কৃষক এখনো ধানের দর পাচ্ছেন না

631

এপ্রিলে বোরো ধান কাটা শুরু হওয়ার পর থেকে সেই একই চিত্র। দাম কমছে প্রতি সপ্তাহে। ন্যায্যমূল্য না পাওয়া হতাশ কৃষকের কষ্ট জাতীয় সংসদ থেকে শুরু করে সর্বত্র আলোচনা হচ্ছে। সরকার থেকে বলা হয়েছিল, মে মাসে সরকারি সংগ্রহ শুরু হলেই দাম বাড়বে। কিন্তু পরিস্থিতি এখনো আগের মতোই।
এরই মধ্যে বাজার দরের চেয়ে কম দামে ভারতীয় চাল আমদানি বেড়েছে। আর হাটে ধান নিয়ে এসে ফিরে গেছেন কৃষক। সরকার ১০ মে চাল আমদানির ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে। কিন্তু মে মাসে সরকারি ধান-চাল সংগ্রহ পুরোদমে শুরু করা যায়নি। চাল আমদানিও থেমে থাকেনি। ফলে ধানের দামের ওপর এর প্রভাব পড়েনি।
১০ লাখ টন চাল ও ১ লাখ টন ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে খাদ্য বিভাগ গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত মাত্র ২ লাখ ৩২ হাজার টন চাল সংগ্রহ করতে পেরেছে। খাদ্য বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে এখন পর্যন্ত চাল আমদানি হয়েছে ১৪ লাখ ৬০ হাজার মেট্রিক টন। আরও ১৬ লাখ টন চাল আমদানিপত্র খোলা হয়েছে।
এতে ধান-চালের দর প্রতি সপ্তাহেই কমছে। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের দৈনিক খাদ্যশস্য প্রতিবেদন অনুযায়ী, গেল সপ্তাহে চিকন ও মাঝারি মানের চালের দর দেড় শতাংশ কমেছে। আর মোটা চালের দর টানা দেড় মাস ধরে ক্রমাগত কমার পর এ সপ্তাহে স্থির হয়েছে।
ধানের দাম কমার প্রভাব নিয়ে বিভিন্ন সরকারি সংস্থা থেকেও একাধিক প্রতিবেদন ও চিঠি পাঠানো হয়েছে। পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি) দেশের ১৫টি জেলার ধানের মূল্য হ্রাসসংক্রান্ত একটি বিশেষ প্রতিবেদন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, সরকার ধানের যে সংগ্রহমূল্য ঘোষণা করেছে, বাজারে তার প্রায় অর্ধেক দামে ধান বিক্রি হচ্ছে। এ নিয়ে কৃষকের মাঝে হতাশা ও ক্ষোভ বিরাজ করছে। সরকারি ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, কৃষকের এই ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে বা উসকানি দিয়ে কোনো স্বার্থান্বেষী মহল যাতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাতে না পারে, সে জন্য সরকারকে সতর্ক থাকতে হবে।
এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলামের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি তা ধরেননি। কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরীর কাছে ধানের দামের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ধানের দাম নিয়ে কোনো বিশেষ সংস্থার প্রতিবেদন তার কাছে আসেনি। মতিয়া চৌধুরী বলেন, দেশে প্রতিদিন চালের চাহিদা প্রায় এক লাখ টন। যে ১৩ লাখ টন চাল আমদানি হয়েছে, তা মাত্র ১৩ দিনের চাহিদা পূরণ করবে। ফলে বাজারে তা তেমন কোনো প্রভাব ফেলবে না। বাজারে বর্তমানে প্রতি মণ ধান ৬৫০ টাকা করে বিক্রি হচ্ছে। গত এক মাসের টানা রোদ ধান শুকাতে সহায়তা করেছে। ফলে কৃষকের পক্ষে ওই ধান দীর্ঘদিন ধরে রেখে দাম বাড়লে বিক্রি করা সম্ভব হবে।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানিত অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ মাহবুব হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যেভাবে ধান-চালের সংগ্রহ করছে তাতে খাদ্য বিভাগের কিছু কর্মচারী ও চালকল মালিকেরা লাভবান হচ্ছেন। কেননা, তাঁরা বাজার থেকে অল্প দামে চাল কিনে বেশি দামে সরকারি গুদামে সরবরাহ করছেন। যদিও সরকারি গুদামগুলোতে এখন ধান সংগ্রহ করার মতো অবকাঠামো রয়েছে। তিনি আরও বলেন, সরকার যদি দ্রুত প্রতিটি গুদামের গেটে কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি ধান কেনা শুরু করে, তাহলে দাম বাড়বে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে দেশের প্রতিটি কৃষকের নামে ব্যাংক হিসাব খোলা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকার সরাসরি ওই ব্যাংক হিসাবে মূল্য পরিশোধ করলে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যও কমে আসে।
গত ২৭ মে দেওয়া প্রতিবেদনে কিশোরগঞ্জ জেলার চিত্র তুলে ধরে বলা হয়েছে, ‘ধানের বিক্রয়মূল্য আশানুরূপ না হওয়ার কারণে কৃষকদের মাঝে ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে।’ আর দিনাজপুরের প্রতিবেদনের বক্তব্য হচ্ছে, ‘সরকার নির্ধারিত মূল্যে (প্রতি মণ ৮৮০ টাকা) ধান বিক্রি করতে পারলে কৃষকদের অসন্তোষ প্রশমিত হতো।’ শূন্য শুল্কের সুযোগ নিয়ে গুটি কয়েক ব্যবসায়ী অল্প দামে ভারত থেকে চাল আমদানি করায় এবং সরকারি সংগ্রহ সঠিক সময়ে শুরু না হওয়ায় ধানের দাম কম বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
গোয়েন্দা প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়েছে, কৃষকের হাত থেকে ধান যায় স্থানীয় ব্যবসায়ীদের হাতে। তারপর যায় মোকামের ফড়িয়াদের হাতে। মোকামের ব্যবসায়ীদের হাত ঘুরে যায় চালকল মালিকের কাছে। সাধারণত ওই তিন হাত ঘুরেই চাল সরকারি গুদামে যায়। ফলে সরকার প্রতি মণ ধানের দাম ৮৮০ টাকা নির্ধারণ করলেও তা থেকে কৃষকেরা প্রায়ই বঞ্চিত হন। গত বছর কৃষক মোটা ধানের দর পেয়েছিলেন ৬৫০ টাকা। এবার তা ৫৫০ টাকার বেশি উঠছে না।
দেশের প্রধান ধান উৎপাদনকারী জেলা ময়মনসিংহ, দিনাজপুর, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, টাঙ্গাইল, নওগাঁ, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া, গাইবান্ধা, রংপুর, ঝিনাইদহ, সিলেট ও মৌলভীবাজার জেলার চিত্র প্রতিবেদনটিতে দেওয়া রয়েছে। প্রায় প্রতিটি জেলাতেই ধানের দর নিয়ে একই চিত্র দেখা গেছে। আরও বলা হয়েছে, প্রতিটি জেলার মিল মালিক ও ব্যবসায়ীরা একটি নির্দিষ্ট দামে ধান মজুত করে রেখেছেন।
প্রতিবেদনে পরিস্থিতি মোকাবিলায় কয়েকটি সুপারিশও করা হয়েছে। যেমন, সরকারের কাছে ধান বিক্রিতে বরাবরই মধ্যস্বত্বভোগীরা সুবিধা নিয়ে থাকে। এ পরিস্থিতিতে সরকার নির্ধারিত মূল্যে কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ধান কেনা হলে কৃষকেরা ধানের ন্যায্যমূল্য পেয়ে লাভবান হতে পারেন। এতে ক্ষোভ প্রশমিত হওয়া ছাড়াও কৃষকেরা ধান চাষে আগ্রহী হবেন। এ ছাড়া দ্রুত কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ধান-চাল সংগ্রহ করার কথাও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
এর আগে বিনিয়োগ বোর্ড থেকে খাদ্যসচিবের কাছে এ বিষয়ে একটি চিঠি দেওয়া হয়েছিল। বিনিয়োগ বোর্ডের চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিচালক মো. মাহবুব কবীর স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে আরও বলা হয়েছিল, সরকার চাল কেনে চাতাল ও মিল মালিকদের কাছ থেকে। ফলে খুব কম কৃষকই সরকারের কাছে ধান বিক্রির সুযোগ পান। এ বছর প্রতি মণ বোরো ধান উৎপাদন করতে কৃষকের খরচ হয়েছে ৬৫০ থেকে ৭০০ টাকা। আর বাজারে ওই ধান বিক্রি হচ্ছে ৪২০ থেকে ৪৫০ টাকায়। সরকার ধানের সংগ্রহ মূল্য নির্ধারণ করেছে ৮৮০ টাকায়। সেই হিসাবে প্রতি মণ ধান বেচে কৃষকের লোকসান ৩৫০ টাকা।
বিনিয়োগ বোর্ডের ওই চিঠিতে সরকারি সংগ্রহ অভিযানে গত বছরের অবিক্রীত পুরাতন ও আমদানি করা চাল খাদ্যগুদামগুলোতে সরবরাহ হতে পারে বলেও আশঙ্কা করা হয়েছে। বলা হয়েছে, এ বিষয়টিকে কঠোর নজরদারির মধ্যে রাখতে হবে, যাতে অসাধু ব্যবসায়ীরা পুরোনো অবিক্রীত এবং স্বল্প মূল্যে আমদানি করা চাল গছিয়ে দিতে না পারে।