৮৫০ সাধারণ পাসপোর্টকে সরকারি বানিয়ে ‘মানব পাচার’!

991

রোজিনা ইসলাম | ০৫ ডিসেম্বর, ২০১৫
জাল ও ভুয়া অনাপত্তিপত্র (এনওসি) দিয়ে ৮৫০টি সাধারণ পাসপোর্টকে অফিশিয়াল বা সরকারি পাসপোর্টে রূপান্তর করে নিয়েছে মানব পাচারের সঙ্গে জড়িত একটি চক্র। এসব পাসপোর্টধারীদের সরকারি কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে বড় অঙ্কের টাকার বিনিময়ে বিদেশে পাঠানো হয়েছে।
পাসপোর্ট ও বহিরাগমন অধিদপ্তরের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে এই রূপান্তর করা হয়েছে বলে অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা মনে করছেন। এসব পাসপোর্টের জন্য যাঁরা অনাপত্তি দিয়েছেন এবং যাঁদের নামে এসব পাসপোর্ট ইস্যু করা হয়েছে, তাঁদের বেশ কয়েকবার শুনানির জন্য ডাকা হলেও তাঁরা পাসপোর্ট অধিদপ্তরে হাজির হননি। এখন এঁদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। ইতিমধ্যে জাল ও ভুয়া অনাপত্তিপত্রের মাধ্যমে পাসপোর্ট দেওয়ার সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে তিনজন কর্মচারীকে সাময়িক বরখাস্ত করে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আরও ১০ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে শাস্তিমূলক বদলি করা হয়েছে।
একই সঙ্গে সরকারি পাসপোর্টের প্রাধিকার সংকুচিত করা, এনওসি ফরম পরিবর্তন ও পুরো প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
পাসপোর্ট ও বহিরাগমন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এন এম জিয়াউল আলম ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, ‘পাসপোর্টের এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। তদন্ত-প্রক্রিয়া চলছে, গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও তদন্ত করছে। আমরা এই ৮৫০ জনের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে কাজ শুরু করেছি।’
মহাপরিচালক বলেন, তাঁরা সরকারি পাসপোর্ট পাওয়ার নিয়মকানুনও কঠোর করছেন। অনাপত্তিপত্রের ছকেও পরিবর্তন আনা হচ্ছে। যে কর্মকর্তা সরকারি পাসপোর্ট নিয়ে যাবেন সেই কর্মকর্তা যে মন্ত্রণালয়ের অধীনে কাজ করেন, সেখানকার ওয়েবসাইটে তাঁর বিস্তারিত বিবরণ ও এনওসি থাকবে। সরকারি আদেশ এবং এনওসি অফিসের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হলে জালিয়াতি বন্ধ হবে। এ ছাড়া প্রাধিকার সংকুচিত করার বিষয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে।
মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলেন, এক বছরে সাধারণ থেকে বদলে সরকারি পাসপোর্ট করা হয়েছে ৮৯২টি। এর মধ্যে ৮৫০টিকে সন্দেহজনক হিসেবে শনাক্ত করা হয়। পাসপোর্টের মূল নথির সঙ্গে সংযুক্ত দালিলিক প্রমাণ যাচাই-বাছাই করে এগুলো চিহ্নিত করেছে অধিদপ্তরের তদন্ত কমিটি। ভুয়া এনওসি সবচেয়ে বেশি এসেছে স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে। এই পাসপোর্ট ব্যবহার করে চিকিৎসক ও নার্স হিসেবে প্রথমে সিঙ্গাপুর এবং পরে সেখান থেকে বেশির ভাগ ব্যক্তি অন্য দেশে চলে গেছেন বলে তদন্তু কমিটির সূত্র জানায়। এই পাসপোর্ট ব্যবহার করে তুরস্কে গিয়ে সেখান থেকে অন্য দেশে চলে যাওয়ার অভিযোগও রয়েছে। সম্প্রতি তুরস্ক সরকারের দেওয়া চিঠিতেও কয়েকটি মানব পাচারের ঘটনা প্রকাশ পায়।
তদন্ত কমিটি অনুসন্ধান করে জানতে পেরেছে, এসব পাসপোর্ট নিয়ে যাঁরা বিদেশে গেছেন তাঁদের বেশির ভাগই প্রতারণার শিকার হয়েছেন। তাঁরা ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা দিয়ে দালালের মাধ্যমে এসব পাসপোর্ট পেয়েছেন। এর মধ্যে বেশির ভাগ লোকই বিদেশে থাকায় তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেনি কমিটি। তবে ঠিকানা অনুযায়ী পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে তথ্য নিয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের সূত্র বলেছে, এখন নীতিমালা পরিবর্তন করে সাধারণ পাসপোর্টকে দুই শ্রেণিতে ভাগ করা হবে। সাধারণ জনগণকে সবুজ রঙের যে পাসপোর্ট দেওয়া হয়, তেমন পাসপোর্টই দেওয়া হবে প্রথম শ্রেণির নিচের কর্মকর্তাদের। তবে তাঁদের পাসপোর্টে লেখা থাকবে পিজি (পাসপোর্ট গভর্নমেন্ট)। আর অফিশিয়াল পাসপোর্টের নম্বরের আগে লেখা থাকবে ওসি (অফিশিয়াল ক্যাটাগরি)। বর্তমানে সরকারি পাসপোর্টধারীরা কেবল জিও নিয়ে বিদেশ যেতে পারেন। কিন্তু নতুন নিয়মে তাঁদের আগে জিও নিতে হবে এবং সেই জিও দেখিয়ে সরকারি পাসপোর্ট সংগ্রহ করতে হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল প্রথম আলোকে বলেন, বেশ কয়েকটি দেশ থেকে অফিশিয়াল পাসপোর্ট কমানোর অনুরোধ এসেছে। এ কারণে অফিশিয়াল পাসপোর্টের শ্রেণি পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। এখন থেকে গণহারে নয়, জিওর ভিত্তিতে অফিশিয়াল পাসপোর্ট দেওয়া হবে।