শ্রম মন্ত্রণালয়ের তদন্ত প্রতিবেদন: ধসের জন্য দায়ী ২৪ জন

757

রোজিনা ইসলাম |  জুন ০৯, ২০১৩

সাভারে রানা প্লাজা ধসের জন্য ২৪ জনকে সুনির্দিষ্টভাবে দায়ী করেছে শ্রম মন্ত্রণালয়ের গঠিত তদন্ত কমিটি। তাঁরা হলেন শ্রম মন্ত্রণালয়ের কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন দপ্তরের আট কর্মকর্তা, সাভার পৌরসভার মেয়রসহ ১০ কর্মকর্তা এবং ভবনের দুই ও পোশাক কারখানার চার মালিক। শ্রম মন্ত্রণালয় তাঁদের আট কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্তের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

পাশাপাশি বড় ধরনের এই বিপর্যয় ও হতাহতের জন্য রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) কোনোভাবেই দায় এড়াতে পারে না বলে মত দিয়েছে তদন্ত কমিটি।

তদন্ত কমিটির প্রধান ও শ্রম পরিদপ্তরের পরিচালক খুরশিদুল আলম গত ২৭ মে প্রতিবেদনটি শ্রম মন্ত্রণালয়ের সচিব মিকাইল শিপারের কাছে জমা দেন। এর আগে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও এ ঘটনায় তদন্ত করে একটি প্রতিবেদন দেয়। তাতে রানা প্লাজা ও সেখানকার পোশাক কারখানার মালিকসহ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের দায়ী করা হয়েছিল।

নয়তলা রানা প্লাজা ধসে পড়ে গত ২৪ এপ্রিল। এই ভবনে পাঁচটি তৈরি পোশাক কারখানা ছিল। ভবনধসে এ পর্যন্ত এক হাজার ১৩০ জন নিহত হয়েছেন।

শিল্প মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি জানিয়েছে, রানা প্লাজায় ফাটল ধরার বিষয়টি ঘটনার আগের দিন গণমাধ্যমে প্রচার হওয়ার পরও কারখানা বন্ধ করার জন্য কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় সংশ্লিষ্ট সবাই বড় ধরনের অপরাধ করেছেন। নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানকে এ অপরাধের জন্য দায়ী কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বিরুদ্ধে বিধিমোতাবেক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে তদন্ত কমিটি। উচ্চপর্যায়ের এই কমিটির মূল দায়িত্ব ছিল দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত এবং এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় সুপারিশ করা। প্রতিবেদন বিষয়ে জানতে চাইলে মিকাইল শিপার প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রতিবেদনটি গত সপ্তাহে জমা হলেও এই কয়েক দিন আমরা এটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছি। তদন্ত কমিটির সুপারিশে শ্রম মন্ত্রণালয়ের যে আট কর্মকর্তাকে দায়ী করা হয়েছে তাদের আমরা সাময়িক বরখাস্ত করার নির্দেশ দিয়েছি। এদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থাও নেওয়া হবে।’

কমিটির সদস্যরা জানিয়েছেন, তদন্ত কমিটি ধসে পড়া ভবন, সরেজমিনে পরিদর্শন করে মালামাল পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের লিখিত জবানবন্দি নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করেছে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন পরিদপ্তরের প্রধান পরিদর্শক হাবিবুল ইসলাম, তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএর জ্যেষ্ঠ অতিরিক্ত সচিব মনসুর খালেদ, শ্রম মন্ত্রণালয়ের উপসচিব আব্দুর রহিম ও পোশাক শ্রমিক কর্মচারী ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক কামরুল আহসান।

শ্রম মন্ত্রণালয়ের দায়ী কর্মকর্তা: তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভবনধসের ঘটনার দিন সকালে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পরপর সব জেনারেটর একসঙ্গে চালু হওয়ায় সৃষ্ট কম্পনের (ভাইব্রেশন) ফলে ফাটল ধরা ভবনটি ধসে পড়ে। তদন্তে প্রমাণ হয়েছে, কেবল নিউ ওয়েভ বটমস ও নিউ ওয়েভ স্টাইল লিমিটেড কারখানার লে-আউট পরিকল্পনায় জেনারেটর কক্ষের নকশা ছিল। এই দুটি নকশা অনুমোদনের জন্য সুপারিশ করেছেন ঢাকা বিভাগীয় কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন দপ্তরের পরিদর্শক (প্রকৌশল) ইউসুফ আলী ও সহিদুল ইসলাম। আর এটা অনুমোদন করেছেন তখনকার উপপ্রধান পরিদর্শক (সাধারণ) আব্দুস সামাদ ও টঙ্গীর শ্রম মন্ত্রণালয়ের প্রশিক্ষণকেন্দ্র (আইআরআই) প্রকল্পের পরিচালক বেলায়েত হোসেন। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, এ ধরনের নকশা অনুমোদনের জন্য সুপারিশ করে ও অনুমোদন দিয়ে এ কর্মকর্তারা এত বড় দুর্ঘটনার ক্ষেত্র তৈরি করেছেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৩ সালে পরিদর্শক সহিদুল ইসলাম এবং উপপ্রধান পরিদর্শক (সাধারণ) আমিনুল হক কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া বাণিজ্যিক ভবনে এ ধরনের কারখানার লাইসেন্স নবায়নও করেছেন।

ভবনের চার, পাঁচ ও সাততলায় অবস্থিত কারখানাগুলোর লে-আউটে জেনারেটর স্থাপনের ব্যবস্থা ছিল না। তার পরও এসব তলায় জেনারেটর বসানো হয়। এ ক্ষেত্রে দায়িত্ব পালনে গাফিলতির জন্য তদন্ত কমিটি শ্রম মন্ত্রণালয়ের আরও যাঁদের দায়ী করেছে তাঁরা হলেন ঢাকা বিভাগীয় কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান দপ্তরের যুগ্ম শ্রম পরিচালক এম এ জামশেদুর রহমান, উপপ্রধান পরিদর্শক আমিনুল হক, সহকারী পরিদর্শক শেখ আসাদুজ্জামান ও শ্রম পরিদর্শক মাহমুদুল হক।

এই কর্মকর্তারা ২০০৬ সালের শ্রম আইনের ৬১, ৮৫, ৩১৯ ও ৩২৬ ধারা, ১৯৭৯ সালের বিধিমালার ৩, ৪, ৫ এবং ৩৮ ধারা অব্যাহতভাবে লঙ্ঘন করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। বিশেষ করে তৃতীয় তলায় ফাটল ধরার বিষয়টি গুরুত্বসহকারে গণমাধ্যমে প্রচার হওয়ার পরও ঢাকা বিভাগীয় কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন দপ্তর ভবনের কারখানা বন্ধে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে বড় ধরনের অপরাধ করেছে।

সাভারের বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের দায়িত্বহীনতা: ফাটলের ঘটনা জানার পর ভবন বন্ধের কোনো কার্যক্রম গ্রহণ না করায় সাভার পৌরসভা কর্তৃপক্ষকে দায়ী করা হয়েছে। কমিটি জানিয়েছে, বিধিবহির্ভূতভাবে রানা প্লাজার লে-আউট অনুমোদন, বিধিবহির্ভূতভাবে নকশায় ১০ তলার অনুমতি দেন সাভার পৌরসভার তৎকালীন চেয়ারম্যান রেফাত উল্লাহ, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সোহরাব হোসেন ও উত্তম কুমার, নির্বাহী প্রকৌশলী তরিকুল হক ও রফিকুল ইসলাম, সহকারী প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমান, শহর পরিকল্পনাবিধ ফারজানা ইসলাম, উপসহকারী প্রকৌশলী রফিকুল হাসান রাসেল, নকশাবিধ শফিকুল ইসলাম এবং সার্ভেয়ার ইসমাইল।

তাঁদের সবার বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বরাবরে সুপারিশ করেছে তদন্ত কমিটি।

অবৈধভাবে ভবন নির্মাণ ও গাফিলতি: প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভবনের মালিক আবদুল খালেক ও তাঁর ছেলে সোহেল রানা অবৈধভাবে এ ভবন নির্মাণ করেছেন। বাণিজ্যিক ভবনে শিল্প কলকারখানা স্থাপনের জন্য ভাড়া দিয়েছেন। ভবনের ফাটলের ঘটনা জানার পরও কারখানা বন্ধের ব্যবস্থা নেননি।

পাশাপাশি পোশাক কারখানার মালিকেরা ভবনের ব্যবহারের উপযোগিতা নিশ্চিত না হয়ে এবং বিজিএমইএর সেফটি সেলের নির্দেশ অমান্য করে শ্রমিক-কর্মচারী এবং কর্মকর্তাদের শিল্প কারখানায় কাজ করার জন্য বাধ্য করেন। এই মালিকেরা হলেন নিউ ওয়েভ বটমস লিমিটেডের চেয়ারম্যান বজলুস সামাদ; ফেনটম অ্যাপারেলস ও ফেনটম টেক লিমিটেডের চেয়ারম্যান আমিনুল ইসলাম; ইথার টেকস লিমিটেডের চেয়ারম্যান আনিসুর রহমান এবং নিউ ওয়েভ স্টাইলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মনির হোসেন। হতাহত ব্যক্তিদের জন্য কমিটি কারখানার এই মালিকদেরও দায়ী করেছে।

দায় এড়াতে পারে না রাজউকও: গত ২৩ এপ্রিল ফাটল ধরার পরও ভবন বন্ধের কোনো ব্যবস্থা নেয়নি রাজউক। অথচ গত ২৪ এপ্রিল ঘটনার পর রাজউক ইমারত আইন ১৯৫২ এর ১২ ধারায় রানা প্লাজার মালিক সোহেল রানার বিরুদ্ধে এজাহার দায়ের করে। ফলে এই মর্মান্তিক ঘটনার জন্য রাজউক অনেকাংশে দায়ী বলে মনে করে কমিটি।