সিরিয়ায় পাচার হওয়া নারীরা দেশে ফিরতে চান

549
রোজিনা ইসলাম | আপডেট: ০২:২২, ফেব্রুয়ারি ২৩, ২০১৬ | প্রিন্ট সংস্করণ

‘আফা, দয়া কইর্যা্ আমারে এই দোজখ থাইক্যা নিয়া যান। এরা ভালা না, আমারে নাকি কিন্যা আনছে, দ্যাশে যাইতে দেয় না। আমারে লেবাননের কথা কইয়্যা দ্যাশ থাইক্যা নিয়া আইছে। এখন দেখি খালি যুদ্ধ আর বোমের আওয়াজ, ঘুমাইতে পারি না, ঠিকমতো খাওনও দেয় না।’ টেলিফোনে এভাবেই দেশে ফেরার আকুতি জানিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন যুদ্ধকবলিত সিরিয়ায় পাচার হওয়া এক নারী। বর্তমানে ভুক্তভোগী ওই নারী সিরিয়ার দামেস্ক শহরের একজন নারীর অধীনে কাজ করছেন বলে জানান। লেবাননে হাসপাতালে আয়ার কাজের কথা বলা হয়েছিল তাঁকে।
এই নারীরা দেশে ফিরতে চাইলেও কেউ কোনো উদ্যোগ নেয়নি। এই পাচারের সঙ্গে জড়িত দালাল ও রিক্রুটিং এজেন্সির কয়েকজন মালিককে র্যা ব গ্রেপ্তার করলেও ইতিমধ্যে তাঁরা জামিনে মুক্তি পেয়ে গেছেন।
কুষ্টিয়া থেকে ঢাকায় আসা ওই নারীর স্বামী গত বুধবার প্রথম আলোকে জানান, স্ত্রীর সঙ্গে তাঁর মুঠোফোনের ভাইবারে একটি নম্বরে কথা হয়েছিল। তাঁর কাছ থেকে নম্বরটি সংগ্রহ করে যোগাযোগ করা হলে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া ওই নারী ফোন ধরেন এবং জানান, তিনি সেখানে একটি বাসায় কাজে এসেছেন। এর আগে আরেকটি বাসায় কাজ করতেন। ওইখানে নির্যাতন করা হয়েছে। ওই নারী সিরিয়ায় যাঁর অধীনে কাজ করেন, তাঁর নাম নাহা। নাহার সঙ্গে কয়েকবার যোগাযোগ করা হয়। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, বাংলাদেশ থেকে যাওয়া ওই নারীকে তিন হাজার ডলার দিয়ে কিনে নিয়েছেন। বাংলাদেশি ওই নারীকে কী কাজের জন্য কেনা হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি কিনে এনেছি, যা ইচ্ছা তা করাব’, এই বলে মুঠোফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
একইভাবে নির্যাতিত হয়ে গত ১৩ জানুয়ারি সিরিয়া থেকে অসুস্থ অবস্থায় ফেরত আসেন রাজবাড়ীর আরেক নারী। গত বুধবার আলাপকালে ওই নারী প্রথম আলোকে জানান, দুই বছর তিনি সেখানে ছিলেন। সেখানে তাঁকে আটকে রাখা হয়েছিল। রাজবাড়ীর জাহের নামে একজন দালালকে তিনি লেবাননে যাওয়ার জন্য ৩০ হাজার টাকা দিয়েছিলেন। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পরে জানতে পারেন, তাঁকে সিরিয়ায় পাঠানো হয়েছে। তাঁর ভিসা ও টিকিটে লেবানন লেখা থাকলেও, তাঁর কাছে সিরিয়া থেকে ফ্লাইটে আম্মানে আসার একটি বোর্ডিং পাসের ছেঁড়া অংশ পাওয়া গেছে।
বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, গৃহকর্মী অথবা হাসপাতালে পাঠানোর কথা বলে বিভিন্ন সময়ে নারীদের সিরিয়ায় পাঠানো হয়। গত ৫ নভেম্বর ‘সিরিয়ায় নারী পাচার, যৌন ও গৃহকর্মী হিসেবে বিক্রি’ শিরোনামে প্রথম আলোতে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। সেখানে পাঠানোর উদ্দেশ্যে প্রথমে ঢাকা থেকে দুবাই, তারপর দুবাই থেকে ওমানের রাজধানী আম্মান। আম্মান থেকে বিমানে নেওয়া হয় সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কে। গুগল সার্চে দেখা গেছে, সিরিয়ান এয়ারলাইনসের ফ্লাইট সপ্তাহে দুদিন আম্মান-দামেস্কের মধ্যে চলাচল করে। এতে করে সিরিয়া থেকে আম্মান আসেন বাংলাদেশি ওই নারী।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন বলছে, এ পর্যন্ত ৭৯ জন নারীকে যুদ্ধকবলিত সিরিয়ায় পাচার করা হয়েছে। মন্ত্রণালয় তাঁদের দেশে ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছে। জানতে চাইলে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব খন্দকার মো. ইফতেখার হায়দার বলেন, তাঁদের দায়িত্ব কোনো রিক্রুটিং এজেন্সি অবৈধভাবে লোক পাঠালে বা মানব পাচার করলে তার লাইসেন্স বাতিল করা। তিনি বলেন, এখনো তাঁরা কোনো তালিকা পাননি, তাঁদের কাছে কোনো তালিকা নেই। তাই এই নারীদের ফেরত আনার দায়িত্ব তাঁদের নয়।
এদিকে এই নারীদের কাছে জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) স্মার্ট কার্ডও রয়েছে। র্যা বের সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশের কিছু রিক্রুটিং এজেন্সি আন্তর্জাতিক চক্রের সঙ্গে মিলে নারী পাচার করছে। র্যা বের পক্ষ থেকে বিদেশে নারী কর্মী পাঠানোর নামে সিরিয়ায় পাচার হওয়া নারীদের নামের তালিকা ও পাসপোর্টের ফটোকপি পাঠানো হয়েছে। এর সঙ্গে জড়িত আল রাবেতা ইন্টারন্যাশনাল, আল হাসিব ইন্টারন্যাশনাল, সিকদার ট্রাভেলস, বাংলাদেশ এক্সপার্ট করপোরেশন, হাসান ইন্টারন্যাশনাল ও নামিরা ওভারসিজের কর্মকর্তা ও দালাল সিরাজ সিকদারকে গ্রেপ্তার করেছিল র্যা ব। এখন তাঁরা সবাই জামিন পেয়ে গেছেন।
র্যা ব-৩-এর অধিনায়ক খন্দকার গোলাম সারোয়ার এ বিষয়ে প্রথম আলোকে বলেন, পাচারের সঙ্গে জড়িত কয়েকজনকে তাঁরা গ্রেপ্তার করেছেন। এ ছাড়া স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে একটি তদন্ত প্রতিবেদন চেয়েছিল, যা ইতিমধ্যে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু ওই নারীদের ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে কোনো ব্যবস্থাই কেউ নেয়নি এখন পর্যন্ত। এসব অপরাধী যদি জামিনে বেরিয়ে আসে, তবে আরও নারীকে এভাবে যুদ্ধকবলিত সিরিয়ায় পাঠানো হতে পারে বলে তিনি শঙ্কা প্রকাশ করেন।
সূত্র জানায়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, সিরিয়ায় তাদের কোনো বাংলাদেশ কার্যালয় নেই। তাই তাদের কনস্যুলার ও কল্যাণ অনু বিভাগ সিরিয়ায় পাচারকৃত নারী কর্মীদের দেশে ফিরিয়ে আনতে চিঠি দিয়েছে জর্ডানে বাংলাদেশ দূতাবাসকে। জানতে চাইলে জর্ডানে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এনায়েত হোসেন গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘সিরিয়ায় আমাদের একজন কনস্যুলেট রয়েছেন। তাঁকে বিষয়টি জানিয়েছি। তিনি তালিকা ও নাম চেয়েছেন। কিন্তু বাংলাদেশ থেকে এখনো কেউ তালিকা পাঠায়নি।’