জঙ্গি–সংশ্লিষ্টদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার উদ্যোগ

752

রোজিনা ইসলাম | ২৭ ডিসেম্বর, ২০১৫
আনসারুল্লাহ বাংলা টিম (এবিটি), হরকাতুল জিহাদ আল ইসলাম, জামায়াতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশসহ (জেএমবি) জঙ্গি সংগঠনগুলোর সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এই লক্ষে৵ নিষিদ্ধঘোষিত আনসারুল্লাহ বাংলা টিমকে অর্থায়নকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে চিহ্নিত করার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের সহায়তা চেয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
জবাবে বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, জঙ্গি সংগঠনের নামে কোনো হিসাব পরিচালিত হয়ে থাকলে মানি লন্ডারিং অধ্যাদেশ অনুযায়ী ওই হিসাবের লেনদেন ৩০ দিন করে সর্বোচ্চ ২১০ দিন অবরুদ্ধ রাখা যাবে।
এর আগে গত মাসে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কিত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বাংলাদেশ ব্যাংককে চিঠি দিয়েছিল অর্থ মন্ত্রণালয়। চিঠির সঙ্গে জামায়াত-শিবিরের সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন আর্থিক, সেবামূলক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ ৫৬১টি প্রতিষ্ঠানের তালিকা দেওয়া হয়। গত বছর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কাছে পুলিশও জামায়াতের সঙ্গে সম্পৃক্ত ১২৭টি প্রতিষ্ঠানকে চিহ্নিত করে ৩৭৩ পৃষ্ঠার একটি প্রতিবেদন দাখিল করেছিল।
জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের অর্থায়নকারীদের খুঁজে বের করা এবং তাদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার উদ্যোগের বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ‘জেএমবিসহ জঙ্গি সংগঠনগুলো আগে দেশের ভেতর জাকাত, কোরবানির পশুর চামড়া বিক্রি এবং বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানে মানুষের দান থেকে অর্থ সংগ্রহ করত। বর্তমানে তারা নেতা-কর্মী-সমর্থক এবং বিদেশ থেকে চাঁদা ও অর্থ সংগ্রহ করছে। এর বাইরে দাতব্য সংস্থা বা এনজিওর ব্যানারেও অর্থ আসে। এসব প্রতিষ্ঠানের অর্থের উৎস এবং ব্যবহার খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ও বাংলাদেশ ব্যাংককে এ বিষয়ে চিঠি দিয়েছে।
কোন কোন জঙ্গি সংগঠনের অর্থায়ন বন্ধে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে—জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘এরা সব একই। যারা জামায়াতে ইসলামী, তারাই জেএমবি, তারাই আনসারুল্লাহ বাংলা টিম। আমরা সার্বিকভাবেই অর্থায়ন বন্ধে নজরদারি বাড়িয়েছি।’
তবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পাঠানো চিঠির জবাবে বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, আনসারুল্লাহ বাংলা টিমসহ জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পরিচিতিমূলক তথ্য যেমন: নাম, পিতার নাম, মাতার নাম, ঠিকানা, জাতীয় পরিচয়পত্র এখনো পাওয়া যায়নি। পুলিশের কাছে থাকা জঙ্গি কার্যক্রমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অভিযুক্ত এবং গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের পরিচিতিমূলক তথ্য সময়ে সময়ে সরবরাহ করা হলে জঙ্গি অর্থায়নবিষয়ক অনুসন্ধান কার্যক্রম অধিকতর কার্যকর করা যাবে। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহে কোনো হিসাব পরিচালিত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেলে তা যথাসময়ে তাদের জানাতে অনুরোধ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে জানা গেছে, এর আগে জামায়াতে ইসলামী নিয়ন্ত্রিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংককে যে চিঠি দেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে এখনো কোনো তথ্য মন্ত্রণালয়ে আসেনি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, তাঁরা ওই তথ্যের অপেক্ষায় রয়েছেন।
অবশ্য বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক শুভংকর সাহা এ প্রসঙ্গে প্রথম আলোকে বলেন, জঙ্গি সংগঠনগুলোর সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কাজ শুরু করেছে। তিনি বলেন, জামায়াত-শিবির নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে তালিকা ও চিঠি পাওয়ার পরই বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে এসব প্রতিষ্ঠানে চাকরিরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নাম, ঠিকানাসহ বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আরেক প্রতিবেদনে দেখা যায়, জামায়াত-শিবিরসহ শাহাদাত-ই আল হিকমা পার্টি বাংলাদেশ, জাগ্রত মুসলিম জনতা বাংলাদেশ (জেএমজেবি), জামাআতুল মুজাহিদীন, হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী, হিজবুত তাহ্রীরের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কার্যক্রমের অর্থ জোগান দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এসব সংগঠনের নিয়ন্ত্রণে থাকা বিভিন্ন সংস্থা-প্রতিষ্ঠানের নামে যেসব ব্যাংক হিসাব রয়েছে, সেগুলোর অর্থ উত্তোলন করে শাখার দায়িত্বে যেসব নেতা রয়েছেন, তাঁদের নামে যৌথ হিসাব খুলে রাখা হচ্ছে। কোচিং সেন্টারের নামে ব্যাংক হিসাবে অর্থ না রেখে যৌথ হিসাব খুলে অর্থ জমা রাখছে। পাশাপাশি নতুন ব্যাংক হিসাবে অর্থ নেওয়ার ক্ষেত্রে নগদ টাকা তুলে তা করা হচ্ছে।
মুদ্রা পাচার ও জঙ্গি বা সন্ত্রাসী অর্থায়ন বন্ধে বাংলাদেশের সক্ষমতা যাচাইয়ে গত অক্টোবর মাসে এশিয়া প্যাসিফিক গ্রুপ (এপিজি) অন মানি লন্ডারিং-সংক্রান্ত একটি বিশেষজ্ঞ দল প্রায় দুই সপ্তাহ ঢাকায় অবস্থান করে। তারা জঙ্গি অর্থায়ন প্রতিরোধে বাংলাদেশের সক্ষমতাকে ‘দুর্বল’ বলে চিহ্নিত করে।
জঙ্গি অর্থায়নে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের খুঁজে বের করা কতটা সহজ হবে—জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ গতকাল রাতে প্রথম আলোকে বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকে জঙ্গি অর্থায়নবিরোধী ইন্টেলিজেন্স সেল গঠন করা হয়েছে। এটা নিয়ে দুদক কাজ করছে, কাজ করছে পুলিশের বিশেষ তদন্ত বিভাগও। তবে তাদের দক্ষ হতে সময় লাগবে।
ইব্রাহিম খালেদ বলেন, বাংলাদেশে জঙ্গি অর্থায়ন হয় প্রধানত অনানুষ্ঠানিক খাতের মাধ্যমে। কয়েকটি ব্যাংকের বিরুদ্ধে জঙ্গি অর্থায়নের অভিযোগ থাকলেও বাংলাদেশ ব্যাংক তা এখনো তদন্তের মাধ্যমে প্রমাণ করতে পারেনি। তাই জঙ্গি অর্থায়ন প্রতিরোধে এদের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।