুব্রত কলকাতায় গা ঢাকা দিয়ে ফোনের মাধ্যমে বাংলাদেশে নিয়মিত চাঁদাবাজি করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তিনি কলকাতায় নিজেকে ‘ফতে আলী’ হিসেবে পরিচয় দিতেন। তাঁর বিরুদ্ধে ঢাকায় কমপক্ষে ৩০টি খুনের মামলা রয়েছে। গত বছরের ১০ নভেম্বর উত্তর-পূর্ব ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন উলফার নেতা অনুপ চেটিয়া ও তাঁর দুই সহযোগীকে ভারতীয় দূতাবাসে হস্তান্তর করা হয়। অনুপ চেটিয়াকে পাওয়ার এক দিনের মধ্যে বাংলাদেশের চাঞ্চল্যকর সাত খুনের প্রধান আসামি নূর হোসেনকে ফেরত দেয় ভারত, এরপর থেকে সাজ্জাদ হোসেন ও সুব্রত বাইনকে ফেরানোর বিষয়ে আলোচনা শুরু হয়।