নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন : পাঁচ অভিযোগের সত্যতা পায়নি তদন্ত কমিটি

759

রোজিনা ইসলাম | অক্টোবর ০৬, ২০১৫

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের স্থানীয় সাংসদ শামীম ওসমানের করা সাতটি অভিযোগের মধ্যে পাঁচটির বিষয়ে সত্যতা পায়নি সরকারের গঠিত তদন্ত কমিটি। বাকি দুটি অভিযোগ অধিকতর তদন্তের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) পাঠানো হয়েছে।
তদন্ত কমিটির প্রধান স্থানীয় সরকার বিভাগের অতিরিক্ত সচিব অশোক মাধব রায় প্রথম আলোকে বলেন, তদন্তে আর্থিক দুর্নীতি বা অনিয়মের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বাকি দুটি অভিযোগের ক্ষেত্রে সিটি করপোরেশনের কিছুটা অবহেলা দেখা গেছে। তাহলে অধিকতর তদন্তের জন্য প্রতিবেদনটি কেন দুদকে পাঠানো হলো—এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত কিছু অভিযোগ আছে, এ কারণে অধিকতর তদন্ত করতে দুদকে পাঠানো হয়েছে।
স্থানীয় সরকার বিভাগের সূত্র বলেছে, সাংসদ শামীম ওসমান গত ৪ মার্চ আধা সরকারি পত্রে স্থানীয় সরকার বিভাগে অভিযোগ করেন, দশম জাতীয় সংসদের পঞ্চম অধিবেশনে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে ভুল ও অসত্য তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে। এই অভিযোগ তদন্ত করতে স্থানীয় সরকার বিভাগের অতিরিক্ত সচিব অশোক মাধব রায়কে প্রধান করে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি প্রতিবেদনে বলেছে, সরেজমিনে নথিপত্র পর্যালোচনা, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তাদের বক্তব্য, যেসব জমি ও নির্মাণ নিয়ে আপত্তি তোলা হয়েছে, সেগুলো পরিদর্শন করে প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। ভুল নয়, সিটি করপোরেশন থেকে দেওয়া তথ্য অসম্পূর্ণ ও ত্রুটিপূর্ণ ছিল।
যে দুটি অভিযোগ অধিকতর তদন্তের জন্য দুদকে পাঠানো হয়েছে এর একটি হলো, প্রকৃত মূল্যের চেয়ে কম মূল্যে অসচ্ছল ব্যক্তি হিসেবে এ কে এম আবু সাঈদকে মেয়রের নিজস্ব সংরক্ষিত কোটায় দোকান বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এবং ওই ব্যক্তির স্ত্রীর নামে দরপত্রের মাধ্যমে ওই একই বিপণিবিতানে দুটি দোকান বরাদ্দ করা হয়েছে।
এই অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত কমিটি বলেছে, এ কে এম আবু সাঈদ ও তাঁর পরিবারের সদস্যের নামে একাধিক দোকান বরাদ্দ বা স্থানান্তর হয়েছে। তবে এই বরাদ্দের ক্ষেত্রে অসচ্ছল কোটা বিবেচনা করা হয়নি। শিক্ষা ক্ষেত্রে অবদান রাখায় সাঈদকে দুই লাখ টাকায় দোকান বরাদ্দ দেওয়া হয়। দুটি দোকান ফারজানা রহমান ও শাহনাজ বেগম নামের দুজনকে বরাদ্দ দেওয়া হয়। পরে সাঈদের স্ত্রী আয়শা খানমের নামে এগুলোর স্থানান্তর ও নামজারি করা হয়।
দুদকে পাঠানো অপর অভিযোগটিতে বলা হয়, পার্ক নির্মাণের জন্য চুক্তিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান জুলফিয়া ইন্টারন্যাশনালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং পরিচালকেরা মেয়রের আত্মীয় ও সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারী বা পরিবারের সদস্য। এর মধ্যে রেজাউল ইসলাম রনি মেয়রের মামাতো ভাই। লিজা আক্তারের স্বামী আগে নারায়ণগঞ্জ পৌরসভায়, বর্তমানে আড়াইহাজার পৌরসভায় কর্মরত। কানিজ ফাতেমা শিল্পী বর্তমানে ঢাকায় সিটি করপোরেশনে কর্মরত।
তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পার্ক নির্মাণের সঙ্গে তৎকালীন নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের স্ত্রীরা স্বামীর পরিচয় গোপন করে জুলফিয়া ইন্টারন্যাশনালের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। তবে রেজাউল ইসলাম রনি মেয়রের মামাতো ভাই হলেও তাঁর প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করতে আইনগত কোনো বাধা নেই।
অভিযোগে আরও বলা হয়, তৎকালীন নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার অন্তর্গত পঞ্চবটীর সাত একর জমিতে পার্ক নির্মাণের অনুমোদন দেওয়া হলেও জুলফিয়া ইন্টারন্যাশনালের সঙ্গে মূলত ৬ দশমিক ২০ একর জমিতে পার্ক নির্মাণের বিষয়ে চুক্তি হয়। তবে সংসদে দেওয়া প্রশ্নের জবাবে জমির পরিমাণ দেখানো হয়েছে সাত একর। যে জায়গা বেশি দেখানো হয়েছে, এর বাজারমূল্য চার কোটি টাকা। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী ২৪ মাসের মধ্যে পার্ক জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করার কথা। প্রায় চার বছর অতিবাহিত হতে চললেও এখনো পার্কে অবকাঠামোগত ভিত্তি স্থাপন করা হয়নি। সিটি করপোরেশন রহস্যজনক কারণে কোনো কার্যকর ভূমিকা পালন করছে না।
এই অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, স্থানীয় সরকার বিভাগের অনুমোদন এবং সিটি করপোরেশনের সঙ্গে চুক্তি বহির্ভূত কোনো ভূমিতে পার্ক নির্মাণের অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। স্থানীয় সরকার বিভাগের অনুমোদন করা সাত একর জমির মধ্যে সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষের পার্কের অনুকূলে বরাদ্দ করা ৬ দশমিক ২০ একরের অতিরিক্ত শূন্য দশমিক ৮০ একর জমি করপোরেশনের দখলেই রয়েছে। নির্মাণকাজ সম্পন্ন করতে সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে একাধিকবার চিঠি দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, পার্ক নির্মাণের ক্ষেত্রে পুকুর বা খালের শ্রেণি পরিবর্তন না করার শর্ত থাকলেও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বিশাল জলাশয় ভরাট করে শর্ত ভঙ্গ করেছে। তবে তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পুকুর বা খালের শ্রেণি পরিবর্তন করে বিশাল জলাশয় ভরাটের অভিযোগের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
সিটি করপোরেশনের দোকান-ফ্ল্যাট বরাদ্দের নামে ‘হরিলুট’ চালানোর অভিযোগ করা হলেও তদন্ত কমিটি বলেছে, বরাদ্দ-প্রক্রিয়ায় কোনো ত্রুটি বা অনিয়ম পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া বরাদ্দ গ্রহীতাদের বিষয়ে সুনির্দিষ্টভাবে অভিযোগ না থাকায় তা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী বলেন, ‘সিটি করপোরেশন থেকে দেওয়া তথ্য অসম্পূর্ণ ছিল। কারণ, তিন ঘণ্টার মধ্যে তথ্য পাঠাতে বলা হয়েছিল। সে সময় আমিও দেশে ছিলাম না। ফ্যাক্সযোগে পাঠানো হয়েছিল, তাই কিছুটা ঘাটতি ছিল।’ তিনি বলেন, অসচ্ছল বলে কোনো কোটা নেই। এ কে এম আবু সাঈদকে মেয়রের কোটায় শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হিসেবে দোকান বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বাকিগুলো তাঁর পরিবার অন্যদের কাছ থেকে কিনেছেন। আর কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী যদি কোনো অনিয়ম করে থাকেন, তাঁর বিরুদ্ধে সরকারি বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মেয়র আইভী বলেন, ‘এই তদন্ত এবং তদন্ত প্রতিবেদনকে কেন্দ্র করে আমাকে হেয় করার জন্য যেভাবে দুর্নীতিবাজ আখ্যা দেওয়া হচ্ছে, মানববন্ধন, মিটিং-মিছিল করে আমাকে হেয় করে বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে, “দুদকের মঞ্চ” তৈরি করে আমাকে প্রতীকী ফাঁসি দেওয়া হচ্ছে, আমি এর বিচার চাই।’ তিনি বলেন, ‘স্থানীয় সরকার বিভাগের উচিত এই তদন্ত প্রতিবেদন জনগণের কাছে প্রকাশ করা। একটি টাকার দুর্নীতির প্রমাণ আমার বিরুদ্ধে পাবে না, আমি চ্যালেঞ্জ দিয়ে রাখলাম।’