খুনের সাজা মাফ করতে সাংসদের ডিও!

739
Aslam Fakir

রোজিনা ইসলাম | ০৩ ডিসেম্বর, ২০১৫
যজ্ঞেশ্বর গোপ নামে যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত এক ব্যক্তির সাজা মাফ করে দেওয়ার জন্য ডিও লেটার (আধা সরকারি পত্র) দিয়ে সুপারিশ করেছেন হবিগঞ্জের সাংসদ ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. আবু জাহির। খুনের দায়ে সাজাপ্রাপ্ত ওই ব্যক্তি হবিগঞ্জ জেলা আদালতের সহকারী কৌঁসুলি (এপিপি) যোতিশ চন্দ্র গোপের ভাই।
শান্ত গোপ নামে স্থানীয় একজন মিষ্টি ব্যবসায়ীকে হত্যার দায়ে আদালত যজ্ঞেশ্বর গোপকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন। আপিল করার পর উচ্চ আদালত সাজা কমিয়ে তাঁকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। বর্তমানে তিনি হবিগঞ্জ জেলা কারাগারে আছেন।
মামলার নথিপত্র থেকে জানা যায়, ১৯৯৭ সালে বিয়েবাড়ির একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে হবিগঞ্জ সদর উপজেলার নারায়ণপুর গ্রামের বাসিন্দা শান্ত গোপ ও যজ্ঞেশ্বরের মধ্যে ঝগড়া হয়। ২৭ বছর বয়সী শান্ত গোপ হবিগঞ্জের মিরপুর এলাকায় মিষ্টির ব্যবসা করতেন। ছুটিতে নারায়ণপুরের বাড়িতে এলে একদিন গভীর রাতে যজ্ঞেশ্বর গোপ তাঁর কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে দরজা ভেঙে ঘরে ঢুকে সবার চোখের সামনে শান্ত গোপকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করেন। পরে শান্ত গোপের বাবা জয়ন্ত গোপ বাদী হয়ে হবিগঞ্জ থানায় মামলা করেন।
যজ্ঞেশ্বরের সাজা মওকুফের জন্য তাঁর স্ত্রী বীণা রানী গোপ ২০০৮ সালের ২১ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতির কাছে আবেদন করেন। ওই আবেদনের পক্ষে সম্প্রতি সাংসদ মো. আবু জাহির ডিও লেটারে জানিয়েছেন, যজ্ঞেশ্বর গোপ তাঁর নির্বাচনী এলাকার বাসিন্দা। সাজা হওয়ার পর থেকে তাঁর পরিবার মানবেতর জীবন যাপন করছে। মানবিক দিক বিবেচনা করে তাঁর বাকি সাজা মাফ করার অনুরোধ করেন সাংসদ। আবু জাহির বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সদস্য।
একজন খুনির সাজা মাফের জন্য সুপারিশ করা কতটা যৌক্তিক, জানতে চাইলে সাংসদ আবু জাহির বলেন, ‘আমি ওই এলাকার জনপ্রতিনিধি, তাই সুপারিশ করতেই পারি। আমাকে বলা হয়েছে, বাদী-বিবাদীর বোঝাপড়া হয়ে গেছে, তাই আমি ডিও লেটারে সুপারিশ করেছি।’
তবে নিহত শান্ত গোপের বোন সুলেখা গোপ প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার ভাইয়ের খুনির সঙ্গে আমাদের কোনো যোগাযোগ নেই। বোঝাপড়ার প্রশ্নই ওঠে না।’ তিনি বলেন, ‘আমার ভাইয়ের মৃত্যুর শোকে আমার মা, বাবা দুজনই মারা গেছেন। সাংসদ কি তাঁদের ফিরিয়ে দিতে পারবেন? তিনি মানবিক কারণে খুনির সাজা মওকুফ চান। আমাদের যাঁরা মারা গেছেন, তাঁদের জীবনটা তিনি তাহলে ফিরিয়ে দিক!’
শান্ত গোপের পরিবারের সদস্যরা অভিযোগ করেছেন, যজ্ঞেশ্বরের ভাই সরকারি কৌঁসুলি। এই প্রভাব খাঁটিয়ে তিনি এটা করছেন। তাঁরা বলেন, এমনিতেই আসামির পরিবারের লোকজন তাঁদের নানাভাবে ভয়ভীতি দেখিয়ে আসছে। এখন খুনি যদি মুক্তি পায়, তাহলে তাঁদের পুরো পরিবারই হুমকির মুখে পড়বে।
সহকারী কৌঁসুলি যোতিশ চন্দ্র গোপ প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার ভাই প্রায় ১৫ বছর সাজা খেটেছে। আমি সরকারের লোক। আমার ভাই খুন করেনি। সে ঘটনার শিকার।’
সাংসদ আবু জাহিরের ডিও লেটারটি এখন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আছে। এখানে যাচাই-বাছাই শেষে সুপারিশ যৌক্তিক হলে তা প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ে পাঠানো হবে।
জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘রাষ্ট্রের কাছে যে কেউ ক্ষমা চেয়ে আবেদন করতে পারেন। আমরা রাষ্ট্রপতির কাছে বিধি মোতাবেক সেই আবেদন পৌঁছে দেব। সংবিধান অনুযায়ী ক্ষমা করার ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির। তিনিই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেবেন।’
জানতে চাইলে আইনজীবী শাহদীন মালিক প্রথম আলোকে বলেন, একজন খুনির সাজা মওকুফ হবে কি না, তিনি ক্ষমা পাওয়ার যোগ্য কি না, তা আইনগত বিচার-বিশ্লেষণের বিষয়। একজন সাংসদ এ ক্ষেত্রে কী করে সুপারিশ পাঠান, তা বোধগম্য নয়।