সৌদি আরবে যাওয়া নিয়ে প্রশাসনে অসন্তোষ

595

রোজিনা ইসলাম | জুন ০৫, ২০১৩

সৌদি আরবে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের কাজে সহযোগিতার জন্য বাংলাদেশ থেকে ১৫০ কর্মকর্তা-কর্মচারী পাঠানো নিয়ে প্রশাসনে তীব্র অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। যাঁরা সৌদি আরবে যেতে পারেননি বা যাঁদের নাম তালিকায় আসেনি, তাঁদের কেউ কেউ সংশ্লিষ্ট প্রধানের কাছে লিখিত অভিযোগও করেছেন। অনেক কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, মুখ চেনা, তদবিরবাজ ও কিছু অদক্ষ কর্মকর্তাকে এ কাজের জন্য নির্বাচিত করে পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ব্যক্তিগত কর্মকর্তা থেকে উপসচিব পর্যায়ের প্রায় ১৫০ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে সৌদি আরবে পাঠানোর প্রক্রিয়া গত সোমবার শুরু হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দুজন উপসচিব ও দুজন জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব এবং পাসপোর্ট অফিসের চারজন সহকারী পরিচালক গতকাল পাঠানো ২৮ জনের দলটিকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়ে প্রথম ফ্লাইট যাওয়ার পরই ক্ষোভ প্রকাশ্যে চলে এসেছে। প্রশাসনের বিভিন্ন পদের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিজস্ব সমিতি বা সংগঠন এ বিষয়ে বৈঠক করেছে বলেও জানা গেছে।

সৌদি আরবে দীর্ঘদিন ধরে তিন থেকে চার লাখ বাংলাদেশি শ্রমিক অবৈধভাবে অবস্থান করছেন। গত এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহে সৌদি সরকার সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে তাঁদের তিন মাসের মধ্যে বৈধ হওয়ার সুযোগ দেয়। এর জন্য তাঁদের বৈধ পাসপোর্টধারী হতে হবে মর্মে শর্ত দেওয়া হয়। আগামী ৩ জুলাইয়ের মধ্যে পাসপোর্ট দেখিয়ে অবৈধ শ্রমিকদের বৈধ হতে হবে। এত অল্প সময়ে এত বিপুলসংখ্যক শ্রমিকের পক্ষে দেশে এসে নতুন পাসপোর্ট বানিয়ে আবার সেখানে গিয়ে বৈধ হওয়া সম্ভব নয়। এ কারণে সৌদি আরবে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস থেকেই শ্রমিকদের পাসপোর্ট ইস্যু করার সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু অবৈধ শ্রমিকের সংখ্যা অনেক বেশি হওয়ায় এবং হাতে সময় কম থাকায় দূতাবাসের নির্দিষ্টসংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারীর পক্ষে এত পাসপোর্ট ইস্যু করা সম্ভব নয়। এ জন্য সহকারী সচিব, সিনিয়র সহকারী সচিব ও সমমর্যাদার ৫০ জন কর্মকর্তা এবং দ্বিতীয় শ্রেণীর ১০০ জন কর্মকর্তা সেখানে পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়। অর্থ, জনপ্রশাসন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে জানান, যাঁরা সৌদি আরবে যাবেন, তাঁরা প্রত্যেকেই এক মাসের জন্য ১০ লাখের ওপরে টাকা পাবেন। ফলে এ ক্ষেত্রে স্বজনপ্রীতি ও অনিয়ম তো হয়েছেই, কিছু কিছু ক্ষেত্রে টাকাপয়সার লেনদেনও হয়েছে বলে দাবি তাঁদের। সূত্রগুলো জানায়, যাঁরা পাসপোর্টের কাজ করেছেন এবং কম্পিউটারে দক্ষ, তাঁদেরই সৌদি আরবে যাওয়ার কথা। কিন্তু মনোনীত ব্যক্তিদের বড় অংশ মন্ত্রী, সচিবের দপ্তর ও প্রশাসন শাখার কর্মকর্তা-কর্মচারী। পাসপোর্ট অফিসের একজন পরিচালক জানান, পাসপোর্ট অফিস থেকে ২৮ জনের নাম নেওয়া হলেও মাত্র ১৪ জনকে নেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে চার লাখ হাতে লেখা পাসপোর্ট সৌদি আরবে পাঠানো হয়েছে। তিনি জানান, সৌদি আরবে এ কাজের জন্য প্রত্যেক কর্মকর্তাকে প্রতিদিন ১৬৫ ডলার ও প্রত্যেক কর্মচারীকে ১৩২ ডলার দেওয়া হবে। তাই বাড়তি টাকা আয়ের আশায় সবাই সৌদি আরবে যেতে তদবির করছেন। এ কাজে দক্ষ ব্যক্তিদের না পাঠিয়ে যাঁদের খুঁটির জোর বেশি ও মন্ত্রণালয়ে পরিচিতি বেশি, তাঁদের পাঠানো হয়েছে। পাসপোর্ট অফিসের একজন যা কাজ করতে পারেন, তাঁদের পাঁচজন কর্মকর্তা-কর্মচারী সেই কাজ করতে পারবেন না। এর ফলে বেশির ভাগ পাসপোর্টে ভুল হবে এবং তা ফেরত আসবে। এতে ভোগান্তিতে পড়তে হবে শ্রমিকদের। বিষয়টি বিবেচনার এখনো সময় আছে বলে মনে করেন তিনি।

তবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন যুগ্ম সচিব প্রথম আলোকে বলেন, এ কাজের জন্য তেমন কোনো অভিজ্ঞতার প্রয়োজন নেই। বিচার-বিবেচনা করে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। যাঁরা যেতে পারেননি, তাঁদের তো ক্ষোভ থাকবেই। তিনি বলেন, প্রথম দিকে তো অনেকেই যেতে চাননি, যখন শুনেছেন ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা পাবেন, তখনই সবাই আগ্রহী হয়েছেন।

সূত্র জানায়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ৯৫ জন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে ৪৫ জন কর্মকর্তার তালিকা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। এ প্রক্রিয়ায় প্রতিটি মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়ে দুজন করে ক্যাডার এবং তিনজন করে নন-ক্যাডার কর্মকর্তার নামের তালিকা চাওয়া হয়েছিল। ওই তালিকা থেকে মনোনয়ন তালিকা চূড়ান্ত করা হয়।

সূত্র আরও জানায়, পাসপোর্ট সরবরাহের এ কাজে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে যে টাকা বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে, তাতে দেড় শ কর্মকর্তার প্রত্যেকে জনপ্রতি প্রায় ১০ লাখ টাকার ওপরে পাবেন। ইতিমধ্যে প্রায় তিন কোটি টাকা ছাড় করা হয়েছে। আরও বরাদ্দ দেওয়া হবে। এই টাকার মধ্যে তাঁদের সেখানে থাকা ও খাওয়ার খরচ বহন করতে হবে। সব খরচ বাদ দিলেও প্রত্যেকের হাতে পাঁচ থেকে ছয় লাখ টাকা থাকবে বলে কর্মকর্তারা জানান।