বড় প্রতিষ্ঠানের হোল্ডিং ট্যাক্স বকেয়া

711

রোজিনা ইসলাম | ২০ জানুয়ারি, ২০১৬
রাজধানীর বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে হোল্ডিং ট্যাক্স বাবদ প্রায় ২৮৫ কোটি টাকা পাবে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। দফায় দফায় নোটিশ দিয়েও এই ট্যাক্স আদায় করতে পারছে না করপোরেশন।
ডিএসসিসির রাজস্ব আয়ের অন্যতম বড় উৎস হোল্ডিং ট্যাক্স। বছরে এ খাত থেকে আসে ১০০ কোটি টাকার মতো।
সিটি করপোরেশনের সূত্রমতে, বহুতল ভবনের আয়তন গোপন করে, বর্গফুট কম দেখিয়ে এবং আবাসিক সুবিধার নামে বহুতল বাণিজ্যিক ভবন করে হোল্ডিং ট্যাক্স ফাঁকি দিচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। আর এসব কারসাজির সঙ্গে সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন অঞ্চলের রাজস্ব বিভাগের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী, বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও বাণিজ্যিক ভবনের মালিকেরা জড়িত। রাজস্ব বিভাগ বলছে, বছরের পর বছর হোল্ডিং ট্যাক্স অনাদায়ি থাকার মূলে রয়েছে দুর্বল ব্যবস্থাপনা এবং একশ্রেণির কর্মকর্তার অসাধুতা।
দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের হোল্ডিং ট্যাক্স অনাদায়ি-সংক্রান্ত কাগজপত্রে দেখা যায়, শীর্ষ খেলাপিদের মধ্যে আছেন দেশের নামকরা ব্যবসায়ী, খ্যাতনামা হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিপণিবিতান ও সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। এসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের তালিকায় আছে এলিফ্যান্ট রোডের মাল্টিপ্ল্যান সেন্টার (৪ কোটি ৪২ লাখ), হলি ফ্যামিলি হাসপাতাল (৪ কোটি), আ. হালিম মোতালেব কলোনি (২ কোটি ৯৬ লাখ), বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট (১ কোটি ৬৭ লাখ), ব্যবসায়ী চৌধুরী মারুফ হোসেন (১ কোটি ৯ লাখ), জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (৮৮ লাখ ৯৬ হাজার), ইনস্টিটিউট অব লেদার টেকনোলজি পাঁচটি প্রতিষ্ঠান (২ কোটি ৩০ লাখ), বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি (৫১ লাখ ৯২ হাজার), ইডেন মহিলা কলেজ (৪৮ লাখ ৪৫ হাজার), প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (৪৩ লাখ ৬৩ হাজার), ব্যবসায়ী সালমান এফ রহমান (৬৬ লাখ ২৭ হাজার), হাবীবুল্লাহ বাহার কলেজ (৩৭ লাখ ৬৫ হাজার), রাফিন প্লাজা (৩৫ লাখ ৮৭ হাজার), লালবাগ মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ (২৬ লাখ ৯৫ হাজার)।
জানতে চাইলে ডিএসসিসির মেয়র সাঈদ খোকন প্রথম আলোকে বলেন, বকেয়া টাকা আদায়ে আবারও চূড়ান্ত নোটিশ দেওয়া হচ্ছে। এর পরও যদি ভবনের মালিকেরা হোল্ডিং ট্যাক্স পরিশোধ না করেন, তবে মালামাল ক্রোক করা হবে, আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে, প্রয়োজনে মামলা করা হবে। তিনি বলেন, অনেকেই উল্টো মামলা করে বসে আছেন, যে কারণে সিটি করপোরেশনের অনেক টাকা আটকে রয়েছে। আবার কিছু সরকারি সংস্থাও আছে, যারা হোল্ডিং ট্যাক্স পরিশোধ করতে চায় না।
করপোরেশনের রাজস্ব বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, তাদের এলাকায় পাঁচটি অঞ্চলে হোল্ডিং রয়েছে দেড় লাখ। কিন্তু কিছু প্রতিষ্ঠান এই হোল্ডিং ট্যাক্স সময়মতো পরিশোধ না করে বছরের পর বছর আটকে রেখেছে। দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের উপপ্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা ইউসুফ আলী সর্দার জানান, পাওনা আদায় করতে গেলে অনেকে চেক দিচ্ছেন। কিন্তু সেই চেক বাউন্স হচ্ছে। খেলাপিদের মধ্যে অনেকেই ক্ষমতাবান। অনেক সময় কিছু বলাও যায় না।
রাজধানীর এলিফ্যান্ট রোডের কম্পিউটার মার্কেট ‘মাল্টিপ্ল্যান সেন্টার’। দশতলা ভবনে মোট ২৭২টি দোকান। ২০০৭ সালে মার্কেটটি চালু হয়েছে। কিন্তু মার্কেটের ব্যবসায়ীরা আজ পর্যন্ত এক টাকাও হোল্ডিং ট্যাক্স (কর) পরিশোধ করেননি। বছরের পর বছর ধরে সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা করের টাকা চেয়ে চিঠি পাঠিয়ে কিছু করতে পারেননি। এ বিষয়ে মাল্টিপ্ল্যান বিপণিবিতান সমিতির সাধারণ সম্পাদক সুব্রত সরকার প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা মালিক সমিতি, আমাদের দায়িত্ব তো কর ওঠানো নয়। সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা সব সময় চিঠি দেন আমাদের কাছে। আমরা বলেছি দোকানমালিকদের আলাদা আলাদা চিঠি দিতে। কিন্তু আজ পর্যন্ত তাঁরা দেননি। তাই শুরু থেকে দোকানমালিকেরা এক টাকাও কর দেননি।’
বকেয়া হোল্ডিং ট্যাক্সের ব্যাপারে সালমান এফ রহমানের পক্ষে ইমপ্যাক্ট পিআর প্রথম আলোকে জানায়, বকেয়া-সংক্রান্ত বিষয়ে তিনি অবগত নন। বকেয়া থেকে থাকলে তিনি অবশ্যই তা পরিশোধ করে দেবেন।
রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির চেয়ারম্যান হাফিজ আহমেদ মজুমদার বলেন, ‘হলি ফ্যামিলি হাসপাতাল রেড ক্রিসেন্টের একটি প্রতিষ্ঠান। অনিয়ম আর অবহেলায় হাসপাতালটির অবস্থা খুব খারাপ ছিল। আমরা ভালো অবস্থায় ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছি। আশা করি দ্রুত হোল্ডিং ট্যাক্স পরিশোধ করে দেব।’ আর পোশাক ব্যবসায়ী চৌধুরী মারুফ হোসেন বলেন, ‘ছয়তলা ভবন থেকে আমরা যা ভাড়া পাই, তা থেকে হোল্ডিং ট্যাক্স পরিশোধ করা সম্ভব নয়।’ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা শ্যামল কুমার বলেন, এরা যেভাবে ট্যাক্স ধরে, সেভাবে টাকা পরিশোধ করা সম্ভব নয়।