প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ: ৩০ জনপ্রতিনিধি বরখাস্ত, বরাদ্দ বন্ধ ১১২ ইউনিয়নে

679

রোজিনা ইসলাম |  মে ২৯, ২০১৩

স্থানীয় সরকার সহায়তা প্রকল্পের (এলজিএসপি) অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে দেশের ৩০ জনপ্রতিনিধিকে বরখাস্ত করা হয়েছে। ক্ষমতার অপব্যবহার করে বিভিন্ন সময়ে জনপ্রতিনিধিরা এই প্রকল্প থেকে প্রায় দুই কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন।এ ছাড়া নিরীক্ষা প্রতিবেদনে ১২২টি ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ পাওয়ায় আপাতত এসব ইউনিয়নে কোনো ধরনের বরাদ্দ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সবার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) চিঠিও পাঠানো হয়েছে।২১ মে স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে টাকা আত্মসাৎসহ বিভিন্ন অভিযোগ এনে এ-সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে ইউনিয়ন পরিষদের ১৭ জন চেয়ারম্যান ও ১৩ জন সদস্যের বিরুদ্ধে অসদাচরণ, নিয়মবহির্ভূত কাজ, গম আত্মসাৎ, গাছ বিক্রির টাকা কোষাগারে জমা না দেওয়া, স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা নির্মাণের অর্থ আত্মসাৎ এবং জাতীয়তা, জন্মনিবন্ধন, ওয়ারিশ সনদ ইত্যাদি দেওয়ার ক্ষেত্রে বাড়তি টাকা আদায়সহ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।এ বিষয়ে স্থানীয় সরকারসচিব আবু আলম মো. শহীদ খান গতকাল মঙ্গলবার প্রথম আলোকে বলেন, ব্যবস্থা নেওয়া হলেও অনেকেই আদালতের নিষেধাজ্ঞা এনে স্বপদে বহাল থাকার চেষ্টা করছেন। তবে দুর্নীতিবাজ হিসেবে পরিচিতি পাওয়ায় তাঁরা আর গণমানুষের কাছে বিশ্বস্ত হতে পারবেন না।

স্থানীয় সরকার বিভাগ অভিযোগ এনেছে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের চিওড়া ইউপি চেয়ারম্যান আবু তাহেরের বিরুদ্ধে। চিওড়া ইউনিয়নে এলজিএসপির অধীনে ১৮টি প্রকল্পে ১২ লাখ ১৯ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। ওই সব প্রকল্পের ‘কাজ হয়েছে’ জানিয়ে চেয়ারম্যান আট সদস্যের কাছ থেকে সই নেন। এতে ক্ষুব্ধ ইউপি সদস্যরা চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ও দুদকে লিখিত অভিযোগ করেন। এ নিয়ে গঠিত তদন্ত কমিটি পাঁচ লাখ ৫৯ হাজার টাকা আত্মসাতের প্রমাণ পায়। তবে আবু তাহের তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

যশোরের মনিরামপুর উপজেলার মনোহরপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোস্তফা মহিদুজ্জামানের বিরুদ্ধে আট লাখ ছয় হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগ এনে তাঁকে বরখাস্ত করা হয়েছে। তবে প্রথম আলোকে তিনি বলেন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) চাহিদা অনুযায়ী কমিশনের টাকা দেওয়া হয়নি, ইউনিয়ন তথ্য ও ই-সেবাকেন্দ্রের ফটোকপির যন্ত্র তাঁর মাধ্যমে কেনা হয়নি, এ জন্যই তাঁর বিরুদ্ধে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

নোয়াখালীর সোনাইমুড়ীর সোনাপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান কামরুজ্জামানের বিরুদ্ধে পাঁচ লাখ ৭৪ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগে তাঁকে অপসারণ করা হয়েছে। এ বিষয়ে কামরুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, এলাকায় তাঁকে হেয় করার জন্য প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলের লোকজন ভিত্তিহীন ওই অভিযোগ সাজিয়েছেন।খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলার সুরখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শেখ হেমায়েত আলীর বিরুদ্ধে গাছ বিক্রির টাকা আত্মসাৎসহ পাঁচটি অভিযোগ আনা হয়েছে। তিনি এই অভিযোগ প্রসঙ্গে বলেন, গাছ বিক্রির টাকা তৎকালীন ইউএনও জেলা পরিষদে জমা দিয়েছেন। আর দুদকের তদন্তে গম আত্মসাতের মামলা খারিজ হয়ে গেছে।

সিলেটের বিয়ানীবাজারের দুবাগ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবদুস সালামের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন তাঁরই পরিষদের পাঁচজন সদস্য। তাঁদের অভিযোগ, চেয়ারম্যান আবদুস সালাম নয়াদুবাগ-গুপাট রাস্তার কাজ না করে সাত লাখ দুই হাজার টাকা আত্মসাৎ করেছেন। আর তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে, চেয়ারম্যান পুরো কাজ না করে পে-অর্ডারের মাধ্যমে প্রকল্পের টাকা রেখে দিয়েছেন।

এ বিষয়ে আবদুস সালাম বলেন, ‘অভিজ্ঞতা না থাকায় আমি এই প্রকল্পের কাজ সময়মতো শেষ করতে পারিনি। পরবর্তী সময়ে ইউএনওর পরামর্শে টাকাগুলো পে-অর্ডার করে রেখে দেই।’

কুড়িগ্রামের উলিপুরে দুই ইউপি চেয়ারম্যান ও চার সদস্যকে প্রকল্পের টাকা আত্মসাতের দায়ে অপসারণ এবং তাঁদের পদ শূন্য ঘোষণা করা হয়েছে। তাঁরা হলেন উলিপুর উপজেলার দুর্গাপুর ইউপি চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলাম ও ধামশেনী ইউপি চেয়ারম্যান একরামুল হক, সংরক্ষিত মহিলা সদস্য ফরিদা বেগম ও সুফিয়া বেগম এবং সদস্য আমিনুল ইসলাম ও আ. আজিজ। একরামুল হক জানান, তাঁরা আদালতের আশ্রয় নেবেন।

বগুড়া জেলার ধুনটের চিকাশি ইউনিয়ন পরিষদের দুই সদস্য হাসান আলী ও সুলতান মাহমুদকে প্রকল্পের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে পদ থেকে অপসারণ করা হয়েছে। এই উপজেলার ১০টি ইউনিয়নে এক কোটি ৫৬ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এসব প্রকল্পে ইউপি সদস্যরা কাজ না করে ভুয়া ভাউচারের মাধ্যমে টাকা তুলে নেন। তবে অভিযুক্তরা অর্থ আত্মসাতের সঙ্গে জড়িত নন বলে দাবি করেছেন।

কিশোরগঞ্জের মিঠামইনের ঘোপদীঘি ইউপি চেয়ারম্যান নূরুল হকের বিরুদ্ধেও প্রায় আট লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। নূরুল হক জানান, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে মিথ্যা তদন্ত প্রতিবেদন করানো হয়েছে।

বরখাস্তের তালিকায় চেয়ারম্যানদের মধ্যে আরও আছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরের বড়িকান্দির মো. শাহজাহান, টেকনাফের বাহারছড়ার হাবিব উল্লাহ, সাতক্ষীরার বড়দলের আজিজুল ইসলাম, রাঙামাটির বনযোগীছড়ার সন্তোষ বিকাশ, নাটোরের সুকাশের আজহারুল ইসলাম, নওগাঁর ইয়াদ আলী মণ্ডল। ইউপি সদস্যদের মধ্যে আছেন লালমনিরহাটের গোতামারীর আমিনুর রহমান, আতিয়ার রহমান, সন্ধ্যা রানী এবং গোপালগঞ্জের উরফী ইউপি সদস্য কামরুল সরদার।

(প্রতিবেদন তৈরিতে কুমিল্লা, যশোর, নোয়াখালী, খুলনা, সিলেট, কুড়িগ্রাম, বগুড়া এবং কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধিরা সহায়তা করেছেন।)