ব্রাজিলের গম নিম্নমানের

745

রোজিনা ইসলাম ও ইফতেখার মাহমুদ |

Brisal thumbnail

ব্রাজিল থেকে আমদানি করা গম নিম্নমানের। বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের (বিসিএসআইআর) খাদ্যবিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের পরীক্ষায় এ ফল পাওয়া গেছে।
সায়েন্স ল্যাবরেটরি হিসেবে পরিচিত ওই সংস্থাটির পরীক্ষায় দেখা গেছে, আমদানি করা ওই গমে কুঁচকানো ও ভাঙা দানার পরিমাণ সরকার নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে বেশি। আর ভাঙা দানার পরিমাণ কয়েক গুণ বেশি। দেশের ১৪টি খাদ্যগুদামের গমের নমুনা পরীক্ষা করে এই ফলাফল পেয়েছে সরকারি সংস্থাটি। খাদ্য মন্ত্রণালয় গমের মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর ২৫ জুন এসব নমুনা পরীক্ষা করার জন্য খাদ্যবিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ইনস্টিটিউটে পাঠায়। গতকাল রোববার তারা খাদ্য মন্ত্রণালয়ে এ পরীক্ষার ফলাফল জমা দেয়।
তবে এই গম খাওয়ার যোগ্য কি না বা এর মধ্যে কোনো বিষাক্ত পদার্থ আছে কি না, সেই পরীক্ষা করা হয়নি। বিসিএসআইআরের পরীক্ষাগারে এই পরীক্ষার সুবিধা থাকলেও সেখানে তা করা হয়নি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে খাদ্যবিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের পরিচালক মো. জহিরুল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিষাক্ত রাসায়নিক বা পদার্থ আছে কি না, সেই পরীক্ষা আমাদের করতে বলা হয়নি। যে আটটি সূচক বা বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে পরীক্ষা করতে বলা হয়েছে, তা থেকে দেখা গেছে, কিছু বৈশিষ্ট্য ভালো। কিছু নির্ধারিত মানের চেয়ে খারাপ।’
এ বিষয়ে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে গতকাল রাত পৌনে ১২টায় খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, এ গম ব্রাজিল থেকে চার মাস আগে আমদানি করা হয়েছিল। আমদানির সময় ওই গম পরীক্ষা করে দেখা গেছে, তার মান যথার্থ ছিল। চার মাস পরে খাদ্যবিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের পরীক্ষাটি হওয়ায় এর ফলাফলে কিছুটা পার্থক্য হতে পারে। গমে ভাঙা দানার পরিমাণ বেশি থাকার কথা স্বীকার করে তিনি প্রথম আলোর কাছে দাবি করেন, ‘তবে এই গম খাওয়ার অযোগ্য বা পচা নয়।’
এদিকে খাদ্য অধিদপ্তর দেশের ৩০টি খাদ্যগুদাম থেকে গম সংগ্রহ করে নিজস্ব পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করেছে। তাদের পরীক্ষা অনুযায়ী জয়পুরহাট, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া, চুয়াডাঙ্গা, শেরপুর, পটুয়াখালী ও মাগুরা জেলার খাদ্যগুদামের গমে জীবন্ত পোকা ও কীটপতঙ্গের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এ পোকা ও কীটপতঙ্গ দূর করে তা বিতরণের সুপারিশ করেছে খাদ্য অধিদপ্তরের পরীক্ষাগার। আর বাকি ২৩টি জেলার খাদ্যগুদামের গমের মান সঠিক ছিল বলে তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ফয়েজ আহমদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘ওই গম যখন আমদানি করা হয়, তখন আমি খাদ্য বিভাগের মহাপরিচালকের দায়িত্বে ছিলাম না। তবে আমাদের নিয়ম অনুযায়ী আমদানি করা গম বন্দরে আসার পর প্রথমে জাহাজ থেকে নমুনা গ্রহণ করা হয়। নমুনা যাচাই করে আমদানির শর্ত পূরণ হলে তা গ্রহণ করা হয়। নইলে সরবরাহকারীর এলসির মূল্য পরিশোধ করা হয় না।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুজন খাদ্যবিশেষজ্ঞ গমের এই পরীক্ষার ফলাফল দেখে বলেছেন, এই গম এতটাই নিম্নমানের যে তা জাহাজ থেকে খালাস করার যোগ্য না। খাদ্য বিভাগের সঙ্গে আমদানিকারকের যে চুক্তি হয়েছিল এবং গমের যে মানের কথা তাতে বলা হয়েছিল, আমদানি করা গম তার চেয়ে নিম্নমানের। খাদ্য বিভাগের আমদানি নীতিমালা অনুযায়ী, ওই গম ফেরত দেওয়ার কথা।
গম আমদানির সময় খাদ্য বিভাগের তৎকালীন মহাপরিচালক সারওয়ার খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা তখন গমের যে নমুনা পরীক্ষা করেছি, তা নিম্নমান ছিল এটা সত্যি। তবে সরকারের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী, গমের যে সর্বনিম্ন বৈশিষ্ট্য থাকার কথা, ব্রাজিলের গম তার চেয়ে খারাপ পাওয়া যায়নি। ফলে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশেই ওই গম খালাসের অনুমতি দেওয়া হয়।’
তবে খাদ্য মন্ত্রণালয় থেকে গতকাল রোববার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সারা দেশ থেকে সংগ্রহ করা গমের নমুনা বিসিএসআইআরের গবেষণাগারে পরীক্ষা করে কোনো বিরূপ তথ্য পাওয়া যায়নি। খাদ্য অধিদপ্তর কখনোই পচা ও খাবার অনুপযোগী গম আমদানি করেনি বা করে না। পরীক্ষার ফল অনুযায়ী, ব্রাজিল থেকে আমদানি করা গম মানুষের খাবার উপযোগী।
নিরাপদ খাদ্য নিয়ে গবেষণা করেন—এমন দুজন অধ্যাপক প্রথম আলোকে বলেন, ব্রাজিল থেকে আমদানি করা গম অখাদ্য বা নিরাপদ কি না, সেই পরীক্ষাই এখন পর্যন্ত করা হয়নি। ওই পরীক্ষা ছাড়া এই গমকে নিরাপদ বলা যাবে না।
ইতিমধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের রেশনের জন্য পাওয়া এই গম ফেরত দিয়েছে। আমদানি হওয়া দেড় লাখ টন গমের মধ্যে এক লাখ টন সরকারের বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির মাধ্যমে মূলত গরিব মানুষকে দেওয়া হয়েছে। পুলিশের বিভিন্ন বিভাগীয় কার্যালয় থেকে ওই গম ফেরত দেওয়ার সময় পুলিশ সদর দপ্তরে লেখা চিঠিতে বলেছে, ওই গমের আটা দিয়ে রুটি খেলে পেট খারাপ ও পেটব্যথা হয়। আটা তিন-চার দিন রাখলে তাতে পোকা ধরে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপক ও নিরাপদ খাদ্যবিষয়ক গবেষক প্রথম আলোকে বলেন, ব্রাজিল থেকে আনা গম দেখে মনে হয়েছে, এতে ছত্রাক সৃষ্টি হয়েছে, যা ওই খাদ্যটিকে বিষাক্ত করে তুলতে পারে। ওই খাবার খেলে মারাত্মক ধরনের পেটের পীড়া ও ডায়রিয়া হতে পারে। কাজেই পরীক্ষা ছাড়া এই গম বিতরণ বন্ধ রাখা উচিত।
বিসিএসআইআরের পরীক্ষার ফলাফল: বিসিএসআইআরের পরীক্ষাগারে মোট আটটি বৈশিষ্ট্যের পরীক্ষা করা হয়। প্রতি ৭৫ কেজি গম ওজন করে তা আদর্শ মাপ অনুযায়ী পাওয়া যায়নি। ৭৫ কেজির স্থলে নড়াইলে ৭১ কেজি, দিনাজপুরে ৭১ দশমিক ৫২ কেজি, জয়পুরহাটে ৭১, ময়মনসিংহে ৭১ দশমিক ৮৪ কেজি, সাতক্ষীরায় ৭১ দশমিক ৬০ কেজি, কিশোরগঞ্জে ৭১ দশমিক ৪৪ কেজি পাওয়া গেছে। খাদ্য অধিদপ্তরের আমদানির শর্ত অনুযায়ী, ৭৫ কেজির বস্তার ওজন যদি ৭২ কেজির কম থাকে তাহলে তা বন্দর থেকে খালাস করা যাবে না, ফেরত দিতে হবে।
ক্রয় শর্ত অনুযায়ী গমের নষ্ট দানার পরিমাণ সর্বোচ্চ ৪ শতাংশ পর্যন্ত গ্রহণ করার কথা। এর মধ্যে দিনাজপুরে ৬ দশমিক ২৩ শতাংশ, খাগড়াছড়িতে ১০ শতাংশ, জয়পুরহাটে ১৬ দশমিক ৩৬ শতাংশ, জামালপুরে প্রায় ১২ শতাংশ এবং কিশোরগঞ্জে প্রায় ১৩ শতাংশ নষ্ট দানা পাওয়া গেছে। অন্যদিকে শুকনো বা কুঁচকানো ও ভাঙা দানার পরিমাণ সর্বনিম্ন থাকার কথা ৫ শতাংশ। কিন্তু বেশির ভাগ জেলার খাদ্যগুদামে ৮ থেকে ২১ শতাংশ পর্যন্ত শুকনো ও কুঁচকানো দানা পাওয়া গেছে। নিয়ম অনুযায়ী এ ধরনের দানার পরিমাণ ৮ শতাংশের বেশি হলেই তা গ্রহণ করা যাবে না।