প্রিয়জনের ফিরে আসার প্রতীক্ষায় স্বজনেরা

733

রোজিনা ইসলাম | ০৪ ডিসেম্বর, ২০১৫
গত বছরের ৪ ডিসেম্বর জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে হাতে মাইক্রোফোন নিয়েও কিছুই বলতে পারেননি নিখোঁজ সাজেদুল ইসলাম সুমনের মা হাজেরা খাতুন l ফাইল ছবি‘প্রতিদিনই ভাবি, ঘুম ভেঙেই রাইতা ও আরওয়ার বাবার একটা খবর পাব, ওদের বাবা এসে সারপ্রাইজ দিয়ে বলবে, “আরে, আমি তো ইচ্ছে করেই লুকিয়ে ছিলাম,” অপেক্ষায় দিন পার হয়, কিন্তু দিন শেষে আর সে ফিরে আসে না—এভাবেই প্রতীক্ষায় দিন পার করছি। দুই বছর আগে আজকের দিনেই (৪ ডিসেম্বর) নিখোঁজ হয় আমার স্বামী।’ শাহিনবাগের নিজ বাসায় কাঁদতে কাঁদতে প্রথম আলোর কাছে এসব কথা বলছিলেন নাছিমা আক্তার। তাঁর স্বামী রাজধানীর ৩৮ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাজেদুল ইসলাম ওরফে সুমনসহ মোট আটজন ২০১৩ সালের ৪ ডিসেম্বর থেকে নিখোঁজ। র্যাব-১-এর গাড়িতে করে তাঁদের উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় বলে অভিযোগ করেছে ভুক্তভোগীদের পরিবার।
নাছিমা আক্তার যখন কথা বলছিলেন, তখন তাঁর পাঁচ বছরের মেয়ে আরওয়া ও শাশুড়ি হাজেরা খাতুন অ্যালবামে ছেলের ছবি দেখছিলেন। ছবিতে সাজেদুল ও তাঁর স্ত্রীর হাসি হাসি মুখ দেখা গেলেও তখন আরওয়ার ও তার দাদির মুখ ছিল মলিন। বড় মেয়ে রাইতা বলে, আরওয়া প্রতিদিনই অ্যালবাম দেখে জানতে চায় তাদের বাবা কাজ শেষে কবে বাড়ি ফিরবে, যাকে সে অনেক দিন ধরেই খুঁজে পাচ্ছে না। ২০১৩ সালের ২৮ নভেম্বর থেকে ১১ ডিসেম্বরের মধ্যে এমন ১৯ জনের নিখোঁজ হওয়ার কথা জানা গেছে, যাঁরা রাজধানীতে থাকতেন।
গত দুই বছরে নিখোঁজ ব্যক্তিদের স্বজনেরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যালয়সহ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে গিয়েছেন, কয়েক দফা দরখাস্ত দিয়েছেন। এ ছাড়া বেশ কয়েকবার মানববন্ধন ও সংবাদ সম্মেলন করেছেন। দেশে ও বিদেশে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সঙ্গে স্বজনদের ফিরে পাওয়ার আকুতি জানিয়েছেন। তবে সাধারণ ডায়েরি ও মামলা করতে চাইলে তা নেওয়া হয়নি বলে তাঁরা জানিয়েছেন।
নিখোঁজ হওয়া স্বজনদের পরিবারের অভিযোগ, ২০১৩ সালের ৪ ডিসেম্বর রাতে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা থেকে র্যাব-১ লেখা গাড়িতে সাজেদুলসহ ছয়জনকে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। ওই দিন ‘র্যাব’ লেখা কালো পোশাক পরা ও ‘র্যাব-১’ লেখা গাড়িতে আসা কয়েকজন লোক শাহিনবাগের বাসিন্দা বিএনপির নেতা সাজেদুল ইসলামসহ আটজন নিখোঁজ হন। অন্যরা হলেন সাজেদুলের খালাতো ভাই জাহিদুল করিম (তানভীর), পূর্ব নাখালপাড়ার আবদুল কাদের ভূঁইয়া (মাসুম), পশ্চিম নাখালপাড়ার মাজহারুল ইসলাম (রাসেল), মুগদাপাড়ার আসাদুজ্জামান (রানা) এবং উত্তর বাড্ডার আল আমিন। এ ছাড়া ওই রাতেই কালো পোশাকধারী কয়েকজন ব্যক্তি শাহিনবাগ এলাকা থেকে ধরে নিয়ে যান এ এম আদনান চৌধুরী ও কাওসার আহমেদ নামের দুই যুবককে।
২০১৩ সালে ২৮ নভেম্বর খালিদ হাসান (সোহেল) ও সম্রাট মোল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারের ফটক থেকে; ২ ডিসেম্বর জহিরুল ইসলাম (হাবিবুর বাশার জহির), পারভেজ হোসেন, মো. সোহেল ও মো. হোসেন (চনচল) শাহবাগ থেকে; ৬ ডিসেম্বর নিজাম উদ্দিন (মুন্না) ও তরিকুল ইসলাম (ঝন্টু) দক্ষিণখান মোল্লারটেক থেকে; ৭ ডিসেম্বর মাহবুব হাসান ও কাজি ফরহাদ সবুজবাগ থেকে এবং ১১ ডিসেম্বর মিরপুরের পল্লবী থেকে সেলিম রেজা (পিন্টু) নিখোঁজ হন। এঁদের অধিকাংশই ছাত্র। কেউ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের, কেউ তেজগাঁও কলেজ, কেউবা অন্য কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের। এর মধ্যে কেউ কেউ অতি সাধারণ পরিবারের। এসব পরিবারের সদস্যরা স্বজনদের ফিরে পেতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপ কামনা করেন। তাঁরা বলেন, প্রধানমন্ত্রীও স্বজনহারা। তিনি স্বজনহারাদের ব্যথা বোঝেন।
জানতে চাইলে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) অতিরিক্ত মহাপরিচালক লে. কর্নেল জিয়াউল আহসান বলেন, নিখোঁজ ব্যক্তিদের স্বজনেরা তাঁদের কাছেও অভিযোগ করেছেন। কেউ কেউ ফোনও করেছেন। কিন্তু যেহেতু নির্দিষ্ট করে কোনো তথ্য দিতে পারেননি, সেহেতু আসলে তারা র্যাব ছিল নাকি অন্য কোনো ব্যক্তি, তা জানা যায়নি। তবে তাঁদের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। কোনো তথ্য পাওয়া গেলে সঙ্গে সঙ্গে স্বজনদের জানাবেন বলে জানান তিনি।
.স্বজন হারানোর কথা এই প্রতিবেদকের কাছে বলতে গিয়ে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন পরিবারের সদস্যরা। নিখোঁজ স্বজনদের ‘ফিরিয়ে দেওয়ার’ আকুতির পাশাপাশি অপরাধীদের বিচারের দাবি জানিয়ে তাঁরা বলেন, ‘আমাদের পরিবারের কথা গত দুই বছরে রাষ্ট্র কিংবা কোনো মানুষ একবারও ভেবেছে? এভাবে আর কত দিন অপেক্ষা করতে হবে?’
নিখোঁজ হওয়া ১৯ যুবকের বিষয়ে জানতে চাইলে গত বুধবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘এদের বেশির ভাগই আমার পরিচিত, আমার নির্বাচনী এলাকার যুবক। আমি বহুবার চেষ্টা করেছি তাদের বিষয়ে জানতে, তথ্য খুঁজে বের করতে, কিন্তু কিছুই জানতে পারিনি। এর রহস্য বের হওয়া উচিত। আমি আবারও চেষ্টা করব। আমি সংশ্লিষ্টদের কাছে বিষয়টি জানতে চাইব।’
ছাত্রদলের এয়ারপোর্ট শাখার যুগ্ম সম্পাদক নিজাম উদ্দিনের (মুন্না) বাবা সামসুদ্দিন অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে তাঁর ছেলেকে খুঁজে বের করার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নিতে সরকারের কাছে দাবি জানান। তিনি বলেন, ‘সরকার কেন আমাদের জানায় না আমার ছেলে কোথায় আছে। আমার একটাই দাবি, আমার ছেলেকে ফেরত দিন।’
এ এম আদনান চৌধুরীর বাবা রুহুল আমিন মাস্টার প্রথম আলোকে বলেন, ‘দুই বছর হয়ে গেল আমাদের সন্তানদের খবর কেউ দিল না। আমাদের সন্তানেরা গুম হয়ে গেল, কিন্তু সরকার আজ পর্যন্ত কিছু জানাতে পারল না। এটা কি মগের মুল্লুক নাকি? আমাদের এখন অভিযোগ সরকারের বিরুদ্ধে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে। তারা শুধু “আমরা জানি না” ও “আমরা নিইনি” বলেই দায়িত্ব শেষ করে দিয়েছে।’
এ বিষয়ে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পরিচালক নূর খান বলেন, ‘বেশ কয়েক বছর ধরেই এভাবে নাগরিক গুম হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সরকার তাদের খুঁজে বের করতে দৃশ্যমান কিছু করছে বলে আমরা দেখছি না। এ ক্ষেত্রে আমরা রাষ্ট্রের অবহেলা দেখতে পাচ্ছি। এ ধরনের অনাচার-অবিচার সমাজে চলতে পারে না। কেউ নিখোঁজ হলে তাঁকে খুঁজে বের করার দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। এ দায়িত্ব পালন না করলে তাদের জবাবদিহি করতে হবে।’ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে কেউ যদি কাউকে তুলে নিয়ে যায়, সে ক্ষেত্রেও ঘটনা তদন্ত করে অপহরণের শিকার ব্যক্তিকে উদ্ধার ও জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব।
রাজধানীর ৭৯ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রদলের সভাপতি খালিদ হাসানের (সোহেল) স্ত্রী শাম্মী সুলতানা বলেন, ‘আমার সংসার আর চলছে না। কে আমার সন্তানদের পড়াশোনার খরচ দেবে। আমাদের দেখার কেউ নেই।’ তিনি বলেন, ‘সরকার দুই বছরেও কি আমার স্বামীকে খুঁজে বের করতে পারল না। আমি আমার স্বামীকে ফেরত চাই।’ গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) পরিচয়ে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল বলে তিনি দাবি করেন।
বিশিষ্ট আইনজীবী শাহদীন মালিক বলেন, ‘প্রতিটি গুমের বিচার হতেই হবে। এ দেশে না হলে আন্তর্জাতিক আদালতে গিয়ে হলেও আমরা গুম, খুনের বিচার চাইব। প্রতিটি গুমের বিচার হতেই হবে। এ দেশে এভাবে মানুষকে ধরে নিয়ে যাবে, আর সবাই কান্নাকাটি করবে, এটা হবে না।’
গত বছর বাংলাদেশের মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সহায়তা নিয়ে জাতিসংঘের ‘কমিটি অন এনফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স’ নিখোঁজ হওয়া স্বজনদের পরিবার বিচার চেয়ে আবেদন করে। পরে ১৪ থেকে ১৮ সেপ্টেম্বরে ওই কমিটির ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠকে সেশনে সাজেদুল ইসলামের বোন সানজিদা ইসলামকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। সেখানে তিনি তাঁর ভাইসহ বাংলাদেশে যাঁরা নিখোঁজ হয়েছেন, তাঁদের পক্ষে বক্তব্য তুলে ধরেন।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সানজিদা ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা জাতিসংঘে এ ঘটনার বিচার চেয়েছি। তারা বলেছে, সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করবে। তবে এখনো যোগাযোগ করেনি। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে খোঁজ নিলে এ বিষয়ে কেউ কিছু জানাতে পারেনি।’