খুনির সাজা মাফের আবেদনে আইন মন্ত্রণালয়ের সম্মতি

671

ফৌজিয়া রহমানবরিশালের আলোচিত ফৌজিয়া রহমান ওরফে চাঁপা হত্যা মামলার যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামি জহিরুল আলম কামালের সাজা মাফ করার জন্য আবেদন করা হয়েছে। আইন মন্ত্রণালয় তাতে সুপারিশও করেছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এখন এটি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে পাঠাবে। সেখান থেকে যাবে রাষ্ট্রপতির কাছে।
২২ বছর পলাতক থাকার পর ২০১১ সালে কামাল আত্মসমর্পণ করেন। ১৯৮৯ সালের ১৮ অক্টোবর চাঁপাকে লোহার রড দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। আসামি কামাল চাঁপার দেবর। তিনি এখন বরিশাল কারাগারে। কামাল বরিশালের রেফকো ল্যাবরেটরিজের পরিচালক ছিলেন।
বরিশাল ব্রজমোহন কলেজের ছাত্রী চাঁপা হত্যার ঘটনা ওই সময় সারা দেশে ব্যাপক আলোচিত হয়। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, বরিশাল সাংস্কৃতিক সংগঠন সমন্বয় পরিষদসহ সব রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন রাস্তায় নামে।
জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল প্রথম আলোকে বলেন, আইন মন্ত্রণালয়ের মতামত নিয়েই সাজা কমানোর প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানো হচ্ছে। সংবিধানের ৪৯ অনুচ্ছেদ অনুসারে রাষ্ট্রপতি সদয় ইচ্ছা পোষণ করলে তাঁর ওপর আরোপিত দণ্ডের মেয়াদ কমিয়ে অবশিষ্ট সাজা মাফ করতে পারেন।
তবে সাজা মাফের আবেদনে সুপারিশ করার বিষয়টি মনে করতে পারলেন না আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিষয়টি আমার মনে নেই, দেখে বলতে হবে।’
সাজা মাফের আবেদন-সংক্রান্ত নথিতে আইনমন্ত্রী, আইনসচিব ও যুগ্ম সচিব সই করেছেন বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে।
মামলার বিবরণে দেখা যায়, চাঁপাকে তাঁর দেবর কামাল, নাসির উদ্দিন জামাল ও ননদের স্বামী খন্দকার জিল্লুর বারী পরিবারের অন্যদের সহযোগিতায় হত্যা করেন। কোতোয়ালি থানায় মামলা হলে পুলিশ চাঁপার শোবারঘর থেকে রক্তমাখা লোহার পাইপ, বাড়ির ছাদে বালতিতে রক্তমাখা একটি লুঙ্গিসহ অন্যান্য আলামত জব্দ করে। তখনই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত সন্দেহে জহিরুল আলম কামাল, নাসির উদ্দিন জামাল, খন্দকার জিল্লুর বারীসহ বেশ কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়। পরে তাঁরা ছাড়াও পান।
ওই বছরের ১৬ নভেম্বর সিআইডি মামলাটির পুনঃ তদন্ত শুরু করে। ১৯৯০ সালের ২৭ মার্চ প্রথম এজাহারটিতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়ে দ্বিতীয় এজাহার দেয় সিআইডি। ওই বছরের ২৪ মে কাম ালকে আসামি করে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। ১৯৯৪ সালের ২৩ জানুয়ারি আদালত চাঁপা হত্যার দায়ে কামালকে যাবজ্জীবন সাজা দেন।
আসামি আপিল করলে হাইকোর্ট তাঁকে বেকসুর খালাস দেন। এই আদেশের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল করলে সুপ্রিম কোর্ট আসামিকে ৩০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও ১০ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও ছয় মাসের কারাদণ্ড দেন।
কারা অধিদপ্তরের বিবরণীতে দেখা যায়, কয়েদি কামালের বয়স ৪৬ বছর। তাঁর সম্ভাব্য মুক্তির তারিখ ২০৩৭ সালের ১১ অক্টোবর।
জহিরুল আলম কামালের অবশিষ্ট সাজা মওকুফের জন্য তাঁর স্ত্রী জেসমিন জাহান রাষ্ট্রপতির বরাবর আবেদন করেন। আবেদনে বলা হয়, কামাল হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটে ভর্তি আছেন। এর আগে সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে চিকিৎসা গ্রহণ করে করোনারি এনজিওপ্লাস্টির মাধ্যমে তিন পর্যায়ে তাঁকে আটটি রিং পরানো হয়। ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হাসপাতালে এনজিওগ্রাম রিপোর্ট অনুযায়ী তাঁর হৃৎপিণ্ডে আরও চারটি ব্লক দেখা দিয়েছে। সিঙ্গাপুরে মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালের সঙ্গে যোগাযোগ করলে সেখানে তাঁর প্রয়োজনীয় এনজিওপ্লাস্টি বা বাইপাস সার্জারি করা সম্ভব বলে জানানো হয়েছে।
আইন মন্ত্রণালয়ের মতামতে বলা হয়, জেসমিন জাহানের আবেদনের বক্তব্য কয়েদির মেডিকেল রিপোর্ট, চিকিৎসা প্রত্যয়নপত্র ও প্যাথলজির রিপোর্ট দ্বারা সমর্থিত হয়েছে। পর্যালোচনায় দেখা যায়, জহিরুল আলম জটিল হৃদ্রোগে ভুগছেন এবং তাঁর বর্তমান শারীরিক অবস্থায় বাংলাদেশে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা গ্রহণের সুযোগ নেই। রাষ্ট্রপতি সদয় ইচ্ছা পোষণ করলে তাঁর ওপর আরোপিত দণ্ডের মেয়াদ কমিয়ে অবশিষ্ট সাজা (কারাদণ্ড ও জরিমানা) মওকুফ করতে পারেন।
এই মতামতের বিষয়ে জানতে চাইলে হৃদ্রোগবিশেষজ্ঞ রাকিবুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, এর চেয়ে জটিল রোগের চিকিৎসা বাংলাদেশে হয়। এর জন্য বিদেশে যাওয়ার কোনো প্রয়োজন হয় না।
জানতে চাইলে চাঁপার মা ঝর্ণা বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমি মেয়ের খুনির ফাঁসি চাই। আমার মেয়ের মৃত্যুর পর আমার মেয়ের জামাইও মারা গেছে। আমরা জানি না কীভাবে মারা গেছে।’ তিনি অভিযোগ করেন, ‘প্রথম থেকেই আমার মেয়ের শ্বশুরবাড়ির লোকজন এ মামলা ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল। তারা খুব প্রভাবশালী, অনেক টাকাপয়সা। এবারও হয়তো তারা সফল হবে।’ আইনমন্ত্রীর বাবা সিরাজুল হক এ মামলায় আসামিপক্ষের আইনজীবী ছিলেন বলে জানিয়েছেন চাঁপার ভাই আমিন এহসান।
এদিকে কারা শাখা ও আইন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, একজন প্রভাবশালী মন্ত্রীর তদবিরে এই সাজা কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং সাজা মওকুফের প্রস্তাব রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানোর জন্য তাগাদা দেওয়া হচ্ছে।
বরিশাল মহিলা পরিষদের সভাপতি রাবেয়া খাতুন প্রথম আলোকে বলেন, একজন খুনিকে কোনোভাবেই রাষ্ট্রপতি ক্ষমা করতে পারেন না। আইন মন্ত্রণালয় একজন খুনির সাজা মওকুফের পক্ষে কীভাবে মতামত দিল, তা বোধগম্য হচ্ছে না। এই খুনির সাজা মওকুফ হলে আবারও আন্দোলন হবে।