মুক্তিযোদ্ধা ঘোষণা না দিয়েও সনদ: পাঁচ সচিবের পর আরও ১৬

679

চাকরিতে যোগ দেওয়ার সময় নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা ঘোষণা করেননি, অথচ মুক্তিযোদ্ধা সনদ নিয়েছেন। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সুবিধাও নিয়েছেন বা কেউ কেউ সুবিধা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছেন। প্রথম আলোর অনুসন্ধানে সচিবসহ এ রকম অন্তত ১৬ জন কর্মকর্তার নাম জানা গেছে। তাঁদের মধ্যে নয়জন বর্তমানে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আছেন।
নিয়ম হচ্ছে, কেউ মুক্তিযোদ্ধা হলে চাকরিতে যোগ দেওয়ার সময়ই তাঁকে ঘোষণা দিতে হবে। পরে বললে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গণ্য করা হবে না। এ জন্য সরকারি কর্মকমিশনের (পিএসসি) একটি নির্দিষ্ট ফরম পূরণ করতে হয়। কিন্তু জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এই ১৬ কর্মকর্তার কেউই নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা ঘোষণা না করলেও সনদ নিয়েছেন। কেউ কেউ এখন সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করছেন।
এর আগে পাঁচ সচিব একইভাবে সনদ নিয়ে বিতর্কিত হন। পরে তাঁদের মধ্যে চারজনের সনদ বাতিল করা হয়।
সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার এ বিষয়ে প্রথম আলোকে বলেন, বতর্মানে যাঁরা চাকরিরত, তাঁরা সবাই স্বাধীনতা-পরবর্তী প্রজন্ম। তাঁরা চাকরিতে প্রবেশকালে মুক্তিযোদ্ধা নন বলে লিখলেন কেন? কারও কারও যুক্তি, তাঁরা চাকরিতে যোগ দেওয়ার সময় মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি ক্ষমতায় ছিল না। মুক্তিযোদ্ধা লিখলে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কায় এমনটা করেছেন। কিন্তু এটা আদৌ গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা বলে ধরে নেওয়া যায় না। আসলে এখন বাড়তি সুবিধা নিতে অনেকেই মুক্তিযোদ্ধা সনদ সংগ্রহ করে তা ব্যবহারে তৎপর হয়েছেন।
জনপ্রশাসনের এই ১৬ শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা হলেন কৃষিসচিব এস এম নাজমুল ইসলাম, প্রবাসী ও কর্মসংস্থানসচিব খোন্দকার শওকত হোসেন, পরিকল্পনা বিভাগের সচিব ভূঁইয়া সফিকুল ইসলাম, প্রাথমিক ও গণশিক্ষাসচিব কাজী আখতার হোসেন, ওএসডি সচিব নুরুল হক, সাবেক সচিব ও বিটিআরসির চেয়ারম্যান সুনীল কান্তি বোস, রাজউকের চেয়ারম্যান জি এম জয়নাল আবেদীন ভূঁইয়া, ভিয়েতনামের রাষ্ট্রদূত সাহাব উল্লাহ, পিএসসির সদস্য মাইন উদ্দিন খন্দকার, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য সচিব শেখ মোহাম্মদ ওয়াহিদুজ্জামান, সদ্য অবসরে যাওয়া সচিব ফণীভূষণ চৌধুরী, সাবেক জনপ্রশাসনসচিব এ এস এম আলী কবীর, সাবেক মুক্তিযুদ্ধসচিব ফিরোজ কিবরিয়া, ট্যারিফ কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান এ কে এম আজিজুল হক, তথ্য মন্ত্রণালয়ের সাবেক অতিরিক্ত সচিব খলিলুর রহমান ও ক্যাডারবহির্ভূত সাবেক কর্মকর্তা মুহাম্মদ আবুল হোসাইন।
নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা ঘোষণা না করলেও এই কর্মকর্তাদের কেউ কেউ সনদ নিয়ে অতিরিক্ত এক বছর চাকরি করেছেন বা করছেন। কেউ কেউ অবসরে যাওয়ার এক বা দুই বছর আগে এ সুবিধা নিয়েছেন। তবে চাকরিতে যোগ দেওয়ার সময় নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা ঘোষণা করেছেন, এমন অনেক কর্মকর্তা এ সুবিধা ভোগ করছেন। তাঁদের নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই।
যোগাযোগ করা হলে মুক্তিযুদ্ধ-বিষয়কমন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেন, চাকরিতে যোগ দেওয়ার সময়ই কোনো সরকারি কর্মকর্তা নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা ঘোষণা না দিয়ে এখন যদি মুক্তিযোদ্ধা সনদ নেন বা সনদ দেখিয়ে এক বছর বাড়তি চাকরির সুবিধা নেন, সেটা প্রতারণার শামিল। হয় তাঁরা চাকরিতে যোগদানের সময় মিথ্যা তথ্য দিয়েছেন, নয়তো এখন মিথ্যা বলছেন—দুটোই অপরাধ। তিনি জানান, এ ধরনের সব সনদ খতিয়ে দেখা হবে। যাচাই-বাছাই করে ভুল তথ্য পাওয়া গেলে ২০১০, ২০১১ ও ২০১৪ সালে জারি করা প্রজ্ঞাপনের আলোকে সনদ বাতিল করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, মুক্তিযোদ্ধা সনদ নিয়ে চাকরির মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন করেছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব কাজী আখতার হোসেন। তাঁর কাছে মুক্তিযোদ্ধাসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় নথিপত্র চাইলে তিনি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে তা দেননি। পরে তিনি এ সুবিধা আর পাননি।
প্রবাসী ও কর্মসংস্থানসচিব খোন্দকার শওকত হোসেন বলেন, ‘আমরা ওই সময় সুপরিচিত মুক্তিযোদ্ধা ছিলাম। নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা ঘোষণার বা সনদ প্রমাণের প্রয়োজন পড়েনি।’ প্রসঙ্গত, এই সচিবের বিরুদ্ধে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার সনদ নেওয়ার অভিযোগ উঠলে দুর্নীতি দমন কমিশন অভিযোগের সত্যতা পায়নি। ফলে সনদ বাতিল হয়নি।
জানতে চাইলে কাজী আখতার হোসেন গত রোববার প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি যেহেতু নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা ঘোষণা দিইনি, তাই এই সুবিধা নেব না ভাবছি।’ তাঁর চাকরির মেয়াদ শেষ হবে আগামী বছরের ১৪ মার্চ।
বর্তমানে ওএসডি সচিব নুরুল হক গত ২৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ভূমি সংস্কার বোর্ডের চেয়ারম্যান ছিলেন। তাঁর নিয়মিত চাকরির মেয়াদ শেষ হয়েছে গত ৭ মার্চ। তিনি এখন মুক্তিযোদ্ধা সনদ নিয়ে অতিরিক্ত এক বছর চাকরি করছেন। চাকরিতে যোগ দেওয়ার সময় নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা ঘোষণা দেননি কেন, জানতে চাইলে তিনি বলেন, তখন এ রকম ঘোষণা দেওয়ার অনুকূল পরিস্থিতি ছিল না।
পরিকল্পনাসচিব ভূঁইয়া সফিকুল ইসলাম বলেন, ‘এটা ঠিক, আমি তখন নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা ঘোষণা দিইনি। আমার এলাকাবাসী জোর করে আমাকে সনদ নিতে বাধ্য করেছে। আমি এই সুবিধা নেব না।’
তাহলে কেন আবেদন করেছেন? জবাবে এই সচিব বলেন, ‘আমি এখনো আবেদন করেছি কি না, মনে নেই। ২০১৬ সাল পর্যন্ত আমার চাকরির মেয়াদ। এরপর ভেবে দেখব কী করা যায়।’
রাজউকের চেয়ারম্যান জয়নাল আবেদীন ভূঁইয়ার চাকরির মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০১৩ সালে। এরপর মুক্তিযোদ্ধা সনদ নিয়ে এ বছরের ৫ এপ্রিল পর্যন্ত চাকরি করেছেন। এখন আবার এক বছরের চুক্তিতে রাজউকের চেয়ারম্যান নিযুক্ত হয়েছেন। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, চাকরিতে যোগ দেওয়ার সময় নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা ঘোষণা দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেননি।
পিএসসির সদস্য মাইন উদ্দিন খন্দকার গত ১২ জানুয়ারি মুক্তিযোদ্ধা সনদ দেখিয়ে এক বছর বাড়তি চাকরি শেষ করেছেন। এরপর তাঁকে পাঁচ বছরের জন্য পিএসসির সদস্য নিয়োগ দেওয়া হয়। তিনি বলেন, ‘আমরা ন্যাপ, কমিউনিস্ট বা গেরিলা বাহিনীর সদস্য ছিলাম। পঁচাত্তর-পরবর্তী সময়ে নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ঘোষণার অনুকূল পরিবেশ ছিল না।’
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য সচিব শেখ মোহাম্মদ ওয়াহিদুজ্জামান বলেন, ‘আমি মুজিব বাহিনীর সদস্য ছিলাম। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর ১৯৭৬ সালে প্রথম বিসিএস পরীক্ষায় মুজিব বাহিনীর পরিচয় দিলে তখনকার প্রেক্ষাপটে চাকরি হওয়ার সুযোগ বা সম্ভাবনা ছিল না। তা ছাড়া আমি মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে নয়, মেধার ভিত্তিতে প্রশাসন ক্যাডারে যোগ দিই।’
ফণীভূষণ চৌধুরী পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয়ের সচিব ছিলেন। স্বাভাবিক মেয়াদ শেষে মুক্তিযোদ্ধা সুবিধা নিয়ে বাড়তি এক বছর চাকরি করে এখন অবসর ছুটিতে গেছেন। তিনি নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা ঘোষণা দেননি বলে জানান। কারণ, তিনি ভাবেননি যে এ ধরনের সুবিধা পাবেন। এখন এই সুবিধা দেওয়া হলে তিনি তা নিয়েছেন।
২০১০ সালের ৭ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারী সরকারি চাকরিতে প্রবেশের সময় নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন অথবা যাঁদের নাম মুক্তিবার্তা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল অথবা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে যাঁদের নাম গেজেটে প্রকাশিত হয়েছিল অথবা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে যাঁরা প্রধানমন্ত্রীর সই করা সনদ নিয়েছেন, তাঁরা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে বাড়তি এক বছর চাকরি করার সুযোগ পাবেন।
২০১১ সালের ৬ মার্চ একই ধরনের আরেকটি চিঠি জারি করা হয়। এর পরও মুক্তিযোদ্ধা সনদ নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হওয়ায় মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে দুটি আদেশ জারি করে। গত ৪ আগস্ট জারি করা আদেশে বলা হয়, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা চাকরিতে প্রবেশের সময় নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন এবং মুক্তিযোদ্ধা সনদ রয়েছে জানালে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সুবিধা পাবেন।
এরপর জনপ্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়ে জানান, এই প্রজ্ঞাপনের ফলে মুক্তিযোদ্ধারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। পরে মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় থেকে প্রধানমন্ত্রীর কাছে একটি চিঠি পাঠানো হয়। এতে বলা হয়, চাকরি গ্রহণকালে ও পরবর্তী সময়ে সুযোগ থাকা সত্ত্বেও যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারী মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে নিজেদের ঘোষণা দেননি বা মুক্তিযোদ্ধার কোটায় চাকরিতে প্রবেশের সুযোগ নেননি, তাঁদের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে বাড়তি সুবিধা দেওয়া হবে কি না, এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা প্রয়োজন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ১১ সেপ্টেম্বর নিজের হাতে ওই সারসংক্ষেপের ওপর লেখেন, ‘যাঁরা প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা তাঁরা যে অবস্থায়ই হোক, সুবিধা পাবেন।’ ওই সারসংক্ষেপের পরিপ্রেক্ষিতে মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় গত ১ অক্টোবর জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া নির্দেশনা উল্লেখ করে বলেছে, এ ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের জারি করা ২০১০ সালের ৭ নভেম্বর এবং ২০১১ সালের ৬ মার্চ জারি করা চিঠিতে মুক্তিযোদ্ধা গণকর্মচারীর নির্ণায়ক হিসেবে যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, তা অনুসরণ করতে হবে।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর মুক্তিযোদ্ধা কর্মচারীদের চাকরির বয়সসীমা প্রথমে দুই বছর ও পরে এক বছর বাড়িয়ে দেয়। এর পরই মুক্তিযোদ্ধা সনদ নেওয়ার হিড়িক পড়ে যায়।
গত ২২ জানুয়ারি ‘চাকরির শেষ সময়ে মুক্তিযোদ্ধা সনদ নেওয়ার হিড়িক’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন ছাপা হয় প্রথম আলোতে। চাকরির মেয়াদ বাড়াতে বা অন্যান্য সুযোগ নিতে বেআইনিভাবে পাঁচ সচিবের সনদ নেওয়ার কথা বলা হয়েছিল ওই প্রতিবেদনে। এরপর অনুসন্ধান শুরু করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তাঁরা সরকারি নির্দেশনা, পরিপত্র ও আইন অমান্য করে মুক্তিযোদ্ধা সনদ নিয়ে অসদাচরণ করেছেন বলে দুদক প্রতিবেদনে উল্লেখ করে। এরপর পাঁচ সচিবের মুক্তিযোদ্ধা সনদ বাতিল করা হয়।