সাময়িক সনদে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে অতিরিক্ত এক বছর চাকরি

874

জনপ্রশাসনের মতামত চেয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের চিঠি

রোজিনা ইসলাম | ২৫ ডিসেম্বর, ২০১৫   

মুক্তিযোদ্ধার সাময়িক সনদ বা প্রত্যয়ন জমা দিয়ে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অতিরিক্ত এক বছর চাকরি অব্যাহত রাখা যাবে কি না, সে বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের মতামত জানতে চেয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। সাময়িক সনদ বা প্রত্যয়নের ক্ষেত্রে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে এই মতামত চাওয়া হয়েছে।

কর্মকর্তাদের প্রত্যয়নের ক্ষেত্রে সম্প্রতি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় যে সাময়িক সনদ দিচ্ছে তাতে উল্লেখ রয়েছে, জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের (জামুকা) গেজেট যাচাই-বাছাই শেষে বিরূপ মন্তব্য পাওয়া না গেলে চূড়ান্ত সনদ দেওয়া হবে। অর্থাৎ বিরূপ মন্তব্য থাকলে সাময়িক সনদ বাতিল করা হবে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের মতে, মুক্তিযোদ্ধার সাময়িক সনদ দিয়ে যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়মিত অবসর গ্রহণের বয়সসীমার (৫৯ বছর) অতিরিক্ত এক বছর চাকরি করছেন, পরে যাচাই-বাছাইয়ে তাঁদের সাময়িক সনদ বাতিল হলে জটিলতা তৈরি হবে। কারণ, সনদ বাতিল হলে তাঁদের অতিরিক্ত সময়ের চাকরি অবৈধ বলে বিবেচিত হবে। অতিরিক্ত সময়ের চাকরির জন্য সরকারি কোষাগার থেকে নেওয়া বেতন-ভাতা ফেরত আনার এবং ওই এক বছরে তাঁদের নেওয়া সিদ্ধান্তের কী হবে, সে বিষয়ে কোনো নির্দেশনা নেই।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের উপসচিব মতিয়ার রহমানের স্বাক্ষরে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, মুক্তিযোদ্ধা কর্মকর্তাদের সনদ মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রত্যয়নের পর তাঁদের অতিরিক্ত এক বছর চাকরির সুযোগ দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা কর্মকর্তা-কর্মচারীর সনদ সাময়িক প্রত্যয়নের পরিপ্রেক্ষিতে অবসরের বয়সসীমার পর চাকরি অব্যাহত রাখা হলে এবং পরবর্তী সময়ে মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী তাঁদের সনদ চূড়ান্তভাবে প্রত্যয়ন করা না হয় তাহলে তাঁদের অতিরিক্ত সময় দায়িত্ব পালনের ফলে প্রশাসনিক ও আর্থিক জটিলতার সৃষ্টি হবে। তা ছাড়া অনুরূপ শর্তাধীন চূড়ান্ত প্রত্যয়নের বিষয়টি সময়সাপেক্ষও। তাই যেসব ক্ষেত্রে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সাময়িকভাবে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে প্রত্যয়ন করা হচ্ছে, তাঁদের অতিরিক্ত এক বছর চাকরিতে রাখা যাবে কি না, সে বিষয়ে জরুরি ভিত্তিতে মতামত জানতে চাওয়া হয়।
চিঠির সঙ্গে সাময়িক প্রত্যয়নপত্রের দুটি ফটোকপিও সংযুক্ত করা হয়।
জানতে চাইলে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘যে প্রশ্নটি তোলা হয়েছে তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়ে আমাদের পরামর্শ থাকবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কাছ থেকে লিখিত বা হলফনামা নেওয়া। হলফনামায় ওই কর্মকর্তাকে বলতে হবে, তাঁর সনদ বাতিল হলে তিনি ওই সময়ে যে আর্থিক সুবিধা নিয়েছেন তা ফেরত দেবেন এবং সনদ ভুয়া প্রমাণিত হলে তাঁর বিরুদ্ধে ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ বিষয়ে আমরা শিগগির প্রজ্ঞাপন জারি করব।’
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সূত্র বলেছে, ২০১৩ সালে সরকার গেজেট নোটিফিকেশনের মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সরকারি চাকরির বয়সসীমা ৬০ বছর নির্ধারণ করে। তখন বলা হয়েছিল, কর্মরত মুক্তিযোদ্ধা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বর্ধিত সময়ের চাকরির ক্ষেত্রে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও জামুকা যৌথভাবে তাঁদের সত্যায়ন করবে। তাহলে মুক্তিযোদ্ধা নন এমন কেউ বর্ধিত সময় চাকরির সুযোগ পাবেন না। বর্ধিত সময় চাকরি করছেন এমন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ইতিমধ্যে মন্ত্রণালয় থেকে সত্যায়ন করা হয়েছে।
সাবেক সেনাপ্রধান ও সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের সহসভাপতি লে. জে. (অব.) হারুন অর রশীদ বলেন, ৪৪ বছর পর এসে এখন কেন ঠিক করতে হবে কে মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন আর কে নয়। এগুলো আসলে করা হচ্ছে কারও কারও বিশেষ বিবেচনায়।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একজন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বলেন, সাময়িক সনদে অতিরিক্ত সময়ে চাকরি অব্যাহত রাখা হবে কি না, বিষয়টি স্পষ্টকরণে এখনই পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। কারণ, ইতিমধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের শুল্ক গোয়েন্দা অধিদপ্তরের পাঁচ মুক্তিযোদ্ধা কর্মকর্তা বর্ধিত সময় চাকরি শেষে অবসরে গেছেন। তাঁদের পেনশন অ্যাকাউন্টস বিভাগ আটকে দিয়েছে। অ্যাকাউন্টস বিভাগ জানতে চেয়েছে, তাঁরা যে মুক্তিযোদ্ধা তার প্রমাণ দিতে হবে। জবাবে তাঁরা বলেছেন, তাঁরা মুজিবনগর সরকারের কর্মচারী। সুতরাং তাঁরা মুক্তিযোদ্ধা। অ্যাকাউন্টস বিভাগ তা মানছে না। এখন ওই পাঁচ কর্মকর্তা এক বছরের বেতন-ভাতা ফেরত দিয়ে পেনশন পেতে চান। ওই এক বছরের বেতন-ভাতা ফেরত নিয়ে তাঁদের পেনশন মঞ্জুর করা যায় কি না, তা জানতে চেয়ে অ্যাকাউন্টস বিভাগের পক্ষ থেকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কাছে মতামত চাওয়া হয়েছে।