বরিশালের চাঁপা হত্যা : আসামির সাজা মাফের আবেদন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে

604

রোজিনা ইসলাম | আগস্ট ২৯, ২০১৫

বরিশালের ফৌজিয়া রহমান ওরফে চাঁপা হত্যা মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি জহিরুল আলম কামালের সাজা মাফ চেয়ে করা আবেদন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। আইন মন্ত্রণালয়ের মতামতসহ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আবেদনটি সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠিয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র বলেছে, আইন মন্ত্রণালয় জহিরুল আলমের স্ত্রীর করা এই আবেদনে সুপারিশ করেছে। প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন পেলে এ প্রস্তাব যাবে রাষ্ট্রপতির কাছে।
১৯৮৯ সালের ১৮ অক্টোবর চাঁপাকে রড দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এ হত্যার বিচারের দাবিতে সে সময় বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, বরিশাল সাংস্কৃতিক সংগঠন সমন্বয় পরিষদসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন রাস্তায় নেমেছিল। কারাদণ্ডপ্রাপ্ত জহিরুল আলম চাঁপার দেবর। ২২ বছর পলাতক থাকার পর ২০১১ সালে তিনি আত্মসমর্পণ করেন। তিনি ছিলেন বরিশালের রেফকো ল্যাবরেটরিজের পরিচালক। তিনি এখন বরিশাল কারাগারের কয়েদি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল প্রথম আলোকে বলেন, আইন মন্ত্রণালয়ের মতামতের ভিত্তিতে সাজা কমানোর প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানো হয়েছে। সংবিধানের ৪৯ অনুচ্ছেদ অনুসারে রাষ্ট্রপতি সদয় ইচ্ছা পোষণ করলে তাঁর ওপর আরোপিত দণ্ডের মেয়াদ কমিয়ে অবশিষ্ট সাজা মাফ করতে পারেন।
মামলার সংক্ষিপ্ত বিবরণ অনুযায়ী, বরিশাল ব্রজমোহন কলেজের ছাত্রী ও গৃহবধূ চাঁপা হত্যার ঘটনায় কোতোয়ালি থানায় মামলা হয়। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) মামলাটির পুনঃতদন্ত করে ১৯৯০ সালের ২৪ মে জহিরুল আলমকে আসামি করে অভিযোগপত্র দেয়। ১৯৯৪ সালের ২৩ জানুয়ারি বিচারিক আদালত এ মামলার রায়ে চাঁপা হত্যার দায়ে জহিরুলকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ দেন। তিনি আপিল করলে হাইকোর্ট তাঁকে বেকসুর খালাস দেন। এর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল করলে আপিল বিভাগ আসামিকে ৩০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও ১০ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও ছয় মাসের কারাদণ্ড দেন।
কারা অধিদপ্তরের বিবরণীতে দেখা যায়, কয়েদি জহিরুলের বয়স ৪৬ বছর। তাঁর সম্ভাব্য মুক্তির তারিখ ২০৩৭ সালের ১১ অক্টোবর।
জহিরুলের অবশিষ্ট সাজা মওকুফের জন্য তাঁর স্ত্রী জেসমিন জাহান রাষ্ট্রপতি বরাবর আবেদন করেন। আবেদনে বলা হয়, জহিরুল হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটে ভর্তি আছেন। এর আগে সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে করোনারি এনজিওপ্লাস্টির মাধ্যমে তিন পর্যায়ে তাঁকে আটটি রিং পরানো হয়। ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হাসপাতালের এনজিওগ্রাম রিপোর্ট অনুযায়ী তাঁর হৃৎপিণ্ডে আরও চারটি ব্লক দেখা দিয়েছে। সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালের সঙ্গে যোগাযোগ করলে সেখানে তাঁর প্রয়োজনীয় এনজিওপ্লাস্টি বা বাইপাস সার্জারি করা সম্ভব বলে জানানো হয়েছে।
এই আবেদনের বিষয়ে আইন মন্ত্রণালয়ের মতামতে বলা হয়েছে, জেসমিন জাহানের আবেদনের বক্তব্য কয়েদির মেডিকেল রিপোর্ট, চিকিৎসা প্রত্যয়নপত্র ও প্যাথলজির রিপোর্ট দ্বারা সমর্থিত হয়েছে। পর্যালোচনায় দেখা যায়, জহিরুল আলম জটিল হৃদ্রোগে ভুগছেন এবং তাঁর বর্তমান শারীরিক অবস্থায় বাংলাদেশে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা গ্রহণের সুযোগ নেই। রাষ্ট্রপতি সদয় ইচ্ছা পোষণ করলে তাঁর ওপর আরোপিত দণ্ডের মেয়াদ কমিয়ে অবশিষ্ট সাজা (কারাদণ্ড ও জরিমানা) মওকুফ করতে পারেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা মতামত পাঠিয়েছি, এটুকু মনে আছে।’
আবেদনের বিষয়টি জানানো হলে চাঁপার মা ঝর্ণা বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি মেয়ের খুনির শাস্তি চাই। মেয়ের মৃত্যুর পর মেয়েজামাইও মারা গেছে। আমরা জানি না কীভাবে মারা গেছে।’ তিনি অভিযোগ করেন, ‘প্রথম থেকেই মেয়ের শ্বশুরবাড়ির লোকজন এ মামলা ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল। তারা খুব প্রভাবশালী, অনেক টাকাপয়সা।’
বরিশাল মহিলা পরিষদের সভাপতি রাবেয়া খাতুন বলেন, খুনির সাজা মওকুফ হলে আবার আন্দোলন হবে।