সিরিয়ায় নারী পাচার, যৌন ও গৃহকর্মী হিসেবে বিক্রি

716

রোজিনা ইসলাম | নভেম্বর ০৫, ২০১৫ | English Version

.যৌন ও গৃহকর্মী হিসেবে বিক্রি করার জন্য বাংলাদেশ থেকে নারীদের যুদ্ধকবলিত সিরিয়ায় পাচার করা হচ্ছে বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে তাঁদের সিরিয়ায় নিয়ে গিয়ে যৌনদাসী হিসেবে বাজারে তোলা হচ্ছে। পুলিশের বিশেষ বাহিনী র্যাব এ বিষয়ে সরকারের কাছে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তারা বলছে, অন্তত ৪৩ জন নারীকে সিরিয়ায় পাচার করা হয়েছে। তাঁদের ফিরিয়ে আনতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কেও অনুরোধ করা হয়েছে।
প্রথম আলোর অনুসন্ধানে দেখা গেছে, পাচার হওয়া এ রকম তিনজন নারী সিরিয়ায় গুরুতর অসুস্থ হওয়ার পর দেশে ফিরে এসেছেন। আলাপকালে তাঁরা জানিয়েছেন, সিরিয়ার বিভিন্ন শহরে তাঁদের মতো কয়েক শ বাংলাদেশি নারীকে যৌনকর্মী হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। কেউ কেউ কাজ করছেন গৃহকর্মী হিসেবে। তবে তাঁরা বলেছেন, আরও কিছু নারীকে সিরিয়ার কোথায় কী কাজে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, তা কেউ জানে না।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, আন্তর্জাতিক চক্রের হাতে পাচার হওয়া এ রকম একজন বাংলাদেশি নারীর দর প্রায় তিন লাখ টাকা। তবে বয়স ও চেহারাভেদে এর হেরফের হয়ে থাকে। দেশে ফেরা তিন নারী বলেন, পাচারের আগে তাঁদের আরবি ভাষাও শেখানো হয়েছে।
যেভাবে সিরিয়ায় পাচার হলো: ভুক্তভোগী নারীরা বলেন, প্রথমে তাঁদের লেবাননে পাঠানোর কথা ছিল। কিন্তু উড়োজাহাজ থেকে নামার পর জানতে পারেন, তাঁদের সিরিয়ায় নিয়ে আসা হয়েছে। সিরিয়া থেকে ফিরে আসা ঢাকার সায়েদাবাদের এক নারী প্রথম আলোকে বলেন, ‘যখন বিমানবন্দরে গিয়ে নামি, তখনো বুঝতে পারিনি যে আমাকে সিরিয়ায় নিয়ে আসা হয়েছে। রাস্তায় বোমা, গুলির আওয়াজ ও পুলিশ দেখে জানতে চাই এটা কোন দেশ। তখন বিমানবন্দরে আমাকে যিনি নিতে এসেছিলেন, তিনি জানান যে এটা সিরিয়া, এখানে যুদ্ধ চলছে।’ ওই নারী বলেন, তাঁকে যে অফিসে নেওয়া হয়, সেখানে যারা আসত তারা দেখতে পুলিশের মতো। তাদের জন্য তাঁকে রান্না করতে হতো। তারা মদ, মাংস আর রুটি খেত। যে মেয়েকে ভালো লাগত, তাঁকেই যৌনকাজে ব্যবহারের জন্য নিয়ে যেত।
ঢাকার সায়েদাবাদে বসবাসরত ওই নারী মূলত সেলাইয়ের কাজ করতেন। এলাকার বান্ধবীর মাধ্যমে দালাল নেকব্বরের সঙ্গে তাঁর পরিচয়। আর নেকব্বরের মাধ্যমেই পরিচয় হয় সিরাজ সিকদারের সঙ্গে। সিরাজ সে সময় নিজেকে আল রাবেতা ইন্টারন্যাশনাল ট্রাভেল এজেন্সির মালিক হিসেবে পরিচয় দেন। সিরাজ বলেন, গৃহকর্মী হিসেবে লেবাননে বিনা খরচে লোক নেওয়া হবে। কিন্তু শেষ মুহূর্তে জানান, টাকা ছাড়া নেওয়া যাবে না। তখন ওই নারী গ্রামে গিয়ে তিন কাঠা জমি বন্ধক রেখে ৫০ হাজার টাকা জোগাড় করেন। পরে সিরাজকে টাকা দেন। সিরাজ ওই নারীসহ আরও ছয়জনকে সিরিয়ায় নিয়ে যান। দেশ ছাড়ার আগে কয়েক সপ্তাহ তাঁদের ঢাকার বিভিন্ন হোটেলে রাখা হয়েছিল।
ভুক্তভোগী সায়েদাবাদের এই নারী বলেন, ‘সিরিয়ায় প্রথমে তাঁকে আল বাগদাদে নেওয়া হয়। সেখানে সকাল ১০টার পর থেকে লোক আসা শুরু করত। তাঁদের টি-শার্ট আর প্যান্ট পরিয়ে লাইনে দাঁড় করিয়ে রাখা হতো। যাঁকে পছন্দ হতো তাঁকেই তারা নিয়ে যেত।
এই নারী জানান, সিরিয়ায় তিনি যে প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন, তার ব্যবস্থাপক একজন বাংলাদেশি। নাম মাহবুব। ওই অফিস থেকেই দালালদের মাধ্যমে নারীদের বেচাকেনা করা হতো। ওই অফিসে বাংলাদেশি নারীদের পাশাপাশি নেপালি, ইন্দোনেশিয়ান ও পাকিস্তানি নারীরাও ছিলেন।
ওই নারী বলেন, দুই মাস পরে ওই অফিস থেকে হামা শহরে এক বাসায় কাজ করতে পাঠানো হয় তাঁকে। সেখানে বাড়ির পুরুষেরা তাঁর ওপর যৌন নির্যাতনের পাশাপাশি মারধরও করত। প্রতিবাদ করলে বলা হয়, তাঁকে কিনে আনা হয়েছে। তিনি বলেন, একপর্যায়ে তিনি প্রচণ্ড অসুস্থ হয়ে পড়েন। তিনি দেশে মাকে ফোন করেন। পরে তাঁকে দেশে ফেরত পাঠানো হয়। তাঁর হাত-পায়ে এখনো রয়েছে ক্ষতচিহ্ন আর পেটানোর দাগ।
সোনারগাঁয়ের আরেক নারী বলেন, তাঁকেও সিরিয়ায় প্রথমে একটি অফিসে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে তিন দিন পর পাঠানো হয় একটি শহরে। তিনি বলেন, ‘আমি যেখানে থাকতাম, সেখানে শুধু গুলির আওয়াজ শোনা যেত। মনে হতো আশপাশে যুদ্ধ চলছে। বাসার কাজ ছাড়াও আমাকে আরও অনেক কাজ করানো হতো।’ তাঁর অভিযোগ, ঘুমাতে দিত দুই ঘণ্টা। কোনো খাওয়া দিত না। বেতন চাইলে বলত, তোরে তিন লাখ টাকা দিয়ে কিনে আনছি, টাকা না দিয়ে যেতে পারবি না।
লেবাননে পাঠানোর নাম করে সিরিয়ায় পাঠানো হয় বরগুনার এক নারীকে। তিনি বলেন, দালাল তাঁর কাছ থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা নিয়েছে। সিরিয়ায় নিয়ে তাঁকে প্রথমে একটি ঘরে আটকে রাখা হয়। পরে স্থানীয় দালালেরা তাঁকে বিক্রির উদ্দেশ্যে খদ্দের খুঁজতে থাকে। সিরিয়ার একজন মালিকের কাছে বিক্রির পর থেকে তাঁর ওপর শারীরিক ও যৌন নির্যাতন চালানো হতো।
যেভাবে ফিরে এলেন: সোনারগাঁয়ের ওই নারী বলেন, একবার বেতন চাওয়ায় তাঁকে ওপর থেকে ফেলে দেওয়া হয়। তখন তাঁর হাত-পা ও কয়েকটা দাঁত ভেঙে যায়। হাসপাতালে এক মাস রেখে তাঁর চিকিৎসা করানো হয়। পরে আবার সেই আল বাগদাদের অফিসে পাঠানো হলে তিনি আরেকজন নারীর সহায়তায় দেশে স্বামীর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরে তাঁর স্বামী চাপ দেওয়ায় দালালেরাই তাঁকে ফেরত আনেন। আরেক নারী বলেন, প্রচণ্ড যৌন ও শারীরিক নির্যাতনের কারণে তিনি চলাফেরা করতে পারছিলেন না। তার পা ও পেট ফুলে গিয়েছিল। তিনি নেপালি এক নারীর সহায়তায় বাংলাদেশে তাঁর মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তাঁর মা দালালকে ধরে তাঁকে ফেরত আনাতে বাধ্য করেন।
বরগুনা থেকে পাচার হওয়া এক নারী জানান, তাঁর এক আত্মীয় সৌদি আরব থেকে ৫০ হাজার টাকা সিরিয়ার দালালদের কাছে পাঠিয়ে তাঁকে দেশে ফেরত আনেন।
সরকারের উদ্যোগ: সিরিয়ায় পাচার হওয়া বাংলাদেশি নারীদের দেশে ফিরিয়ে আনার যথাযথ উদ্যোগ নিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম বলেছেন, বিষয়টি অত্যন্ত ভয়াবহ। যদি এমন হয়ে থাকে, তাঁরা অবশ্যই পাচার হয়ে যাওয়া এসব নারীকে ফেরত আনার উদ্যোগ নেবেন। র্যাব-৩ (টিকাটুলী) থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়, তারা এ বিষয়ে পল্টন থানায় মামলা করেছে। এ বিষয়ে অনুসন্ধান করে তারা জানতে পেরেছে, ৪৩ জন নারী কর্মীকে লেবাননের কথা বলে সিরিয়ায় পাচার করা হয়েছে। এঁদের শারীরিক, মানসিক, যৌন কাজে; কাউকে আবার কায়িক শ্রমে নিয়োজিত করা হয়েছে। মানব পাচার রোধে এঁদের ফিরিয়ে আনতে স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছে তারা। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানোর বিষয়টি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব জ্যোতির্ময় দত্ত নিশ্চিত করেছেন। তবে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম জানান, তাঁরা এখনো এমন কোনো চিঠি পাননি।
সিরিয়ায় পাচারের সঙ্গে যারা জড়িত: বাংলাদেশের কিছু রিক্রুটিং এজেন্সি আন্তর্জাতিক চক্রের সঙ্গে মিলে নারী পাচার করছে। পাচার হওয়া নারীদের মধ্যে একজন দাবি করেন, তিনি একটি এজেন্সির মালিককে ৫০ হাজার টাকা দিয়েছেন। র্যাব অভিযোগের তদন্ত করছে। র্যাব জানিয়েছে, তারা আল রাবেতা ইন্টারন্যাশনাল, আল হাসিব ইন্টারন্যাশনাল, সিকদার ট্রাভেলস, বাংলাদেশ এক্সপার্ট করপোরেশন, হাসান ইন্টারন্যাশনাল ও নামিরা ওভারসিজের নামে অভিযোগ পেয়েছে।
র্যাব-৩-এর অধিনায়ক খন্দকার গোলাম সারোয়ার এ বিষয়ে প্রথম আলোকে বলেন, সিরিয়ায় পাচার হওয়া নারীদের সবার ওপর নানা ধরনের শরীরিক অত্যাচার করা হয়েছে। এর আলামত তাঁরা পেয়েছেন। তিনি বলেন, পাচারের সঙ্গে জড়িত কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছেন।
এ বিষয়ে কথা বলতে আল রাবেতা ইন্টারন্যাশনালের ম্যানেজিং পার্টনার আবুল বাসারের সঙ্গে তাঁর ফকিরাপুল কার্যালয়ে গিয়ে যোগাযোগ করা হয়। তিনি সব অস্বীকার করে বলেন, দালাল সিরাজ শিকদার তাঁদের কেউ নন। উনি তাঁদের নাম ব্যবহার করেছেন। এ ছাড়া সিরিয়ার সঙ্গে তাঁদের সমঝোতা স্মারক নেই। তিনি বলেন, ‘কোনো এজেন্সি সিরিয়ায় লোক পাঠায়নি, বরং লেবাননে পাঠিয়েছে। সেখানে লোক পাঠাব কেন?’ তিনি আরও বলেন, মানব পাচারের অভিযোগে মামলা দিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাঁদের হয়রানি করছে।
বাংলাদেশ এক্সপার্ট করপোরেশনের ম্যানেজিং পার্টনার মোহাম্মদ হাসান গত মঙ্গলবার রাতে প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা লেবানন পর্যন্ত এসব নারীকে ইমিগ্রেশন করেছি, তারপর তারা কীভাবে সিরিয়ায় গেল আমার ঠিক জানা নেই। তবে তারা সিরিয়ায় গিয়েছে এবং ফিরে এসেছে এটা সত্য। আমরা যতটুকু তথ্য পেয়েছি, সিরাজ সিকদার ও কোহিনুর আলম দুজন দালাল মিলে এসব করেছেন।’
আল হাসিব ইন্টারন্যাশনালের ১১ পুরানা পল্টন কার্যালয়ে গত শনি ও রোববার গিয়ে মালিক জসিম আহমেদকে পাওয়া যায়নি। গত মঙ্গলবার রাতে বাসায় ফোন করা হলে তাঁর স্ত্রী জানান, তিনি বাইরে গেছেন, পরে পাওয়া যাবে। তবে র্যাব জানিয়েছে, তাঁকে আটক করা হয়েছিল, তিনি বর্তমানে জামিনে আছেন।
সিকদার ট্রাভেলসের মালিক সিরাজ সিকদার ও তাঁর ছেলেরা আটক থাকায় তাঁদের মন্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
এ ব্যাপারে লেবানন ও জর্ডানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের মুঠোফোনে দুই দিন ধরে যোগাযোগের চেষ্টা করে তাঁদের পাওয়া যায়নি।