কালো তালিকাভুক্তি এড়াতেই তড়িঘড়ি আইন সংশোধন!

666

রোজিনা ইসলাম | জুন ১৪, ২০১৩

আন্তরাষ্ট্রীয় সংস্থা ফিন্যান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্কফোর্সের (এফএটিএফ) চাপে এবং কালো তালিকাভুক্তি এড়াতে তড়িঘড়ি করে সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) বিল, ২০১৩ সংসদে পাস করা হয়েছে। আগামী সপ্তাহে নরওয়েতে সংস্থাটির পূর্ণাঙ্গ ও কার্যকরী কমিটির বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।সরকারের ঘনিষ্ঠ সূত্র জানায়, এফএটিএফের সুপারিশ বাস্তবায়নে বাংলাদেশ সচেষ্ট ছিল—ওই বৈঠকে এমন ধারণা দিতেই দ্রুত এ আইন পাস করা হয়েছে। যেসব দেশ এফএটিএফের সুপারিশ বাস্তবায়ন করে না, তাদের প্রতি বিশেষ সতর্ক দৃষ্টি রাখা হয়। সন্দেহভাজন তালিকায়ও তাদের নাম উঠে আসে।৩৬টি দেশ নিয়ে গঠিত এ সংস্থা আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদে অর্থায়ন প্রতিরোধ এবং মানি লন্ডারিং প্রতিরোধে কাজ করে। মানি লন্ডারিং হচ্ছে টাকা পাচারসহ অর্থের সব ধরনের অবৈধ ব্যবহার। ১৯৮৯ সালে গঠিত এ সংস্থার সদর দপ্তর প্যারিসে।আইনটি পাস করার আগে তাড়াহুড়া করতে গিয়ে সংসদীয় কমিটির বৈঠকে দুটি ধারা যুক্ত করা হয়, যা মন্ত্রিসভার বৈঠকে ও আইন মন্ত্রণালয়ের মতামতে (ভেটিং) অন্তর্ভুক্ত ছিল না। এমনকি গত তিন বছরে এ বিলসংক্রান্ত বিষয়গুলো আলোচনাও হয়নি। এভাবে আলোচনা না করে এমন দুটি বিষয় অন্তর্ভুক্ত করায় নানা মহলে বিষয়টি সমালোচিত হচ্ছে।এ দুটি বিষয় হচ্ছে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বা জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) ক্ষমতা খর্ব এবং ফেসবুক, স্কাইপ, টুইটার বা ইন্টারনেট মাধ্যমের কথোপকথন ও ছবি মামলায় সাক্ষ্যপ্রমাণ হিসেবে আদালতে ব্যবহার করা।৩ জুন সম্পূরক কার্যসূচি হিসেবে সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) বিল, ২০১৩ সংসদে উত্থাপন করা হয়। আট দিনের মধ্যেই সংসদীয় কমিটিতে পরীক্ষার পর তড়িঘড়ি করে ১১ জুন বিলটি পাস হয়।সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এফএটিএফ এ আইন পাস করার জন্য দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশকে চাপ দিয়ে আসছিল।

কালো তালিকাভুক্তির ঝুঁকি: স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো বিভিন্ন প্রস্তাবে বেশ কয়েকবার উল্লেখ করা হয়, এফএটিফের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গত ১৪ ফেব্রুয়ারির মধ্যে আইনটি মন্ত্রিসভায় অনুমোদন করার জন্য চাপ ছিল। এটি অনুমোদন করা হলে বাংলাদেশ কালো তালিকাভুক্তির ঝুঁকি থেকে রক্ষা পাবে বলে প্রস্তাবে বলা হয়েছিল। আন্তর্জাতিকভাবে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং এতে সহায়তার জন্য জি-৮ভুক্ত দেশগুলো নিয়ে ১৯৮৯ সালে এফএটিএফ নামের এ সংস্থা গঠিত হয়। সারা বিশ্বে জঙ্গিবাদে অর্থায়ন প্রতিরোধে এফএটিএফ এ পর্যন্ত নয়টি সুপারিশ প্রণয়ন করেছে।

মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসবাদে অর্থায়ন প্রতিরোধে জাতীয় পর্যায়ে আইন প্রণয়ন এবং নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে আইন, অর্থনৈতিক এবং আইন প্রয়োগের বিশেষ জ্ঞানসম্পন্ন নীতিনির্ধারণী সংগঠন হলো এফএটিএফ। ৩৬টি দেশ এবং ইউরোপীয় কমিশন ও গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল নামের দুটি আঞ্চলিক সংস্থা এফএটিএফের সদস্য। এফএটিএফের প্রাথমিক তিনটি কাজ হচ্ছে মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে গবেষণা, মানি লন্ডারিং প্রতিরোধে সদস্যদেশগুলোর গৃহীত ব্যবস্থার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ ও বিশ্বব্যাপী এফএটিএফের মান গ্রহণ ও প্রয়োগের ক্ষেত্রে সবাইকে উদ্বুদ্ধ করা।

এফএটিএফ মানি লন্ডারিং প্রতিরোধে ১৯৯০ সালে ৪০টি সুপারিশ প্রণয়ন করে, যা পরে ১৯৯৬ ও ২০০৩ সালে পরিমার্জিত হয়।

আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর চাপ: মন্ত্রিসভায় সারসংক্ষেপে বলা হয়েছিল, সন্ত্রাসী কার্যক্রমের ধরন ও প্রকৃতি পরিবর্তন এবং সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে আন্তরাষ্ট্রীয় সংস্থা এশিয়া প্যাসিফিক গ্রুপ (এপিজি) প্রণীত আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পরিপালনের জন্য ২০০৯ সালের সন্ত্রাসবিরোধী আইন সংশোধনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। সে অনুযায়ী মন্ত্রণালয়ের মতামত নিয়ে এবং মন্ত্রিসভার নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন গ্রহণ করা হয়, যা পরে ‘সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) আইন, ২০১২ হিসেবে গণ্য হয়। কিন্তু ওই সংশোধিত সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) আইন, ২০১২-এর বিষয়ে এপিজি, আরআরজি, এফএটিএফসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার কিছু পর্যবেক্ষণের পরিপ্রেক্ষিতে এনসিসিসহ বিভিন্ন পর্যায়ে একাধিক সভা হয়। ওই সভায় আইনের সংশোধন প্রস্তাব জাতিসংঘের বিভিন্ন কনভেনশন, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে অর্থায়ন প্রতিরোধে এফএটিএফের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড প্রতিপালনের লক্ষ্যে এবং জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের বিভিন্ন প্রস্তাবের বিপরীতে চিহ্নিত বিভিন্ন ঘাটতি পূরণের প্রস্তাব করা হয়।

সর্বশেষ এ বছরের ১৪ থেকে ১৮ জানুয়ারি হংকংয়ে অনুষ্ঠিত এক সভায় গৃহীত ‘সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) আইন, ২০০৯’ এবং সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) আইন, ২০১২ সংশোধন করে ‘সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধনী) আইন, ২০১৩’-এর একটি খসড়া প্রণয়ন করে এবং এ খসড়া সংশোধন আইনের ওপর অনুমোদনের জন্য এনসিসিতে কমিটির সভাপতি অর্থমন্ত্রীর কাছে পাঠানো হয়। পরে গত ১১ ফেব্রুয়ারি মন্ত্রিসভায় উত্থাপন করে নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়।

এর সারসংক্ষেপে বলা হয়, এসব সংশোধন প্রস্তাব জাতিসংঘের বিভিন্ন কনভেনশন এবং জাতিসংঘের বিভিন্ন নিরাপত্তা পরিষদের বিভিন্ন কার্যবিবরণীর বিপরীতে চিহ্নিত বিভিন্ন ঘাটতি পূরণের জন্য করা হয়েছে।

দুটি বিতর্কিত ধারা: সন্ত্রাসবিরোধী আইনে বলা হয়েছে, কারও অপরাধ তদন্ত করার জন্য জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বা ডিসির পূর্বানুমোদনের বিধান বাদ দিয়ে শুধু অবহিত করার বিধান আনা হয়েছে। অর্থাৎ কারও অপরাধ তদন্ত করার জন্য ডিসির অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন হবে না। পুলিশ স্বতঃপ্রণোদিতভাবে এ তদন্ত করতে পারবে। সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯ সংশোধন প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর ৫ জুন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে ৪০ ধারা সংশোধন করে এ ধারা যুক্ত করা হয়।

সংসদীয় কমিটিতে সংশোধন প্রস্তাবের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করা হয়। সেখানে পুলিশের পক্ষ থেকে জোরালোভাবে এ বিষয়ে প্রস্তাব দেওয়া হলে সভায় আইনের ৪০(১) ধারায় সংশোধনী আনা হয়। তদন্ত ও বিচার বিষয়ে পূর্বানুমোদনের অপরিহার্যতাবিষয়ক এ ধারায় বলা ছিল, জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের পূর্বানুমোদন ব্যতিরেকে কোনো পুলিশ কর্মকর্তা এ আইনের অধীন কোনো অপরাধের তদন্ত করতে পারবেন না। সংশোধনীতে এ বাধ্যবাধকতা তুলে দিয়ে বলা হয়েছে, এ আইনের অধীন কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তা তাৎক্ষণিকভাবে সংশ্লিষ্ট জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে অবহিত করে মামলা রুজু করে তদন্ত শুরু করতে পারবেন।

জানা গেছে, ওই বৈঠকের আগে পুলিশের উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদল মন্ত্রণালয়ে গিয়ে দুটি ধারা যোগ করার ব্যাপারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে অনুরোধ জানায়। তারা রামুসহ বিভিন্ন ঘটনার উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে এসব সংশোধনী আনতে রাজি করায়। পরে সংসদীয় কমিটির বৈঠকেও পুলিশের একটি প্রতিনিধিদল গিয়ে হাজির হয়। এ সময় কমিটির সভাপতি বৈঠকে আমন্ত্রিত ব্যক্তিদের ছাড়া অন্যদের বাইরে যেতে বললেও তাঁরা সেখানে উপস্থিত থাকেন। সভায় একটি ধারার বিরোধিতা করেন সরকারদলীয় সাংসদ সানজিদা খানম। তবে তাঁর আপত্তি আমলে নেওয়া হয়নি।

যোগাযোগ করা হলে সানজিদা খানম বলেন, ‘মত প্রকাশের গণতান্ত্রিক অধিকার সবারই আছে। সেদিনের কিছু সিদ্ধান্তে আমি একমত হতে পারিনি। আর আমার মতামত যে সঠিক, সেটা ভবিষ্যতে বোঝা যাবে।’ তবে ফেসবুক, টুইটার, ইন্টারনেটের বিষয়টি যুক্ত করা সম্পর্কে তিনি বলেন, এটা শুধু অপরাধীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তা বলেন, এভাবে পুলিশকে লাগামহীন ক্ষমতা দেওয়া হলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়বে। যাকে-তাকে এ আইনের আওতায় এনে পুলিশ ক্ষমতার অপব্যবহার করার সুযোগ পাবে।

এ ছাড়া ফেসবুক, স্কাইপ, টুইটার বা অন্য কোনোভাবে ইন্টারনেটে ব্যবহূত আলোচনা, কথাবার্তা, স্থির বা ভিডিওচিত্র সাক্ষ্যপ্রমাণ হিসেবে আদালতে উপস্থাপনের ধারাটিও নতুন যুক্ত করা হয়েছে।

আইনের ২১ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো সন্ত্রাসী ব্যক্তি, সত্তা বা সংগঠনের ফেসবুক, স্কাইপ, টুইটার বা ইন্টারনেটের যেকোনো মাধ্যমের অপরাধ-সংশ্লিষ্ট আলাপ-আলোচনা ও কথাবার্তা অথবা অপরাধ-সংশ্লিষ্ট স্থির ও ভিডিওচিত্র অপরাধের সাক্ষ্যপ্রমাণ হিসেবে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা আদালতে উপস্থাপন করতে পারবে এবং তা আদালতে গ্রহণযোগ্য হবে।

এফএটিএফের ওয়েবসাইট থেকে জানা যায়, সন্ত্রাসবাদ দমন এবং মানি লন্ডারিং প্রতিরোধে কাজ করতে বাংলাদেশ সরকার ২০১০ সালের অক্টোবরে একটি উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক অঙ্গীকার করে। ২০১২ সালের অক্টোবর থেকেই বেশ কিছু পদক্ষেপও নেয় বাংলাদেশ। এর মধ্যে রয়েছে সন্ত্রাসবাদ দমন আইনে প্রয়োজনীয় সংশোধনী মন্ত্রিসভায় অনুমোদন এবং আর্থিক বাজারে অর্থ লেনদেনের মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি প্রয়োজনীয় নির্দেশনা জারি করা।

তবে এফএটিএফ মনে করে, অঙ্গীকার পূরণে ঘাটতি এখনো বিদ্যমান রয়েছে। বাংলাদেশের উচিত এ ঘাটতি মোকাবিলায় তার কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের চেষ্টা অব্যাহত রাখা। এসবের মধ্যে রয়েছে ১. সন্ত্রাসবাদে অর্থায়নকে পর্যাপ্ত অপরাধ হিসেবে গণ্য করা, ২. সন্ত্রাসীদের সম্পদ শনাক্ত ও জব্দকরণের কার্যপ্রণালি তৈরি ও বাস্তবায়ন, ৩. একটি কার্যকর ও সক্রিয় আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট প্রতিষ্ঠা এবং ৪. আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করা।

বিদ্যমান ঘাটতি মোকাবিলায় ও কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখতে বাংলাদেশকে উৎসাহিত করে এফএটিএফ।