নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতে সব কার্যক্রম এক ছাতার নিচে

709
রোজিনা ইসলাম | জুলাই ০২, ২০১৩

imagesভেজাল রোধে ও খাদ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ২০ ধরনের অপরাধের শাস্তির জন্য বিভিন্ন মেয়াদে লঘু থেকে গুরুদণ্ডের সাজা ও জরিমানার বিধান রেখে ‘নিরাপদ খাদ্য আইন ২০১৩’-এর খসড়া প্রণয়ন করা হয়েছে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগের ২৩টি স্টেকহোল্ডার সংস্থা থেকে লিখিত মতামত, সেমিনার ও বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে এ গুরুত্বপূর্ণ আইনের খসড়া তৈরি করা হয়েছে। এ আইন অনুযায়ী, নিরাপদ খাদ্যব্যবস্থার সঙ্গে জড়িত কোনো ব্যক্তি বা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কোনো সদস্য কোনো অপরাধ বা ক্ষতি সংঘটন বা সংঘটনের প্রস্তুতি গ্রহণ বা সংঘটনে সহায়তাসংক্রান্ত কোনো ঘটনার বিষয়ে কেউ ভিডিও বা স্থিরচিত্র ধারণ বা গ্রহণ করলে বা কোনো কথাবার্তা বা আলাপ-আলোচনা রেকর্ড করলে ওই ভিডিও, স্থিরচিত্র, অডিও ওই অপরাধ বা ক্ষতিসংশ্লিষ্ট মামলা বিচারের সময় সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণযোগ্য হবে।

এর আগে ২০১২ সালের ২৮ নভেম্বর এক বৈঠকে বিশুদ্ধ খাদ্য উত্পাদন, প্রক্রিয়াকরণ, সংরক্ষণ, পরিবহন, মোড়ক, বাজারজাতকরণ ও খাদ্যে ভেজাল রোধসংক্রান্ত সব আইন ও অধ্যাদেশ পর্যালোচনা করে ‘দ্য পিওর ফুড অর্ডিন্যান্স ১৯৫৯’-এর বদলে দ্রুত ‘নিরাপদ খাদ্য আইন ২০১৩’ নামে এ আইন প্রণয়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

নতুন আইনের বৈশিষ্ট্য

বিভিন্ন মন্ত্রণালয় বা সংস্থার আওতায় প্রচলিত খাদ্যে ভেজাল রোধ ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত সব কার্যক্রম একই ছাতার (আমব্রেলার) নিচে এনে যুগোপযোগী আইন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নিরাপদ খাদ্যব্যবস্থা নিশ্চিত করতেই এ আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এ আইনে জাতীয় নিরাপদ ‘খাদ্যব্যবস্থা উপদেষ্টা পরিষদ’ নামে শক্তিশালী উপদেষ্টা পরিষদ গঠনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। কমিটিতে খাদ্যমন্ত্রী সভাপতি ও মন্ত্রিপরিষদের সচিব সহসভাপতি থাকবেন। এ ছাড়া, জনস্বাস্থ্য, পুষ্টি, খাদ্য উত্পাদন, শিল্প, খাদ্যভোগ ও ভোক্তা বিষয়ে দীর্ঘ পেশাগত অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের সমন্বয়ে ‘নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ’ গঠন করা হবে এবং তাঁদের কারিগরি জ্ঞান ও সহায়তার মাধ্যমে দেশে নিরাপদ খাদ্যব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে।

গুরুত্বপূর্ণ বাধ্যবাধকতা

এই আইন অনুযায়ী, মেয়াদোত্তীর্ণ কোনো মাছ, খাদ্য বা পশুখাদ্য বা খাদ্যপণ্য আমদানি বা মজুদ বা বিতরণ বা বিক্রয় করা যাবে না। যদি কোনো ব্যবসায়ী মনে করেন, তিনি যেসব খাদ্যদ্রব্য উত্পাদন বা প্রক্রিয়াকরণ বা সরবরাহ বা বিক্রয় করেছেন, সেগুলোর ক্ষেত্রে কোনো আইন বা বিধি মানা হচ্ছে না, ভোক্তার জন্য অনিরাপদ, তবে তার কারণ উল্লেখ করে তিনি তা দ্রুত সন্দেহজনক ও প্রশ্নবিদ্ধ খাদ্যদ্রব্য বাজার বা ভোক্তার কাছ থেকে প্রত্যাহারের ব্যবস্থা করবেন এবং উপযুক্ত কর্তৃপক্ষকে তা জানাবেন।

ক্ষতিপূরণ

ইচ্ছাকৃত বা অবহেলার কারণে ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণ দাবি, হয়রানিমূলক মিথ্যা অভিযোগ বা মামলা, প্রতিষ্ঠানের বিধান লঙ্ঘন করা বা অপরাধ সংঘটনের ব্যাপারে আইনে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যদি ইচ্ছাকৃত বা অবহেলার জন্য যথাযথ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না করে কোনো কাজের মাধ্যমে কোনো ব্যক্তি, খাদ্যস্থাপনা বা ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষতি করে, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান ওই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়ের জন্য উপযুক্ত আদালতে মামলা করতে পারবেন।

কোনো ব্যক্তি বা সত্তাকে হয়রানি বা জনসমক্ষে হেয় করা বা ব্যবসায়িক ক্ষতি সাধনের অভিপ্রায়ে মিথ্যা বা হয়রানিমূলক মামলা বা অভিযোগ করলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা সত্তা ওই ব্যক্তি বা সত্তার বিরুদ্ধে উপযুক্ত আদালতে মামলা বা অভিযোগ করতে পারবে। এ ছাড়া, প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে যে অংশীদার, পরিচালক, নির্বাহী বা কর্মচারীর ওই অপরাধের সঙ্গে প্রত্যক্ষ সংশ্লিষ্টতা থাকবে, তিনি ওই অপরাধ বা বিধান লঙ্ঘন করেছেন বলে গণ্য হবেন, যদি তিনি প্রমাণ করতে না পারেন যে ওই অপরাধ বা বিধান লঙ্ঘন তাঁকে না জানিয়ে করা হয়েছে।

জরিমানা ও শাস্তি

জীবননাশক বা মানবস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর কোনো রাসায়নিক বা ভারী ধাতু বা বিষাক্ত দ্রব্যমিশ্রিত কোনো খাদ্যদ্রব্য উত্পাদন, আমদানি, প্রস্তুত, মজুদ, বিতরণ, বিক্রয় বা বিক্রয়ের অপচেষ্টা করলে অনূর্ধ্ব সাত বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড হবে। পুনরায় একই অপরাধ করলে সাত বছর থেকে অনূর্ধ্ব ১৪ বছরের কারাদণ্ড বা অন্যূন ১০ লাখ টাকা জরিমানা। এ ছাড়া, দূষণমিশ্রিত কোনো খাবার বিক্রি করলে; ভেজাল খাবার বিক্রয় বা বিক্রয়ের অপচেষ্টা করলে; হোটেল বা রেস্তোরাঁ বা প্রতিষ্ঠানের অবহেলা; মিথ্যা বা হয়রানিমূলক মামলা করলে; শর্ত ভঙ্গ করে কোনো খাদ্যদ্রব্য মজুদ বা প্রস্তুত করলে; অনুমোদিত ট্রেডমার্ক বা ট্রেডনামে বাজারজাত করা কোনো খাদ্যপণ্য নকল করে বিক্রয়ের চেষ্টা করলে; খাদ্যদ্রব্য উত্পাদন বা সংরক্ষণের স্থানে শিল্প-কারখানার তেল বা খনিজ বা বর্জ্য থাকার অনুমোদন দেওয়াসহ এমন ২০ ধরনের অপরাধের জন্য অনূর্ধ্ব সাত বছর থেকে কমপক্ষে দুই বছর শাস্তি এবং অনধিক ১০ লাখ টাকা অথবা কমপক্ষে তিন লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। একই অপরাধ পুনরায় করলে শাস্তি ও জরিমানার পরিমাণ আরও বাড়ানোর বিধান রাখা হয়েছে।

মামলা ও বিচার

কোড অব ক্রিমিনাল প্রসিডিউর ১৮৯৮ অনুযায়ী, আইনে যা-ই থাকুক না কেন, সরকার বা নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের ক্ষমতাপ্রাপ্ত প্রতিনিধি, নিরাপদ খাদ্য পরিদর্শক এই আইনের অধীনে লিখিত অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে আইনের অধীন কোনো অপরাধ বিচারার্থে বিশুদ্ধ খাদ্য আদালত আমলে নিতে পারবেন। আইনে বলা হয়েছে, কোনো অপরাধ সংঘটনের সঙ্গে সঙ্গে আইনের ৪৯ ধারার অধীন স্থাপিত বিশুদ্ধ খাদ্য আদালতের স্থানীয় সীমার মধ্যে লিখিত মামলা দায়ের করবেন। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ দিনে বা রাতে যেকোনো সময় অপরাধীকে গ্রেপ্তারের জন্য পরোয়ানা জারি করতে পারবে। অভিযোগ দায়েরের ৯০ দিনের মধ্যে অভিযোগপত্র দাখিল করা না হলে মামলাটি নিরাপত্তা খাদ্য কর্তৃপক্ষের বিবেচনার জন্য উপস্থাপিত হবে এবং তারা এ অপরাধের তদন্ত কার্যক্রম পর্যালোচনা করবে।