তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন: ক্রেস্টের স্বর্ণের ১২ আনাই মিছে!

852

সাবেক প্রতিমন্ত্রী দুই সচিবসহ ১৩ জন দায়ী

মুক্তিযুদ্ধের সম্মাননা স্মারক হিসেবে দেওয়া ক্রেস্টে স্বর্ণ জালিয়াতির জন্য মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সাবেক প্রতিমন্ত্রী এ বি তাজুল ইসলাম, মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব মিজানুর রহমান, বর্তমান সচিব কে এইচ মাসুদ সিদ্দিকীসহ ১৩ কর্মকর্তা ও দুই সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে দায়ী করেছে তদন্ত কমিটি ৷
কমিটি গতকাল বৃহস্পতিবার এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকের কাছে জমা দিয়েছে৷
স্বাধীনতার ৪০ বছর পূর্তি উপলক্ষে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে অবিস্মরণীয় অবদানের জন্য বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রনায়ক, রাজনীতিবিদ, দার্শনিক, শিল্পী-সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী, বিশিষ্ট নাগরিক ও সংগঠনকে সম্মাননা দেয় সরকার৷ সম্মাননার স্মারক হিসেবে এই বিশিষ্টজনদের একটি করে ক্রেস্ট দেওয়া হয়৷ প্রতিটি ক্রেস্টে এক ভরি স্বর্ণ ও ৩০ ভরি রুপা থাকার কথা ছিল৷ কিন্তু সম্মাননা দেওয়ার সময় বিএসটিআইয়ে একটি ক্রেস্ট পরীক্ষা করায় মন্ত্রণালয়৷ তাতে দেখা যায়, ক্রেস্টটিতে এক ভরির জায়গায় সোয়া তিন আনা স্বর্ণ এবং রুপার বদলে ৩০ ভরি পিতল, তামা ও দস্তা দেওয়া হয়েছে৷
এ নিয়ে গত ৬ এপ্রিল ‘ক্রেস্টের স্বর্ণের ১২ আনাই মিছে!’ শিরোনামে মূল প্রতিবেদন প্রকাশ করে প্রথম আলো৷ এর পরই তদন্ত কমিটি গঠন করে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়৷ তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রথম আলোয় প্রকাশিত খবরের সত্যতা রয়েছে৷ তদন্ত কমিটি নথিপত্র পর্যালোচনা ও বিভিন্ন পর্যায়ের মতামত িনয়ে এবং একটি ক্রেস্ট সংগ্রহ করে আবার পরীক্ষা করিয়েছে৷ পরীক্ষায় দেখা গেছে, ওই ক্রেস্টে স্বর্ণ বা রুপার কোনো অস্তিত্বই নেই৷
কমিটি এ ঘটনার জন্য বাকি যাঁদের দায়ী করেছে, তাঁরা হলেন ক্রেস্ট দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সদস্য ও মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব গোলাম মোস্তফা, যুগ্ম সচিব মো. আবুল কাসেম, উপসচিব এনামুল কাদের খান, জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব মো. বাবুল মিঞা, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তার কার্যালয়ের নিরীক্ষক আনিসুর রহমান, সুপারিনটেনডেন্ট আমিনুর রশিদ, নিরীক্ষা ও হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা বেগম জেসমিন আক্তার, প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা বেগম জাহানারা পারভীন, সহকারী হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা মো. কামরুজ্জামান ও সাঁট মুদ্রাক্ষরিক আবুল কাসেম৷
অভিযুক্ত ক্রেস্ট সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান দুটি হলো এমিকম ও মেসার্স মোহসিনুল হাসান৷ এমিকন ২৮৫টি ক্রেস্ট সরবরাহ করে৷ বাকি ৬০টি ক্রেস্ট সরবরাহ করে মেসার্স মোহসিনুল হাসান৷ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মোহসিনুল হাসান একজন নির্মাণ ঠিকাদার৷ তদন্ত কমিটিকে তিনি বলেছেন, সাবেক প্রতিমন্ত্রী তাজুল ইসলাম তাঁর মামা৷ আর সচিব কমিটিকে বলেছেন, প্রতিমন্ত্রীর সুপারিশেই মোহসিনুল হাসানকে কাজ দেওয়া হয়েছে৷
ঢাকার বিভাগীয় কমিশনার ও তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক মো. জিল্লার রহমান গতকাল সন্ধ্যায় মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকের কাছে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন৷ জানতে চাইলে জিল্লার রহমান তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করতে চাননি৷ মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী বলেছেন, প্রতিবেদন পড়েই তিনি এ বিষয়ে বলবেন৷
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিয়ম মানা হলে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের এই অশুদ্ধ ক্রেস্ট সংগ্রহ করার সুযোগ আসত না৷ রাষ্ট্রের আর্থিক ক্ষতি হতো না৷ দেশ-বিদেশে সরকার ও রাষ্ট্রের অপূরণীয় সম্মানহানি ও ভাবমূর্তি বিনষ্ট হতো না৷
প্রতিবেদনে বলা হয়, দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সদস্যরা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগসাজশে সরকাির অর্থ আত্মসাতের জন্য স্বর্ণের মান (ক্যারেট) নির্ধারণের বিষয়টি এড়িয়ে গেছেন৷ এ অনিয়মের অধিকাংশ দায়দায়িত্ব দরপত্র মূল্যায়ন কমিটিকে নিতে হবে৷
কমিটি সাবেক প্রতিমন্ত্রী এ বি তাজুল ইসলাম, মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব মিজানুর রহমান, বর্তমান সচিব কে এইচ মাসুদ সিদ্দিকীকে দায়ী করে বলেছেন, তাঁরা গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় এ কাজে অবহেলা করেছেন৷ সচিব কোনোরূপ প্রশ্ন বা যাচাই না করে সাবেক প্রতিমন্ত্রীর কাছে নথি পাঠিয়েছেন৷ প্রতিমন্ত্রী নথি পাওয়ার দিনেই তা অনুমোদন করেছেন৷ মন্ত্রণালয়ের সচিব কে এইচ মাসুদ সিদ্দিকী শাখা পর্যায় থেকে উপস্থাপিত নথিতে স্বর্ণের ক্যারেট উল্লেখ না করার দায়ভার অধীন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর চাপিয়ে দিয়েছেন, যা অনভিপ্রেত৷ অথচ সরবরাহকারীদের সর্বোচ্চ দরে টাকা পরিশোধ করা হয়েছে৷ অসৎ উদ্দেশ্যে ত্রুটিপূর্ণ দরপত্র তৈরি করে মূল্যায়ন কমিটির সদস্যরা শুধু ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হওয়ার উদ্দেশ্যে সরকারের অর্থ আত্মসাতে সহযোগিতা করেছেন৷ প্রতিমন্ত্রী নথি অনুমোদন করায় তাঁর সংশ্রিষ্টতাও প্রমাণিত৷
তদন্তের সময় কমিটি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সরবরাহ করা নথিপত্র পর্যালোচনা করেছে, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেছে এবং বাংলাদেশে বসবাসরত যুক্তরাজ্যের নাগরিক জুলিয়ান ফ্রান্সিসকে দেওয়া মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা ক্রেস্টটি সংগ্রহ করে পরমাণু শক্তি কমিশন ও তাঁতীবাজারের বাংলা গোল্ড প্রাইভেট লিমিটেডে পরীক্ষা করিয়েছে৷ পরীক্ষায় ক্রেস্টটিতে স্বর্ণ বা রুপার কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি৷
দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি ক্রেস্টে স্বর্ণ ও রুপার মান ও পরিমাণ নির্দিষ্ট না করে দরপত্র বিজ্ঞপ্তি জাির ও কার্যাদেশ প্রদান করে এবং ক্রেস্টের গুণগত মান নিশ্চিত না হয়ে দুটি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে বিল পরিশোধের সুপারিশ করেছে৷ এ থেকেই বোঝা যায়, অসৎ উদ্দেশ্যে ত্রুটিপূর্ণ দরপত্র তৈরি করে দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সদস্যরা শুধু ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হওয়ার উদ্দেশ্যে সরকারের অর্থ আত্মসাতে সহযোগিতা করেছেন৷
গত রাতে এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে সাবেক প্রতিমন্ত্রী তাজুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়৷ তিনি ফোন ধরেননি৷ তবে প্রতিবেদনে দেখা যায়, তদন্ত কমিটিকে তাজুল ইসলাম বলেছেন, সচিব ও কর্মকর্তাদের সুপারিশ অনুযায়ী তিনি ক্রেস্টের বিল দেওয়ার নথিতে সম্মতি দিয়েছেন৷ খুঁটিনাটি বিষয় দেখার দায়িত্ব মন্ত্রণালয়ের সচিব ও অন্যান্য কর্মকর্তার, তাঁর নয়৷ তিনি কমিটিকে বলেছেন, যে বিলে সচিব তাঁকে দিয়ে স্বাক্ষর করিয়ে নিয়েছেন, তাতে দায় সৃষ্টি হয়ে থাকলে তা তিনি নেবেন না৷ সাবেক এই প্রতিমন্ত্রী দাবি করেছেন, সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এমিকনকে নির্বাচন করেছে সম্মাননা প্রদানের জন্য গঠিত জাতীয় কমিটি৷ আর বিএসটিআইয়ের প্রতিবেদন তাঁকে দেখানো হয়নি বলে দাবি করেছেন তিনি৷
তাজুল ইসলাম বর্তমানে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির সভাপতি৷ ক্রেস্ট ক্রয় কমিটির সদস্য বাবুল মিয়াকে সম্প্রতি তাঁর একান্ত সচিব করা হয়েছে৷ অবশ্য গতকাল বাবুল মিয়াকে ওএসডি করা হয়৷