শেষ বৈঠকে ৪০টি খুনের মামলা প্রত্যাহার!

668
রোজিনা ইসলাম
০২ ফেব্রুয়ারি ২০১৪, ০৪:৪৮

দায়িত্ব ছাড়ার ঠিক আগে আগে ‘রাজনৈতিক হয়রানিমূলক বিবেচনায়’ ৪০টি খুনের মামলাসহ ৯৮টি আলোচিত মামলা ও মামলা থেকে আসামিদের নাম প্রত্যাহারের সুপারিশ করে গেছেন সাবেক আইন প্রতিমন্ত্রী কামরুল ইসলাম। তিনি এখন খাদ্যমন্ত্রী।
গত মহাজোট সরকারের সময় রাজনৈতিক মামলা প্রত্যাহারসংক্রান্ত জাতীয় কমিটির সভাপতি ছিলেন কামরুল ইসলাম। তাঁর নেতৃত্বে এ নিয়ে সাত হাজার ১৯৮টি মামলা সম্পূর্ণ বা আংশিক প্রত্যাহারের সুপারিশ করা হয়। এর উল্লেখযোগ্য একটি অংশ হত্যা মামলা।
মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানায়, সর্বশেষ গত বছরের ২২ আগস্ট জাতীয় কমিটির বৈঠক শেষে যে সংবাদ ব্রিফিং করা হয়েছিল, তাতে সাবেক আইন প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, কমিটি মাত্র ৭২টি মামলা প্রত্যাহারের সুপারিশ করেছে, সবগুলোতেই জেলা কমিটির সুপারিশ রয়েছে। হত্যা মামলার বিষয়ে তিনি জানিয়েছিলেন, দু-একটি হত্যা মামলা প্রত্যাহার করার সুপারিশ করা হয়েছে, তবে কোনো ধরনের মাদকের মামলা প্রত্যাহার করা হয়নি।
কিন্তু পরে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ৪০টি খুনের মামলা প্রত্যাহারের সুপারিশ করা হয়েছে। প্রতিমন্ত্রী ৭২টি বললেও সুপারিশ করা হয়েছিল ৯৮টি। এর মধ্যে মাদকের মামলাও ছিল।
প্রত্যাহারের সুপারিশ করা বাকি মামলার মধ্যে ছিল ধর্ষণ, ঘুষ লেনদেন, সরকারি টাকা আত্মসাৎ, ডাকাতি, অবৈধভাবে অস্ত্র নিজ দখলে রাখা, কালোবাজারি, অপহরণ, জালিয়াতি, বোমা, চুরি ও অস্ত্র মামলা। ইতিমধ্যে এসব মামলার অনেকগুলো সুপারিশ মেনে আদালত থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, আগের বৈঠকগুলোতে একাধিকবার নাকচ করা হয়েছে শেষ বৈঠকে এমন মামলাও প্রত্যাহারের সুপারিশ করা হয়। এর বেশির ভাগই সংশ্লিষ্ট জেলা কমিটি সুপারিশ করেনি। কমিটির কর্মপদ্ধতি অনুযায়ী, জেলা কমিটির সুপারিশ ছাড়া কোনো মামলাই কেন্দ্রীয় কমিটিতে উত্থাপন হওয়ার কথা নয়।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে মামলাসংক্রান্ত কমিটির সভাপতি সাবেক আইন প্রতিমন্ত্রী ও বর্তমানে খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
শেষ বৈঠকে প্রত্যাহার করা মামলার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীরের এলাকা চাঁদপুরের ১৬টি মামলা, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকুর এলাকা পাবনার ছয়টি খুনের মামলা। চাঁদপুরের সবগুলো মামলাই আদালত থেকে প্রত্যাহার হয়ে গেছে।
১৯৮৮ রাজশাহীর বোয়ালিয়া থানার শিবিরের নেতা আসলাম হত্যা, টঙ্গীর স্কুলছাত্র হত্যা, ভোলায় জমিজমাসংক্রান্ত দুটি হত্যা ও ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার চর মাদ্রাজ ইউনিয়নের ইউপি সদস্য জয়নাল আবেদীন হত্যা, সিরাজগঞ্জের কাজীপুরের জোড়া খুনের দুই আসামির নাম এবং তাড়াশ উপজেলার একটি অপহরণ মামলা, নওগাঁয় আমিনুল ইসলাম খুনের মামলা, ফরিদপুর সদরের চর মাধবদিয়া ইউনিয়নের মনির ব্যাপারী খুন ও কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের এক শ্রমিক হত্যা মামলা প্রত্যাহারের সুপারিশ করা হয়।
এ ছাড়া চট্টগ্রামের ১০ খুনসহ ২০টি আলোচিত মামলা ও মামলা থেকে আসামিদের নাম প্রত্যাহারের সুপারিশ করা হয় শেষ বৈঠকে। এই কয়েকটি মামলায় আসামি ছিল প্রায় অর্ধশত।
ওই বৈঠকে চট্টগ্রামের সন্ত্রাসী আবদুল কাদের ওরফে মাছ কাদেরের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া চারটি হত্যা মামলা প্রত্যাহারের সুপারিশ করা হয়। চট্টগ্রামের ২০টির মধ্যে ডবলমুরিং থানার চারটি, রাঙ্গুনিয়া থানার দুটি, সীতাকুণ্ড, রাউজান, ফটিকছড়ি, কোতোয়ালি, মিরসরাই, লোহাগাড়া, সাতকানিয়া থানার একটি করে খুনের মামলা ও মামলা থেকে আসামির নাম প্রত্যাহারের সুপারিশ করা হয়।
মহাজোট সরকার ক্ষমতায় এসে ২০০৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি রাজনৈতিক ও অন্যান্য কারণে হয়রানির উদ্দেশ্যে করা মামলা প্রত্যাহারের সুপারিশ প্রণয়নে এই কমিটি গঠন করা হয়। কিন্তু ২০০৯ সালে ও তার পরে করা মামলাও রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রত্যাহারের সুপারিশের জন্য শেষ বৈঠকে উত্থাপন করা হয়।
২০০১-০৬ মেয়াদে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারও একই কায়দায় পাঁচ হাজার ৮৮৮টি মামলা সম্পূর্ণ প্রত্যাহার এবং ৯৪৫টি মামলা থেকে কিছু আসামিকে অব্যাহতি দেয়। ওই সময় মোট ৭৩ হাজার ৫৪১ জন আসামি এই প্রক্রিয়ায় বিচার এড়াতে সক্ষম হয়।
জানতে চাইলে আইনজীবী শাহদীন মালিক প্রথম আলোকে বলেন, এভাবে মামলা প্রত্যাহারের সুপারিশের ফলে অপরাধীরা রাজনৈতিক পরিচয় লাভে উৎসাহী হবে। তিনি বলেন, বিশ্বের অন্যান্য দেশে রাজনৈতিক মামলা প্রত্যাহারের সুপারিশের জন্য আলাদা একটি স্বাধীন সংস্থা থাকে। কিন্তু এখানে মামলা প্রত্যাহারের কমিটির প্রধান করা হয় আইন প্রতিমন্ত্রীকে।
[আলোচিত খুনের মামলাগুলোর বিস্তারিত এলাকা ধরে ছাপা হয়েছে সারা দেশ পাতায়]