বৈধ অস্ত্রের অবৈধ ব্যবহার ঠেকাতে নীতিমালা হচ্ছে

571
রোজিনা ইসলাম | আপডেট: ০৮:০৯, ফেব্রুয়ারি ০২, ২০১৬ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশে আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স প্রদান, নবায়ন ও ব্যবহার নীতিমালা করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা বিচারাধীন থাকলে ওই ব্যক্তি আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স পাবেন না। কেউ ফৌজদারি আদালত থেকে চূড়ান্ত সাজাপ্রাপ্ত হলে ১০ বছরের মধ্যে লাইসেন্স পাবেন না। আর শ্রমিকঘন প্রতিষ্ঠান বা কারখানার অনুকূলে আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়া হবে না।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব মোজাম্মেল হক খান আগ্নেয়াস্ত্রের নীতিমালা করার বিষয়টি নিশ্চিত করে প্রথম আলোকে বলেন, ‘যার–তার কাছে তো আমরা অস্ত্র তুলে দিতে পারি না। এ জন্য পুরো প্রক্রিয়াকে একটি যৌক্তিক প্রক্রিয়ায় আনতে এ নীতিমালা করা হচ্ছে। এর পরের বৈঠকে বিষয়টি চূড়ান্ত করা হতে পারে। গতকালের বৈঠকে সামগ্রিক বিষয়গুলো সামনে এনে আমরা একটি রূপরেখা চূড়ান্ত করেছি।’
আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার বা বহনের বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে এই নীতিমালা প্রণয়ন করতে যাচ্ছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, তাঁরা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী বা অন্যান্য অনুষ্ঠানে গিয়ে দেখেছেন, লাইসেন্স পাওয়া ব্যক্তিদের অস্ত্র বহন করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের স্বজনেরা।
নীতিমালায় বলা হচ্ছে, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রহরী নির্ধারিত পোশাক ছাড়া প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শন করতে পারবেন না। এ ছাড়া আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্সধারী কেউ অন্য কোনো ব্যক্তি বা ব্যক্তির ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বা সম্পত্তি রক্ষার জন্য অস্ত্রধারী প্রহরী হিসেবে নিয়োজিত হতে পারবেন না। প্রতিষ্ঠানের নামে দেওয়া অস্ত্র ব্যক্তির বা মালিকের নিরাপত্তাকাজে ব্যবহার করা যাবে না। আগ্নেয়াস্ত্রের ক্ষেত্রে প্রতিবছর সর্বোচ্চ ১০০টি গুলি ও ৫০টি গুলি কেনার অনুমতি দেওয়া যাবে।
নতুন নীতিমালায় বলা হয়েছে, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে ছয়টির বেশি লাইসেন্স দেওয়া যাবে না। এ ছাড়া মুক্তিযোদ্ধা ও জাতীয় বেতন স্কেলের ষষ্ঠ গ্রেডভুক্ত চাকরিরত বা অবসরে যাওয়া সরকারি ক্যাডার সার্ভিস কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে পিস্তল, রিভলবার, শটগান ও রাইফেলের লাইসেন্স ফি এবং নবায়ন ফি লাগবে না। অর্থের পরিবহনের জন্য পাঁচটির বেশি গাড়ির জন্য আগ্নেয়াস্ত্র দেওয়া যাবে না। চরাঞ্চল, বনাঞ্চল, দুর্গম এলাকা বা বিশেষ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অবস্থিত ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শাখা থানা থেকে ১৫ কিলোমিটারের বেশি দূরত্বে হলে একটি আগ্নেয়াস্ত্র নিতে পারবে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, সম্প্রতি রাজনৈতিক বিবেচনায় ঢাকা মহানগরের একটি সংসদীয় আসনেই মহাজোট সরকারের গত পাঁচ বছর ও চলতি মেয়াদের ২০ মাসে প্রায় তিন হাজার অস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। এ আসনের (ঢাকা-১৮) বৈধ অস্ত্রধারীদের বেশির ভাগ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠন ছাত্রলীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতা-কর্মী এবং তাঁদের স্বজনেরা। দলীয় পরিচয়ে এ আসনটির ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা পর্যন্ত অস্ত্রের লাইসেন্স পেয়ে গেছেন। অনেক নেতা-কর্মী একটি শর্ট ব্যারেল (এনপিবি পিস্তল/রিভলবার) এবং একটি লং ব্যারেল (শটগান বা রাইফেল) অস্ত্রের লাইসেন্স নিয়েছেন। অস্ত্রের লাইসেন্সপ্রাপ্ত ব্যক্তির তথ্য কেন্দ্রীয়ভাবে সংরক্ষণ না হওয়ায় অনেকে দুই বা এর অধিক আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স পেয়েছেন। ঢাকা মহানগরের খিলক্ষেত, উত্তরা (পূর্ব), উত্তরা (পশ্চিম), তুরাগ থানা, উত্তরখান ও দক্ষিণখান থানা নিয়ে গঠিত এ সংসদীয় আসনের ইউনিয়ন পর্যায়ে ওয়ার্ড নেতাদেরও রয়েছে বৈধ অস্ত্র। এ ছাড়া পাতিরা, ডুমনি, তলনা, ডেলনা, কাঁচকুড়া, বরুয়া ও ভাতুরিয়া গ্রামের রাজনৈতিক নেতারাও অস্ত্রের লাইসেন্স নিয়েছেন। যদিও অস্ত্রের লাইসেন্সপ্রাপ্ত এসব ব্যক্তির মধ্যে অনেকের বৈধ ব্যবসা বা সামাজিক কোনো অবস্থান নেই।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, গত বছরের এপ্রিল মাসে এক সাংসদের ছেলে রাজধানীর নিউ ইস্কাটনে যানজটে পড়ে বিরক্ত হয়ে এলোপাতাড়ি গুলি চালিয়েছিলেন। তাতে এক রিকশাচালক ও এক অটোরিকশাচালক গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। গত বছরের ২ অক্টোবর গাইবান্ধার এক সাংসদ শিশু সৌরভকে গুলি করেছিলেন। এমন অসহিষ্ণু মানুষের হাতে বৈধ অস্ত্র থাকাও বিপজ্জনক।