রানা ও পোশাক কারখানার মালিকেরা দায়ী

505

সাভারে ভবনধস: তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন

রোজিনা ইসলাম |  মে ২৭, ২০১৩

সাভারে রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় ভবনের মালিক সোহেল রানাসহ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও পোশাক কারখানার মালিকদের সরাসরি দায়ী করেছে সরকার গঠিত তদন্ত কমিটি।বড় ধরনের এই শিল্প বিপর্যয়ের জন্য এঁদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩০৪ ধারায় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। এ ছাড়া এ ভবন নির্মাণে বিভিন্ন পর্যায়ে যাঁরা সহায়তা করেছেন, তাঁদের বিরুদ্ধেও একই ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।গতকাল রোববার স্বরাষ্ট্রসচিব সি কিউ কে মুসতাক আহমেদের কাছে এই প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়। তদন্ত কমিটির প্রধান মাইনুদ্দিন খন্দকার ও সদস্যসচিব সাঈদ মাহমুদ বেলাল হায়দার ৫৬১ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনের সঙ্গে দুটি ভিডিও জমা দেন।প্রতিবেদনে সাতটি মতামত ও ১৫টি সুপারিশ করা হয়েছে। কমিটি ভবনধসে এত মৃত্যুর কারণ হিসেবে নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহার, ভবন নির্মাণে ইমারত বিধিমালা না মানা, বিপণিবিতানের ওপর কারখানা স্থাপন, ভবনের উপরে ঝাঁকুনি উৎপাদনকারী ভারী যন্ত্রপাতি স্থাপন এবং ভবনে ফাটল ধরা পড়ার পরও শ্রমিকদের কর্মক্ষেত্রে প্রবেশে বাধ্য করার কথা বলা হয়েছে।নয়তলা রানা প্লাজা ধসে পড়ে গত ২৪ এপ্রিল। এই ভবনে পাঁচটি তৈরি পোশাক কারখানা ছিল। ভবন ধসের ঘটনায় এক হাজার ১২৯ জন নিহত হয়েছেন।তদন্ত কমিটির প্রধান স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মাইনউদ্দিন খন্দকার প্রথম আলোকে বলেন, তদন্ত কমিটি ধসে পড়া ভবন, সরেজমিনে পরিদর্শন করে মালামাল পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের লিখিত জবানবন্দি নিয়ে এ প্রতিবেদন তৈরি করেছে।কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন আশুলিয়া শিল্পাঞ্চল পুলিশের পরিচালক মো. সায়েদুর রহমান, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের পরিচালক (প্রশাসন) এম আবদুস সালাম, ঢাকার পুলিশ সুপার হাবিবুর রহমান, স্থাপত্য অধিদপ্তরের সহকারী প্রধান স্থপতি শাহনেওয়াজ মাসুদ ও ঢাকার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক জিল্লুর রহমান।

ভবন ধসের কারণ: তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রানা প্লাজা নির্মাণের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের নিয়মনীতি অনুসরণ করা হয়নি। নির্মাণের ক্ষেত্রে ইমারত বিধিমালা যথাযথভাবে মানা হয়নি। বিশাল এ ভবনের একটি অংশের মাটি ছিল শক্ত এবং অন্য অংশের মাটির নিচে জলাশয় ছিল। জলাশয় ভরাট করে ভবনটি নির্মাণ করা হয়েছে। ভবনটি নির্মাণের ক্ষেত্রে যেমন নকশা অনুসরণ করা হয়নি, তেমনি নির্মাণ উপকরণ ছিল নিম্নমানের। বাণিজ্যিক ভবন হিসেবে এটা নির্মাণ করা হয়েছিল। প্রথমে ছয়তলা বিশিষ্ট বাণিজ্যিক ভবনের নকশা অনুমোদন করা হয়েছিল। পরে সাভার পৌর কর্তৃপক্ষ ওই ছয়তলা নকশায় ১০ তলার অনুমতি দেয়। ভবনটির প্রতিটি তলায় ভারী যন্ত্রপাতি ও একাধিক জেনারেটর স্থাপন করা হয়। এটি বাণিজ্যিক ভবন হওয়ায় রাত সাড়ে আটটার মধ্যে পাঁচটি কারখানার বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যেত। ফলে সারা রাত জেনারেটর চলত। এত ঝাঁকুনি ধারন করার ক্ষমতা ভবনটির ছিল না।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, রানা প্লাজা ধস ছিল মূলত ‘প্যানকেক কলাপ্সড’। এ ক্ষেত্রে একটি ফ্লোর আরেকটি ফ্লোরের ওপর ভার্টিকালি (খাড়াভাবে) বিধ্বস্ত হয়ে মিশে যায়। রানা প্লাজার তৃতীয় থেকে অষ্টম তলা পর্যন্ত পাঁচটি পোশাক কারখানা ছিল।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, রানার বাবা আবদুল খালেক জবানবন্দিতে জানান, ভবনটি নির্মাণে চুক্তিবদ্ধ নির্মাতাপ্রতিষ্ঠান তন্ময় হাউজিং দ্বিতীয়তলা পর্যন্ত কাজ করে চলে যায়। ফ্ল্যাট অগ্রিম ভাড়া না পাওয়ার কারণে নির্মাতাপ্রতিষ্ঠান চলে যায় তিনি জানিয়েছেন। এরপর মারুফ নামের একজন ডিপ্লোমা প্রকৌশলী তৃতীয় তলা পর্যন্ত তৈরি করেন। মারুফও চলে গেলে ছরোয়ার নামের একজন ডিপ্লোমা প্রকৌশলী ভবনটি নির্মাণ করেন।

ঘটনার দায় দায়িত্ব: তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, সোহেল রানাসহ অন্যদের বক্তব্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, শ্রমিকেরা কর্মরত অবস্থায় রানা প্লাজার ফাটল দেখেন এবং আতঙ্কিত হয়ে কারখানা থেকে একযোগে বেরিয়ে যান। ওই ভবনে ব্যাংকের একটি শাখা বন্ধ করে দেওয়া হলেও বিকেলে ভবনটিতে মিলাদ-মাহফিলের আয়োজন করেন পোশাক কারখানার মালিকেরা। একইদিন উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও), শিল্প পুলিশ ভবনের প্রকৌশলী এবং সোহেল রানা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ নয় বলে অভিমত দেন। ফাটল ধরার পরও কারখানা খোলা থাকায় শ্রমিকেরা ২৪ এপ্রিল কাজে যোগ দেন এবং সোহেল রানা উপস্থিত থেকে কারখানা খোলা রাখার বিষয়টি তদারক করেন। এ সময় ধসের ঘটনা ঘটে।

মতামত: রানা প্লাজার জমি বিক্রি করার ব্যাপারে মতামত দিয়েছে তদন্ত কমিটি। কমিটি জানিয়েছে, এ জমি বিক্রি করে যে টাকা পাওয়া যাবে, তা সমন্বয় করে আক্রান্তদের সহায়তা করা হোক।

সুপারিশ: কমিটির সুপারিশে সব তৈরি পোশাক কারখানা নিবিড় জরিপ করে কারখানার ঝুঁকির মাত্রা শনাক্ত করে প্রতিটি ভবনের ক্ষেত্রে ব্যবস্থাপত্র দৃশ্যমান স্থানে টানিয়ে রাখার কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া বিপজ্জনক ভবন পুনঃনির্মাণ না করা পর্যন্ত তা বেআইনি ভবন ঘোষণা, কারখানায় কাজের পরিবেশ তৈরি করা, জাতীয় ইমারত নীতিমালা মানতে বাধ্য করার কথা বলা হয়েছে সুপারিশে।