জয়ন্তী রেজা হত্যা মামলা: ক্ষমার আবেদন আজম রেজার

797
জয়ন্তী রেজা হত্যা মামলা

রোজিনা ইসলাম | জুন ২৯, ২০১৩

স্কুলশিক্ষিকা ও স্থপতি জয়ন্তী রেজা হত্যা মামলায় যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামি আজম রেজার সাজা মওকুফের জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে আবেদন করা হয়েছে।প্রয়াত সাংবাদিক ও মুক্তিযোদ্ধা এম সাদেকীনের মেয়ে জয়ন্তী রেজাকে হত্যার দায়ে নিম্ন আদালত স্বামী আজম রেজার মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন। পরে উচ্চ আদালত তা কমিয়ে যাবজ্জীবন সাজার আদেশ দেন।২০০৪ সালের ৯ জানুয়ারি আজম রেজার বনানীর ৭ নম্বর রোডের জি ব্লকের ৪১ নম্বর বাড়িতে অস্ট্রেলিয়ান ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের শিক্ষিকা জয়ন্তী নিহত হন। ২০০০ সালের ১০ মার্চ জয়ন্তীর সঙ্গে অভিনেত্রী শম্পা রেজার ভাই আজম রেজার বিয়ে হয়।স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নথিপত্র থেকে জানা গেছে, ২০১১ সালের ১০ জুলাই ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে সাজাভোগরত যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আজম রেজার অবশিষ্ট সাজা মওকুফের জন্য তাঁর বাবা মো. আহমদ রেজা রাষ্ট্রপতি বরাবর আবেদন করেন। আবেদনটি বিধি মোতাবেক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়।মন্ত্রণালয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দুই বছর আগে করা আবেদনটি এখন নথিভুক্ত করে ক্ষমার জন্য প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। আইন মন্ত্রণালয় গত ১২ মে আজম রেজাকে বিশেষ ক্ষমা করার বিষয়ে ইতিবাচক মতামত দিয়েছে। ওই সূত্রমতে, বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে আজম রেজার সাজা মওকুফের জন্য আবেদন করা হলেও বিষয়টি নিয়ে আগ্রহ দেখাননি মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। কিন্তু এবার আবেদনটি রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠাতে বিভিন্ন মহলের জোর সুপারিশ রয়েছে।জয়ন্তী রেজার পরিবারের দাবি, একজন প্রভাবশালী মন্ত্রী এ ব্যাপারে তদবির করছেন। আগের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুনের কাছেও এই তদবির করা হয়েছিল। পরে ফাইলটি প্রধানমন্ত্রীর কাছেও পাঠানো হয়। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে তা ফেরত পাঠানো হয়।স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নথিপত্রে আছে, মামলার অভিযোগে বলা হয়, আসামি আজম রেজার সঙ্গে একজন অভিনেত্রীর অনৈতিক সম্পর্ক ছিল। এর প্রতিবাদ করলে জয়ন্তী রেজাকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হতো। এরই ধারাবাহিকতায় ২০০৪ সালের ৮ জানুয়ারি রাতে অথবা ৯ জানুয়ারি দিনে বনানীর বাসার শয়নকক্ষে জয়ন্তী রেজাকে পূর্বপরিকল্পিতভাবে মাথা ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত ও মারধর করে হত্যা করা হয়। পরে এই হত্যাকাণ্ডকে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দিতে জয়ন্তীর গলায় ফাঁস দিয়ে ক্ষত চিহ্ন সৃষ্টি করেন আসামি। ঘটনা ধামাচাপা দিতে গুলশান থানায় জয়ন্তী আত্মহত্যা করেছেন জানিয়ে মিথ্যা তথ্য দেওয়া হয়। ওই দিনই আজম গ্রেপ্তার হন। দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-৪-এর বিচারক ২০০৫ সালের ১৪ জানুয়ারি এ মামলার রায়ে আজম রেজাকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন।এই রায়ের প্রায় তিন বছর পর হাইকোর্টে আজম রেজার আপিল ও মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিতকরণের শুনানি শুরু হয়। ২০০৮ সালের ২১ জুলাই হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চের রায়ে মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।জয়ন্তীর মা লুসিল সাদেকীন প্রথম আলোকে বলেন, ‘জয়ন্তীকে নিষ্ঠুর ও নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। জয়ন্তী একজন সাংবাদিক ও মুক্তিযোদ্ধার মেয়ে। তার সন্তান তূর্য একটি কষ্ট নিয়ে বড় হচ্ছে। তার পরও যদি মেয়ে হত্যার বিচার না পাই, তাহলে এর দায়ভার সরকারকেই নিতে হবে।’

কারাগার ও আইন মন্ত্রণালয়ের মতামত: কারা অধিদপ্তর থেকে পাঠানো বিবরণীতে বলা হয়, আজম রেজার বয়স ৫১ বছর। তাঁর সাজার মেয়াদ শুরু হয়েছে ২০০৮ সালের ৬ জুন। বর্তমানে তাঁর মোট সাজাভোগের পরিমাণ প্রায় চার বছর পাঁচ মাস। কারাগারে তাঁর বিরুদ্ধে অসদাচরণের কোনো প্রতিবেদন নেই। তাঁর পরিবার ও স্বজনেরা সমাজে প্রতিষ্ঠিত ও স্বীকৃত সংস্কৃতিকর্মী। বর্তমানে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে সাজা ভোগ করছেন তিনি।

আজম রেজার অবশিষ্ট সাজা মওকুফের বিষয়ে গত ১২ মে আইন মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো মতামতে বলা হয়, সাজাপ্রাপ্ত আসামি আজম রেজা মামলার শুরু থেকে আট বছর ধরে জেলহাজতে আছেন। এর মধ্যে প্রায় তিন বছর ছয় মাস তিনি ফাঁসির প্রকোষ্ঠে ছিলেন। তাঁর পঙ্গু স্ত্রী ও তিনটি নাবালক সন্তান রয়েছে।

সংবিধানের ৪৯ অনুচ্ছেদ অনুসারে, রাষ্ট্রপতি কোনো আদালত, ট্রাইন্যুনাল বা অন্য কোনো কর্তৃপক্ষের দেওয়া যেকোনো দণ্ড মার্জনা, বিলম্বন ও বিরাম মঞ্জুর করতে এবং যেকোনো দণ্ড মওকুফ, স্থগিত বা হ্রাস করতে পারেন।

জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মাইনউদ্দিন খন্দকার বলেন, ‘যে কেউ এ ধরনের আবেদন করতে পারেন। তবে একজন খুনির জন্য চাইলেই তো আর ক্ষমা পাওয়া যায় না। যেখানে সর্বোচ্চ আদালত আজম রেজাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন, সেখানে আমাদের বিষয়টি অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে দেখতে হচ্ছে।’