৩১ ইউপি চেয়ারম্যান ও সদস্য বরখাস্ত

664

রোজিনা ইসলাম | জুন ১৩, ২০১৩

সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত সহিংস ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে ইউনিয়ন পরিষদের ৩১ জন চেয়ারম্যান ও সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।

বরখাস্তের আদেশ পাওয়ার তিন দিনের মধ্যে দায়িত্ব হস্তান্তর করতে তাঁদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বরখাস্ত হওয়া ১৭ চেয়ারম্যান ও ১৪ সদস্যের মধ্যে একজন জাতীয় পার্টির, অন্যরা বিএনপি ও জামায়াতের স্থানীয় পর্যায়ের নেতা-সমর্থক। গতকাল বুধবার স্থানীয় সরকার বিভাগের ইউনিয়ন পরিষদ শাখা থেকে বরখাস্তসংক্রান্ত চিঠি পাঠানো হয়েছে। স্থানীয় সরকার বিভাগের জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব আবু তাহের মুহাম্মদ জাবের আদেশে সই করেন। এঁদের অনেকের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে দ্রুত বিচার আইন, সন্ত্রাসবিরোধী আইনসহ বিভিন্ন ধারায় ফৌজদারি মামলা করা হয়েছে বলে মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।

একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধে জামায়াতে ইসলামের নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ফাঁসির রায়ের পর গত মার্চে জামায়াত-শিবির দেশের বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক হামলা ও ভাঙচুর চালায়। চাঁপাইনবাবগঞ্জ, জয়পুরহাট, পিরোজপুর, চুয়াডাঙ্গা, খুলনা, দিনাজপুর, গাইবান্ধা, যশোর, নোয়াখালীসহ বিভিন্ন এলাকায় এসব হামলার ঘটনায় কোথাও কোথাও বিএনপি এমনকি জাতীয় পার্টিও অংশ নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। জানতে চাইলে স্থানীয় সরকার সচিব আবু আলম মো. শহিদ খান বলেন, জনপ্রতিনিধিদের দায়িত্ব হচ্ছে শান্তি-সম্প্রীতি বজায় রেখে এলাকার মানুষের জানমাল রক্ষা করা। কিন্তু কিছু জনপ্রতিনিধি তা না করে হামলাকারীদের উসকে দিয়েছেন। ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতিতে যেন তাঁরা দায়িত্বের প্রতি অবিচল থাকেন, সে জন্যই মদদদাতাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ: এই জেলার মোবারকপুর, শ্যামপুর, নাচোল ও কানসাট ইউনিয়নের চার জনপ্রতিনিধিকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। শিবগঞ্জের কানসাটে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির সদর দপ্তর ও বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রে অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় শিবগঞ্জের মোবারকপুর ইউপির চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি তৌহিদুর রহমানকে বরখাস্ত করা হয়। শিবগঞ্জ থানায় তাঁর বিরুদ্ধে তিনটি মামলাও করা হয়। তবে তাঁর দাবি, রাজনৈতিক কারণে এ মামলা করা হয়েছে।

পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় জামায়াত-সমর্থিত চেয়ারম্যান নুরুল হুদার বিরুদ্ধে তিনটি হত্যা মামলা ও শ্যামপুর আওয়ামী লীগ কার্যালয় পোড়ানোর মামলায় আসামি করা হয়েছে। নাচোলের ইউপি চেয়ারম্যান ইনায়েতুল্লাহর বিরুদ্ধে রয়েছে পুলিশের কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগ। দ্রুত বিচার আইনে করা মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগপত্রও দেওয়া হয়েছে। ইনায়েতুল্লাহ নিজেকে জামায়াতের রুকন দাবি করে বলেন, তিনি বর্তমানে জামিনে আছেন। ইউপি সদস্য ও স্থানীয় বিএনপির নেতা রেজাউল ইসলামের বিরুদ্ধে রয়েছে পল্লী বিদ্যুৎ কার্যালয়ে হামলার অভিযোগ। এ ঘটনায় তাঁর বিরুদ্ধেও তিনটি মামলা হয়েছে। শিবগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিজানুর রহমান জানান, তৌহিদুর রহমান, নুরুল হুদা ও রেজাউল ইসলাম পলাতক রয়েছেন।

গাইবান্ধা: জামায়াত-শিবিরের সহিংস ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে গাইবান্ধার চার ইউপি সদস্যকে বরখাস্ত করা হয়েছে। অভিযোগ আছে, সুন্দরগঞ্জ উপজেলার বামনডাঙ্গা পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রে হামলা চালিয়ে চার পুলিশ কনস্টেবলকে হত্যার ঘটনার নেতৃত্ব দেন সুন্দরগঞ্জ উপজেলার সর্বানন্দ ইউপির সদস্য ও জামায়াতের কর্মী জহুরুল ইসলাম। একই উপজেলার সোনারায় ইউনিয়নের ইউপি সদস্য ও বিএনপির কর্মী তোফাজ্জল হোসেনও এ ঘটনায় অভিযুক্ত। একই উপজেলার বেলকা বাজারের দোকানপাট ভাঙচুরে নেতৃত্ব দেন বেলকার ইউপি সদস্য ও জাতীয় পার্টির কর্মী জহুরুল হক।

মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে জহুরুল হক বলেন, ‘ঘটনার দিন জামায়াত-শিবির বাজারে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর শুরু করলে আমি এলাকার জনপ্রতিনিধি হিসেবে বাধা দিই। পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করি।’

সাদুল্যাপুর উপজেলার জামালপুরের ইউপি সদস্য ও জামায়াতের কর্মী মেজবাউল ইসলাম বামনডাঙ্গা পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রে হামলাসহ জামায়াত-শিবিরের একাধিক সহিংস ঘটনার নেতৃত্বে ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

জয়পুরহাট: জয়পুরহাটের সদর ও পাঁচবিবি উপজেলার আমদই, বম্বু, কুসুম্বা ইউনিয়নের জনপ্রতিনিধিকে বরখাস্ত করা হয়েছে। বম্বু ইউপির চেয়ারম্যান আল্লামা গোলাম কিবরিয়া জয়পুরহাট জেলা জামায়াতে সহকারী সেক্রেটারি। তিনি জানান, সাময়িক বরখাস্তের কোনো কাগজপত্র তিনি পাননি। তবে এটা করা হয়ে থাকলে রাজনৈতিকভাবে হয়রানি করার জন্যই করা হয়েছে। একই উপজেলার আমদই ইউপি সদস্য রমজান আলী ওই ইউনিয়নের বিএনপির সভাপতি। তাঁর বিরুদ্ধেও সদর থানায় মামলা রয়েছে। পাঁচবিবি উপজেলার কুসুম্বা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবদুল গফুর মণ্ডল পাঁচবিবি উপজেলা বিএনপির সভাপতি।

২৮ ফেব্রুয়ারি দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ফাঁসির রায় হয়। এরপর সহিংস ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত সংখ্যালঘু ও আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের দায়ের করা মামলায় আসামি করা হয় আবদুল গফুরকে। কুসুম্বা ইউপির সদস্য সুজাউল ইসলাম ওই ইউনিয়ন জামায়াতের আমির। তাঁর বিরুদ্ধেও পাঁচবিবি থানায় একাধিক মামলা রয়েছে।

চুয়াডাঙ্গা: জীবননগরে তাণ্ডবের ঘটনায় অভিযুক্ত দুই ইউপি চেয়ারম্যানকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। একজন আন্দুলবাড়িয়ার চেয়ারম্যান ও জামায়াতের থানা শুরা সদস্য সাখাওয়াত হোসেন। অন্যজন একই দলের সহযোগী সদস্য ও সীমান্ত ইউপির চেয়ারম্যান আবদুল হান্নান। শাখাওয়াত হোসেন দাবি করেন, ঘটনার দিন তিনি উপজেলা পরিষদ চত্বরে দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভায় উপস্থিত ছিলেন। হান্নান বলেন, তিনি সরাসরি কোনো রাজনীতি করেন না।

দিনাজপুর: খানসামা উপজেলার ভেড়ভেড়ি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও উপজেলা জামায়াতের আমির কারি আবদুল হক সিরাজী, চিরিরবন্দর উপজেলার নশরতপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও থানা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক নূরে আলম সিদ্দিক এবং ঘোড়াঘাট উপজেলার একটি ইউনিয়নের জামায়াতের নেতা আজিজারকে বরখাস্ত করা হয়েছে। নূরে আলম সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে সাতটি মামলা হয়েছে। প্রতিটি মামলায় তিনি প্রধান আসামি। ঘোড়াঘাট উপজেলার পালশা ইউনিয়নের সদস্য আজিজার রহমানের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে বিভ্রান্তি রয়েছে। ঘোড়াঘাট উপজেলা বিএনপির সভাপতি শামীম চৌধুরী বলেন, তিনি ইউনিয়ন বিএনপির সহসভাপতি। ওই ইউনিয়নের অপর ইউপি সদস্য মুশফিকুর রহমান বলেন, আজিজার রহমান আসলে জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতির সঙ্গে জড়িত।

খুলনা: ফুলতলা, কয়রা, ডুমুরিয়ার ছয়জন জনপ্রতিনিধিকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। বাগালি ইউপির চেয়ারম্যান মো. ওলিউল্লাহ আগে কয়রা উপজেলার জামায়াতের আমির ছিলেন, এখন সমর্থক। এ ছাড়া ভাঙচুরের ঘটনায় পরোক্ষভাবে মো. ওলিউল্লাহ ও বেদকাশি ইউপির সদস্য আবদুর রশিদও জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে ওলিউল্লাহর দাবি, ওই ঘটনায় তাঁকে ফাঁসানো হয়েছে।

বরখাস্তের তালিকায় আরও আছেন ফুলতলা ইউপির চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শেখ আবুল বাসার, ইউপি সদস্য ও জামায়াতের স্থানীয় আমির আলী আকবর মোড়ল, ধামালিয়া ইউপির চেয়ারম্যান আবু জাফর প্রমুখ।

যশোর: বরখাস্ত হওয়া যশোরের পাঁচ ইউপি চেয়ারম্যান ও সদস্য জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। বসুন্দিয়া ইউপির চেয়ারম্যান আবু বকর খান জামায়াতের সমর্থক। তাঁর বিরুদ্ধে সহিংসতায় ইন্ধন দেওয়ার অভিযোগে রয়েছে। আবু বকর খান বলেন, ‘এলাকায় তেমন সহিংসতার ঘটনা ঘটেনি। কী করে বরখাস্ত হলাম আমার জানা নেই।’ বরখাস্ত হওয়া সদর উপজেলার নরেন্দ্রপুর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আমিনুর রহমান জামায়াতের ইউনিয়ন কমিটির সভাপতি। এ ছাড়া ভোজগাতি ইউপি চেয়ারম্যান হুমায়ুন কবির মুক্তা, হরিদাসকাটির সদস্য আনিছুর রহমান ও চৌগাছার সিংহঝুলি ইউপির সদস্য মাঈনুদ্দিন দফাদারকেও বরখাস্ত করা হয়েছে। তাঁরা সবাই জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে জানা গেছে।

এ ব্যাপারে যশোর জেলা জামায়াতের আমির আবদুর রশিদ বলেন, পাঁচজনের মধ্যে আমিনুর রহমান জামায়াতের ইউনিয়ন কমিটির সভাপতি। অন্যরা কোনো পদে নেই। তবে সবাই সমর্থক পর্যায়ে রয়েছেন।

(প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ, জয়পুরহাট, পিরোজপুর, চুয়াডাঙ্গা, খুলনা, দিনাজপুর, গাইবান্ধা ও যশোর প্রতিনিধি)