অনুসন্ধানঃ খুঁড়তে খুঁড়তে গরম খবর

1027

Prothom Aloপাঁচমিশালি
রোজিনা ইসলাম | আপডেট: ০০:০৯, নভেম্বর ০৪, ২০১৪

.মন্ত্রণালয়ে এক সচিবের কক্ষের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। একান্ত সচিব বললেন, স্যার ভেতরেই আছেন। দরজা বন্ধ। ফোন দিলাম, প্রথমে ধরলেন না। একটু পরে ফোন ধরে বললেন, আমি বাইরে আছি, পরে আসেন। কোনো কথা না বাড়িয়ে দরজায় টোকা দিয়ে ভেতরে ঢুকলাম। আমাকে দেখে ভ্যাবাচেকা বনে গেলেন সচিব মহোদয়। চরম বিব্রত এই কর্তা পরে এক ঘণ্টা সময় দিলেন। আর বারবার দুঃখ প্রকাশ করলেন মিথ্যা বলার জন্য।
খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে এভাবে সময়ে-অসময়ে কত লোককে যে বিব্রত করতে হয়েছে তার হিসাব নেই। কেউ কেউ চরম ক্ষুব্ধ হয়েছেন, কেউ হননি। কেউ সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন, কেউ এড়িয়ে গেছেন। আমার কিন্তু এড়ানোর উপায় নেই। আমার চাই ভালো ভালো খবর, গরম খবর।
নারী সাংবাদিকদের কাজ পুরুষ সহকর্মীদের মতো অত মসৃণ নয়। পুরুষ সাংবাদিকেরা যেমন যখন যেখানে খুশি যেতে পারেন, নারীরা সেভাবে পারেন না। আমার জন্য সমাজে আছে অলিখিত এক ‘সূর্যাস্ত আইন’।
সমাজের এসব অলিখিত বেড়া ডিঙিয়ে অনেক দিন ধরেই কাজ করছি সচিবালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিটে। প্রতিদিন রাত পোহালেই শুরু হয় সরকারি দপ্তরের দ্বারে দ্বারে ঘোরা। কোথায় ভালো খবর আছে সেই আশায়।
এভাবে ঘুরতে ঘুরতে ২ জানুয়ারি পেলাম একটি মজার তথ্য। তথ্য না বলে সেটাকে তথ্যের সূত্রই বলা ভালো। এক কর্মকর্তা বললেন, অফিসার্স ক্লাবের নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন এমন কর্মকর্তাদের ব্যাপারে খোঁজ নিন। কী পাব খোঁজ নিলে? তিনি কোনো উত্তর দিলেন না। বললেন, আগে খোঁজ নিন। আরেক সূত্রে জানতে পারলাম, ওই নির্বাচন করছেন এমন একজন কর্মকর্তা, যিনি কিছুদিন আগে মুক্তিযুদ্ধ সনদ নিয়েছেন। এর গেজেটও হয়েছে। আমার মনে হলো, ঘটনাটি বড় হতে পারে। একটি ভালো খবরের আশায় শুরু হলো উত্তেজনা।
রাতে ভালো ঘুম হলো না। পরদিন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত তথ্য নিয়ে দেখলাম এ সচিব চাকরিতে যোগ দেওয়ার সময় মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ঘোষণা দেননি। কিন্তু তিনি নিয়েছেন মুক্তিযোদ্ধা সনদ। ভাবলাম, ৩০ থেকে ৩৫ বছর চাকরি করার পর যখন অবসর নেওয়ার পালা, তখন কেন সনদ নেবেন, কী লাভ?
পরে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারাই বললেন, মুক্তিযোদ্ধা সনদ আর এই দেখাতে পারলেই আরও এক বছর বেশি চাকরি করা যায়। এই সুযোগ কাজে লাগাতে মুক্তিযোদ্ধা সনদ সংগ্রহ করেছেন কেউ কেউ।
অফিসে এসে হেড অব রিপোর্টিং শওকত হোসেন ভাইকে জানালাম। তিনি বললেন, আরও খোঁজ নেন। প্রধান বার্তা সম্পাদক লাজ্জাত এনাব মহছি ও বার্তা সম্পাদক শাহেদ মুহাম্মদ আলী সাবধান করে দিয়ে বললেন, শতভাগ নিশ্চিত হয়ে প্রতিবেদন করতে হবে।
এর পর থেকে শুরু হলো কাজ। খোঁজখবর করতে করতে ১৫ দিন চলে গেল। তত দিনে নতুন সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। আমার কিন্তু খোঁজ নেওয়া শেষ হচ্ছে না। প্রথমে এক সচিবের কাছে গিয়ে তাঁর ব্যাপারে জানতে চাইলাম। তিনি বললেন, আমি একা নিয়েছি? আরও আছে। তিনি বললেন আরেকজনের নাম। পরের জন বললেন আরেকজনের নাম। এভাবে বাড়তে থাকল নামের তালিকা। একসময় দেখি অবৈধভাবে চাকরির মেয়াদ বাড়ানোর লোভে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদ নিয়েছেন চারজন সচিব, একজন যুগ্ম সচিব ও একজন সাবেক সচিব। জানতে পারলাম, গত কয়েক মাসে বেশ কয়েকজন সচিবের নাম অন্তর্ভুক্ত করে মুক্তিযোদ্ধা গেজেট প্রকাশিত হয়েছে। সনদ নিয়েছেন চিকিৎসক, শিক্ষক, প্রকৌশলী, ব্যাংকারসহ বিভিন্ন শ্রেণির সরকারি কর্মকর্তারাও।
সব কাজ শেষে প্রতিবেদন জমা দিলাম। এরপর শুরু হলো যাচাই-বাচাই। অফিস সিদ্ধান্ত নিল ১৭ জানুয়ারি প্রতিবেদনটি ছাপাবে। কিন্তু যে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এই খবরটি, সেই নির্বাচনও ছিল ১৭ জানুয়ারিতে। প্রধান বার্তা সম্পাদক লাজ্জাত ভাই বললেন, নির্বাচনের সময় এটি দেওয়া যাবে না। তাহলে মনে করবে আমরা কারও পক্ষ নিয়েছি। কেটে গেল আরও চার দিন। ২২ জানুয়ারি ছাপা হলো সেই খবর। যেদিন প্রেসে গেল, সারা রাত ঘুমোতে পারিনি। মুঠোফোনের শব্দ কমানো ছিল। সকালে দেখি ২৬টি মিসড কল আর অনেক খুদে বার্তা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্দেশ দিলেন ভুয়া সনদধারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে। দুর্নীতি দমন কমিশনও (দুদক) তদন্ত করে সত্যতা পেল। বাতিল হলো অনেকের সনদ। এখনো তা হচ্ছে।
পাঠক হয়তো এতক্ষণে ধরে নিয়েছেন যে এ গল্পটি এখানেই শেষ হলো। কিন্তু তা আর হলো না। কেঁচো খঁুড়তে যেমন সাপ বেরিয়ে আসে, সেভাবেই বেরিয়ে এল আরেক খবর। বিদেশি বন্ধুদের মুক্তিযুদ্ধের সম্মাননা ক্রেস্টের স্বর্ণ জালিয়াতির খবর।
মুক্তিযুদ্ধ সনদ নিয়ে কাজ করতে গিয়ে পেলাম সেই খবর। জানতে পারি ক্রেস্টে স্বর্ণ না দেওয়ার জালিয়াতির কথা। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আয়োজনে সরকার স্বাধীনতার চার দশক পূর্তি উপলক্ষে সাত পর্বে বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু স্বনামধন্য ৩৩৮ বিদেশি ব্যক্তিত্ব ও সংগঠনকে অন্য উপহারসামগ্রীর সঙ্গে একটি করে ক্রেস্ট দিয়েছিল। কিন্তু আমার এক সূত্র জানাল, এই ক্রেস্টে সোনা দেওয়া হয়নি। এ–সংক্রান্ত জাতীয় মান সংস্থা বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনে (বিএসটিআই) একটি প্রতিবেদনও দেওয়া হয়েছিল। অফিসে এসে আলোচনার পর কাজ শুরু হলো।
প্রায় সাত দিন কাজ করার পর বিএসটিআইয়ের প্রতিবেদন আমার হাতে এল। প্রতিবেদনটি যাচাইয়ের জন্য বিএসটিআই অফিসে গেলাম। তাঁরা জানালেন, ক্রেস্টে রুপার বদলে দেওয়া হয়েছে পিতল, তামা ও দস্তামিশ্রিত ধাতু। যোগাযোগ করি এ–সংক্রান্ত ক্রয় কমিটি, সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান, জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, প্রতিমন্ত্রী ও সচিবদের সঙ্গে। প্রতিবেদনটি ২৫ মার্চ জমা দিলাম। কথা ছিল ২৬ মার্চ ছাপা হবে। কিন্তু সম্পাদক মতিউর রহমান বললেন আরও যাচাই করো। সবার সঙ্গে আবার কথা বলো। কেটে গেল আরও ১০ দিন। বার্তা সম্পাদক শাহেদ মুহাম্মদ আলী দুই দিন প্রতিবেদনটি দেখলেন। ২৫ দিন পর ছাপা হলো আলোচিত সেই প্রতিবেদন।
ছাপানো এই প্রতিবেদন নিয়ে শুরু হলো মানববন্ধন, আলোচনা সভা। বিবৃতি দিল নানা সংগঠন। ঢাকার বিভাগীয় কমিশনারকে প্রধান করে তদন্ত কমিটি গঠন করল সরকার। ঘটনা প্রমাণিত হলো এবং তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হলো, ‘প্রথম আলোর প্রতিবেদনের সত্যতা মিলেছে।’ শহীদ পরিবারের সদস্য নাসরিন আহমেদের পক্ষে আইনজীবী মনজিল মোরসেদ একটি রিটও করলেন। ক্রেস্টে নির্ধারিত পরিমাণে সোনা না দেওয়ায় সরবরাহকারী দুটি প্রতিষ্ঠানের মালিকের নামে মামলা করল মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মাসুদ সিদ্দিকী, অতিরিক্ত সচিব গোলাম মোস্তফা, যুগ্ম সচিব আবুল কাশেম ও জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব মো. বাবুল মিঞাকে ওএসডি করা হয়েছে প্রতিবেদন প্রকাশের পর। দেশের সব টিভি ও পত্রিকায় ফলোআপ হলো দিনের পর দিন। প্রথম আলোর অনলাইনে পাঠক মতামত পেলাম সর্বাধিক।
এখনো যেখানেই যাই, সবাই সেই প্রতিবেদনটির কথা বলেন, ধন্যবাদ দেন। আমাকে না চিললেও প্রতিবেদনের কথা বললেই চিনে ফেলেন। আবার সাহস করে প্রতিবেদন ছাপানোর জন্য প্রথম আলোর সাহসের প্রশংসা করেন। ফোনে এখনো ধন্যবাদ জানিয়ে খুদে বার্তা আসে। এই তো সেদিন এই প্রতিবেদনের জন্য পেলাম দুর্নীতিবিষয়ক আন্তর্জাতিক পুরস্কার। ডয়েচে ভেলের এই পুরস্কারের আয়োজন করে।
রোজিনা ইসলাম: জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক