জঙ্গি দমনে সক্ষমতা বাড়াতে পুলিশের বিশেষ ইউনিট

904

রোজিনা ইসলাম | ৩০ ডিসেম্বর, ২০১৫   

জঙ্গি দমনে পুলিশের সক্ষমতা বাড়াতে বিশেষায়িত ‘কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্স ন্যাশনাল ক্রাইম’ ইউনিট গঠন করছে সরকার। ইতিমধ্যে এই ইউনিট গঠনের সব ধাপ সম্পন্ন হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতির কারণে ছোট পরিসরে জানুয়ারি মাস থেকেই ইউনিটটি কাজ শুরু করবে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশের সূত্র বলেছে, এই ইউনিটকে শক্তিশালী করতে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) ও পুলিশের গোয়েন্দা শাখার যেসব কর্মকর্তা বিশেষায়িত ইউনিটে কাজ করছেন, তাঁরা যুক্ত হবেন। ইউনিটের প্রধান থাকবেন উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা। এ ছাড়া একজন অতিরিক্ত ডিআইজি, চারজন পুলিশ সুপার, ১০ জন অতিরিক্ত উপকমিশনার, ২০ জন সহকারী কমিশনারসহ মোট ৬০০ জন সদস্য এই ইউনিটে কাজ করবেন।

নাম ‘কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্স ন্যাশনাল ক্রাইম’। জানুয়ারিতেই কাজ শুরু করবে

এই ইউনিট দেশে ও দেশের বাইরের সন্ত্রাসীদের তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ, তাদের অপতৎপরতা প্রতিরোধ, সন্ত্রাসীদের গতিবিধি সব সময় তদারক করা এবং তাদের গ্রেপ্তারে কাজ করবে। জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদ দমনে প্রযুক্তিনির্ভর এই বিশেষ ইউনিট গঠনকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। তবে প্রায় ছয় বছর আগে ‘পুলিশ ব্যুরো অব কাউন্টার টেররিজম (পিবিসিটি)’ নামে বিশেষায়িত একটি ইউনিট গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এখনো অনুমতি দেয়নি।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা সব সময়ই বলে আসছেন, জঙ্গি দমনে সক্ষমতা, অভিজ্ঞতা বা প্রশিক্ষণ পুলিশের সেভাবে নেই। জঙ্গি মামলা তদন্তের সক্ষমতাও নেই। যেসব পুলিশ সদস্য হরতাল ডিউটি ও নাশকতা দমনে কাজ করছেন, তাঁরাই চোর-ডাকাত, ছিনতাইকারীদের বিরুদ্ধেও কাজ করছেন। তাঁদেরই আবার জঙ্গি দমনের কাজে লাগানো হচ্ছে। আবার জঙ্গি দমনে কাজ করে দক্ষ হয়ে ওঠা কর্মকর্তাকে বদলি করে দেওয়া হচ্ছে অন্য সংস্থায়। ফলে জঙ্গিদের শিক্ষণ-প্রশিক্ষণ বিষয়ে জানা, তাদের জীবনাচরণ সম্পর্কে বুঝে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কোনো সুযোগ থাকছে না। এ কারণেই ‘কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্স ন্যাশনাল ক্রাইম’ ইউনিট গঠন খুব জরুরি হয়ে পড়েছে।
ইউনিট গঠনের বিষয়টি নিশ্চিত করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল গত সোমবার প্রথম আলোকে বলেন, জঙ্গিবাদ এখন যে পর্যায়ে রয়েছে, তা মোকাবিলার জন্য একটি বিশেষায়িত ইউনিট খুব প্রয়োজন ছিল। তিনি বলেন, প্রথমে ছোট একটি ইউনিট করা হবে। যেসব পুলিশ কর্মকর্তা বিভিন্ন দেশে গিয়ে প্রশিক্ষণ নিয়ে আসছেন, তাঁদের এ ইউনিটে আনা হবে। তাঁরা সাইবার ক্রাইম, সন্ত্রাস ও জঙ্গি দমনে কাজ করবেন। পুলিশের কর্মকর্তারা যেকোনো ঘটনা ঘটার আগেই যাতে সব খবর পেয়ে যান, সেভাবে এ ইউনিট তৈরি করা হবে। ইউনিটটি ঢাকা মহানগর পুলিশের অধীনে হলেও সারা দেশের জন্য তারা কাজ করবে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও ডিএমপির কার্যালয় সূত্র বলেছে, দেশে জঙ্গি সংগঠনের কার্যক্রম বিস্তৃত হওয়ায় পুলিশ বিভাগে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের আদলে একটি বিশেষ ইউনিট গঠনের জন্য অনেক দিন ধরে জাতিসংঘ থেকে তাগিদ দেওয়া হচ্ছে।
পুলিশের কয়েকজন কর্মকর্তা বলেন, প্রতিবছরই পুলিশের কর্মকর্তারা পড়াশোনা করতে ও প্রশিক্ষণে বিদেশে যান। তাঁদের অর্ধেকেরই পড়ার বিষয় থাকে ‘কাউন্টার টেররিজম’ বা এ-সংশ্লিষ্ট বিষয়। সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ বিষয়ে অনেকে পিএইচডিও করেছেন। তবে প্ল্যাটফর্ম না থাকায় এসব মাঠপর্যায়ে কাজে লাগছে না। কয়েকটি গোয়েন্দা সংস্থার ‘জঙ্গি’ সেল থাকলেও বিশেষায়িত ইউনিট নেই। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কার্যক্রম তথ্য দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। জঙ্গি দমনে পুলিশের কোনো বিশেষায়িত ইউনিট নেই। র্যাবের গোয়েন্দা শাখায় জঙ্গি দমনে অল্প কয়েকজনের একটি বিশেষায়িত সেল রয়েছে। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনগুলো যেভাবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে, এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় গোয়েন্দা সরঞ্জামসহ বিশেষায়িত ইউনিট গঠন করা জরুরি।
জানতে চাইলে পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) নূরুল হুদা প্রথম আলোকে বলেন, ‘নাম শুনেই বোঝা যাচ্ছে তাদের কাজ কী হবে। এমন ইউনিটের খুবই প্রয়োজন রয়েছে। বিশেষ করে এখনকার যে পরিস্থিতি তা সামনে রেখে এ ইউনিট গঠন করা একটি সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত বলে আমি মনে করি। পৃথিবীর সব দেশেই এমন ইউনিট রয়েছে। এ ইউনিট গঠনের পর জঙ্গির বিষয়টি সার্বক্ষণিক তদারক করা যাবে।’
পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, জঙ্গি মামলা তদন্ত করার সক্ষমতা থানা-পুলিশের নেই। অথচ থানার মাধ্যমে পুলিশের নেটওয়ার্ক দেশের সর্বত্র বিস্তৃত। পুলিশের পক্ষেই সম্ভব প্রত্যন্ত এলাকার প্রান্তিক মানুষের কাছে পর্যন্ত পৌঁছানো। কিন্তু জঙ্গি গ্রেপ্তার এবং এ-সংক্রান্ত মামলা এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি তদন্ত করেছে র্যাব ও ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)। এ ক্ষেত্রে সারা দেশে কাজ করতে পিবিসিটির দ্রুত অনুমোদন দেওয়া উচিত।
দেশে গত চার মাসে ধর্মীয় ভিন্নমতাবলম্বী ব্যক্তি, সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ও প্রতিষ্ঠানের ওপর ১৯টি হামলা হয়েছে। পুলিশের ধারণা, জঙ্গিরা এসব ঘটনা ঘটিয়েছে। গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলছেন, এখন জঙ্গিদের তত্ত্ব ও বার্তা প্রচার, নতুন সদস্য নিয়োগ, অর্থায়ন ও প্রশিক্ষণ হচ্ছে ইন্টারনেটের মাধ্যমে। ইন্টারনেটে বিশেষ দৃষ্টি নিয়ে এগুলো নজরদারির এখন কেউ নেই। বিশেষায়িত ইউনিট জঙ্গি নিয়েই লেগে থাকবে। প্রতিনিয়ত নজরদারি ও গবেষণা করবে।
ডিবির শীর্ষস্থানীয় এক কর্মকর্তা বলেন, এ রকম বিশেষায়িত ইউনিটে কর্মকর্তাদের ঝুঁকি থাকবে বেশি। তাই তাঁদের সে পরিমাণে ভাতা ও প্রণোদনা দিতে হবে। কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ, মোটিভেশন থাকতে হবে। তাঁদের পড়তে হবে, জানতে হবে। সে জন্যই প্রণোদনা প্রয়োজন। আবার এসব ক্ষেত্রে এখন গোয়েন্দা তথ্য কিনতে হয়। সে জন্য বিশেষ ভাতা, পর্যাপ্ত সোর্স মানি লাগবে।