আরও ৪১ নারী মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পাচ্ছেন

970

রোজিনা ইসলাম | ২২ ডিসেম্বর, ২০১৫
কুষ্টিয়ার দয়রামপুরের দুলজান নেছার হাসি-কান্না মেশানো কণ্ঠ বলে দিচ্ছিল ৪৪ বছর বয়ে বেড়ানো কষ্ট তাঁকে কতটা পীড়া দিয়েছে, আবার এত বছর পর পাওয়া স্বীকৃতিতে তিনি কতটা আনন্দিত। মায়ের মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতিতে একটু বেশি রকমের আবেগতাড়িত মেয়ে সুমনা খাতুনও। তাই দুলজান নেছার সঙ্গে মুঠোফোনে আলাপের সময় তা টেনে নিয়ে বললেন, ‘আমি এখন মুক্তিযোদ্ধা মায়ের সন্তান, “মিলিটারির” নই।’
মুঠোফোনে সুমনা একটানে বলে গেলেন, ‘সারা জীবন অনেক গালমন্দ শুনতে হয়েছে। এমনকি বিয়ের পর আমাকে “মিলিটারির মেয়ে” বলে গালাগালি দিয়ে বের করে দেওয়া হয়েছিল। আর মাকে তো সেই ছোটবেলা থেকে লোকে ঘেন্না করেছে। আজ মনে হচ্ছে আমাদের কষ্টের দিন শেষ হলো, অনেক দুঃখের পর সুখ এল!’
দুলজান নেছার মতো ৪১ জন নারী, যাঁরা মুক্তিযুদ্ধের সময় নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন, তাঁরা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি পেতে যাচ্ছেন। এর আগে গত ১২ অক্টোবর প্রথম দফায় ৪১ জন বীরাঙ্গনাকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল।
এবার উপজেলা পর্যায়ে ১২১টি আবেদন জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলে (জামুকা) জমা পড়ে। যাচাই-বাছাইয়ের পর এর মধ্যে ৫৪টি আবেদন জামুকার ৩৩তম বৈঠকে উপস্থাপন করা হয় এবং ৪১ জনকে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এ বিষয়ে শিগগিরই প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মুক্তিযুদ্ধের সময় নির্যাতিত নারীদের ‘বীরাঙ্গনা’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে সম্মান জানিয়েছিলেন। তিনি তাঁদের পুনর্বাসনেরও ঘোষণা দিয়েছিলেন। গত বছরের জানুয়ারি মাসে হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ এ ব্যাপারে রুল জারি করেন এবং বীরাঙ্গনাদের তালিকা প্রকাশের নির্দেশ দেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে সরকার বীরাঙ্গনাদের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
স্বাধীনতার ৪৪ বছর পর মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পেয়ে চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি কুমারখালী উপজেলার এলেজান নেছাও। তাঁর বয়স সত্তর ছুঁই ছুঁই। এলেজান নেছা গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘অতীতের কথা মনে হলে এখনো শিউরে উঠি। নানা বৈরিতা নীরবে সহ্য করেছি। মাথা নিচু করে থাকতে হয়েছে। সন্তানদের বিয়ে দিতে গিয়ে সহ্য করতে হয়েছে নানা প্রতিবন্ধকতা। অন্যের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করে অভাব-অনটনের সঙ্গে যুদ্ধ করছি এখনো। আজ এত বছর পর সরকারের স্বীকৃতি পেয়েছি। শুধু কান্না আসছে।’
মুক্তিযুদ্ধের সময় নির্যাতনের শিকার নারীদের একটি বড় অংশ ছিল গ্রামাঞ্চলের। ফলে গ্রামীণ রক্ষণশীল সমাজের বাস্তবতায় কঠিন সময় পার করতে হয়েছে এসব নারীকে।
প্রথম আলোর পক্ষ থেকে গতকাল অন্তত ১৫ জন নারী মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে কথা হয়েছে। তাঁরা সাবলীলভাবেই জানিয়েছেন, মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তাঁরা গর্ববোধ করেন।
মুক্তিযুদ্ধবিষয়কমন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, এ স্বীকৃতির মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে সম্ভ্রম হারানো নারীদের ত্যাগের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি মিলল। সাধারণ মুক্তিযোদ্ধাদের মতো এখন তাঁরাও ভাতাসহ পূর্ণ সুযোগ-সুবিধা পাবেন। মন্ত্রী জানান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁদের হাতে সম্মানী ভাতা তুলে দেবেন। কেউ মারা গিয়ে থাকলে তাঁর সন্তানেরা স্বীকৃতির জন্য আবেদন করতে পারবেন।
স্বীকৃতি পেতে যাওয়া ৪১ নারী মুক্তিযোদ্ধার মধ্যে চারজন কুষ্টিয়ার এলেজান নেছা, দুলজান নেছা, মোমেনা খাতুন ও মাছুদা খাতুন। এই চারজনই শহীদজননী জাহানারা ইমামের গণ-আদালতে গোলাম আযমদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন।
মোমেনা খাতুন প্রথম আলোকে বলেন, ‘সারা জীবন আক্ষেপ নিয়ে থাকতে হবে ভেবেছিলাম। জীবনের শেষ সময় যে এমন স্বীকৃতি পাব, ভাবতেও পারিনি।’
সিরাজগঞ্জের দুই নারী—আছিয়া খাতুন ও জোসনা বানু—কেউই বেঁচে নেই। তাঁদের খুঁজে বের করেছিলেন উত্তরণ মহিলা সংস্থা নামের একটি সংগঠন। সংগঠনের পরিচালক সাফেনা লোহানি আক্ষেপ করে বললেন, ‘জীবনের শেষ প্রান্তে এসেও তাঁরা আমাকে বলেছিলেন, স্বীকৃতিটুকু পাওয়ার পর মৃত্যু হলে তাঁরা ভারমুক্ত হবেন। দুঃখের বিষয়, তাঁরা এই আনন্দ দেখে যেতে পারলেন না।’ তিনি জানান, বীরাঙ্গনা জানার পর আছিয়া খাতুনের স্বামী তাঁকে ত্যাগ করেছিলেন। আর জোসনা বানু বিয়েই করেননি।
যশোরের মোমেনা খাতুন প্রথম আলোকে বলেন, ‘এত দিন আমরা মুখ বুজে ছিলাম, কিন্তু সরকার আমাদের খুঁজে বের করেছে, সম্মান দিয়েছে। আমাদের জয় হয়েছে।’ একই উপজেলার রহিমা খাতুনও পেয়েছেন নারী মুক্তিযোদ্ধার সম্মান। তিনি বলেন, এত সব কষ্টের দিনে গেছে! এখন শেষ সময়ে স্বীকৃতি মিলল। শেষে বললেন, ‘শেখের বেটিকে ধন্যবাদ।’
আরও যাঁরা মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পাচ্ছেন তাঁরা হলেন নড়াইলের নিগার সুলতানা, বাগেরহাটের আনোয়ারা খাতুন, বরগুনার সিতারা বেগম, সাতক্ষীরার সাবিত্রীর চক্রবর্তী, ছফুরা খাতুন, মিছতারা বিবি, মোছা. সোনা, বরিশালের কহিনুর বেগম, চুয়াডাঙ্গার শকুরন নেছা, কুমিল্লার বেলা রানী দাস, সিলেটের জোসনা বেগম, লাইলী, নমিতা রানী দাস, গোপালগঞ্জের রিভা বেগম, লাইলী বেগম, সালেহা বেগম, হীরামণি সাঁওতাল, সালেহা বেগম, হবিগঞ্জের হারীমণি সাঁওতাল, সাবিত্রী নায়েক, শেরপুরের আয়শা খাতুন, সরফুলী বেগম, বিবি হাওয়া হাফিজা বেওয়া, জোবেদা বেওয়া, হাসেনা বানু, সমলা বেওয়া, আসিরন বেওয়া, ঢাকার আমেনা বেগম, ফিরোজা বেগম, শেখ ফাতেমা আলী, ছাপাতন বেওয়া, রাজকুমারী রবিদাস ফুলমতি।
সাধারণ মুক্তিযোদ্ধারা বর্তমানে মাসিক আট হাজার টাকা ভাতা পান। নারী মুক্তিযোদ্ধারা একই সমান ভাতা পাবেন। তাঁদের সন্তান ও নাতি-নাতনিদের চাকরির ক্ষেত্রে ৩০ শতাংশ কোটা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি ও বিনা মূল্যে পড়ালেখার সুযোগ পাবেন।