খুনের দায়ে সাজাপ্রাপ্তরা রাষ্ট্রপতির ক্ষমা চান

824

তালিকায় চট্টগ্রামের শিল্পপতির ছেলে, লক্ষ্মীপুরের তাহেরের পালকপুত্র ও ধর্ম প্রতিমন্ত্রীর আত্মীয়

রোজিনা ইসলাম | মে ২৪, ২০১৩

ভারতীয় নাগরিক জিবরান তায়েবি হত্যা মামলায় যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামি ইয়াসিন রহমান ওরফে টিটুর সাজা মওকুফের জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে আবেদন করা হয়েছে। ইয়াসিন চট্টগ্রামের কেডিএস গ্রুপের মালিক খলিলুর রহমানের ছেলে।

এ ছাড়া হত্যা মামলায় সাজাপ্রাপ্ত আওয়ামী লীগের লক্ষ্মীপুরের নেতা ও পৌর মেয়র আবু তাহেরের পালক ছেলে এবং পটুয়াখালীর দুই সহোদরের পরিবার রাষ্ট্রপতির ক্ষমার জন্য আবেদন করেছে। এঁরা যাবজ্জীবন (৩০ বছর) সাজাপ্রাপ্ত এবং বর্তমানে কারাগারে আছেন।

পটুয়াখালীর দুই সহোদর কালা মৃধা ও জাকির মৃধা ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শাহজাহান মিয়ার আত্মীয়। তিনি এঁদের সাজা মওকুফের আবেদনে সুপারিশও করেছেন।

১৯৯৯ সালের ৯ জুন চট্টগ্রামে জিবরান তায়েবি হত্যাকাণ্ড ঘটে। গত বছরের ১ আগস্ট আপিল বিভাগ ইয়াসিন রহমানের বিরুদ্ধে হাইকোর্টের দেওয়া সাজা বহাল রাখেন।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নথিপত্র থেকে জানা গেছে, ইয়াসিন ২০১১ সালের ১০ অক্টোবর যুক্তরাজ্য থেকে এসে আদালতে আত্মসমর্পণ করেন। ওই দিনই তাঁকে চট্টগ্রাম কারাগারে পাঠানো হয়। প্রায় দুই বছর ধরে তিনি কারাগারে আছেন।

ইয়াসিনের সাজা মওকুফের বিষয়ে আইন মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো মতামতে বলা হয়েছে, আসামি দণ্ডাদেশের সংবাদ পেয়ে ইংল্যান্ড থেকে দেশে ফিরে স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণ করেছেন। সংবিধানের ৪৯ অনুচ্ছেদ অনুসারে রাষ্ট্রপতি কোনো আদালত, ট্রাইব্যুনাল বা অন্য কোনো কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যেকোনো দণ্ডের মার্জনা, বিলম্বন ও বিরাম মঞ্জুর করতে এবং যেকোনো দণ্ড মওকুফ, স্থগিত বা কমাতে পারেন। রাষ্ট্রপতি ইচ্ছা করলে এই সাংবিধানিক ক্ষমতা বর্তমান ক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে পারেন।

মন্ত্রণালয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ইয়াসিনের ক্ষমার আবেদন প্রক্রিয়াধীন আছে এবং এটি অনেক দূর এগিয়েছে।ইয়াসিন আত্মসমর্পণের পর অসুস্থতার অজুহাতে এক বছর আড়াই মাস হাসপাতালে ছিলেন। এ নিয়ে গত ১৮ জানুয়ারি প্রথম আলোয় প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে পরদিনই তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাঁকে গুরুত্বপূর্ণ বন্দীর (ডিভিশন) মর্যাদা দিয়েছে।জাহাজ ব্যবসার প্রতিষ্ঠান সেন্ট্রান্স মেরিটাইম (বিডি) লিমিটেডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তা টি এ খানের একমাত্র ছেলে জিবরান তায়েবি হত্যা মামলায় ১৯৯৯ সালের ২২ নভেম্বর আটজনকে আসামি করে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ। ২০০২ সালের ১২ আগস্ট চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ আদালত আসামি ইয়াসিনকে বেকসুর খালাস দিয়ে অন্য ছয়জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেন। রাষ্ট্রপক্ষ এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করলে উচ্চ আদালত ২০০৭ সালের ২৮ মার্চ ইয়াসিনকে যাবজ্জীবন সাজা দিয়ে মামলার আরেক আসামি মোহাম্মদ ছিদ্দিককে বেকসুর খালাস দেন। ঘটনার পর থেকে হাইকোর্টের রায় ঘোষণা পর্যন্ত প্রায় ১২ বছর বিদেশে পলাতক ছিলেন ইয়াসিন।


তাহেরের পালক ছেলে আবদুল জব্বার: 
লক্ষ্মীপুর পৌরসভার মেয়র তাহেরের পালক ছেলে আবদুল জব্বারের (লাভু) ২০ বছর সাজা মাফ করেছিলেন প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান। বাকি ১০ বছরের সাজা মাফ করার জন্য এবার নতুন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের কাছে আবেদন করা হয়েছে। এর আগে তাহেরের আরেক ছেলে এ এইচ এম বিপ্লবের মৃত্যুদণ্ড মাফ করা হয়েছিল। আরও দুটি খুনের দায়ে বিপ্লবকে দেওয়া যাবজ্জীবন সাজা কমিয়ে ১০ বছর করেছিলেন রাষ্ট্রপতি।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, লক্ষ্মীপুরের এ এস এম মহসিন হত্যা মামলায় জব্বারের যাবজ্জীবন সাজা হয়েছিল। তাঁর সাজা মওকুফের জন্য ২০১১ সালে রাষ্ট্রপতির কাছে আবেদন করা হয়। প্রথম দফায় ওই বছরের ১৫ জুন রাষ্ট্রপতি আবেদন নামঞ্জুর করেন। এরপর আবার আবেদন করা হলে রাষ্ট্রপতি ২০১২ সালের ১৯ জানুয়ারি জব্বারের যাবজ্জীবন দণ্ড হ্রাস করে ১০ বছর করেন।

জব্বারের অবশিষ্ট সাজাও মওকুফ করার জন্য তাঁর মা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির কাছে আবেদন করেছেন। ৬ মে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর এ-সংক্রান্ত নথি উত্থাপনের জন্য মন্ত্রণালয়ের সচিব সি কিউ কে মুসতাক আহমেদকে নির্দেশ দেন।

জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর প্রথম আলোকে বলেন, ‘রাষ্ট্রের কাছে যে কেউ ক্ষমা চেয়ে আবেদন করতে পারেন। আমরা রাষ্ট্রপতির কাছে বিধি মোতাবেক সেই আবেদন পৌঁছে দেব। সংবিধান অনুযায়ী ক্ষমা করার ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির। তিনি এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেবেন।’স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, জব্বারের মা সালেহা বেগম ২০১২ সালের মে মাসে তাঁর ছেলের অবশিষ্ট সাজা মাফের জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে আবেদন করেন। আবেদনে জব্বারকে ‘অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র’ হিসেবে দাবি করা হয়। ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত বলেই তাঁর ছেলেকে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে মামলায় জড়ানো হয়েছে বলেও দাবি করা হয় আবেদনে। ‘ছেলের উচ্চ শিক্ষাজীবনের কথা বিবেচনা করে’ অবশিষ্ট সাজা মাফ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার সুযোগ দেওয়ার আবেদন জানান তাহেরের স্ত্রী।

বিধি মোতাবেক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য আবেদনটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। প্রায় এক বছর এ বিষয়ে কোনো তৎপরতা না থাকলেও সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নথিটি উত্থাপন করে।

সূত্র জানায়, গত বছরের ২৪ জুলাই কারা অধিদপ্তর থেকে পাঠানো বিবরণীতে বলা হয়, আবদুল জব্বার লক্ষ্মীপুর জেলা কারাগারে সাজা ভোগ করছেন। তাঁর বয়স ৩৪ বছর। তিনি রেয়াতসহ মোট তিন বছর ২৪ দিন সাজা ভোগ করেছেন। তাঁর সাজার মেয়াদ আরও ছয় বছর ১১ মাস ছয় দিন অবশিষ্ট রয়েছে।

জানতে চাইলে নিহত মহসিনের বাবা আমিন উল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, এই খুনিকে আবারও ক্ষমা করা হলে তাঁরা আরও খুনখারাবিতে উৎসাহিত হবেন। ৮৫ বছরের এই বৃদ্ধ কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘ছেলের খুনিদের শাস্তি দেখে মরতে চেয়েছিলাম। এখন দেখছি খুনিরা একে একে সব ক্ষমা পেয়ে যাচ্ছে।’

জব্বারের আরও মামলা প্রত্যাহার: শিবিরের নেতা মো. কামাল হোসেন ও শিবিরের কর্মী আহম্মদ যায়েদ হত্যা মামলা থেকে ‘রাজনৈতিক বিবেচনায় হয়রানি’র অভিযোগে আবদুল জব্বার লাভুর নাম প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। দারুল আমান একাডেমী ও এতিমখানা পুড়িয়ে দেওয়ার মামলা থেকেও একই বিবেচনায় তাঁর নাম প্রত্যাহার করা হয়। বিএনপির কর্মী কামাল উদ্দিন হত্যা মামলায় জব্বারের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়। কিন্তু রাজনৈতিক বিবেচনায় ওই মামলাও পরে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়।

ছাত্রদলের কর্মী ফিরোজ উদ্দিন হত্যা মামলারও আসামি জব্বার। এই মামলা আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।

কালা মৃধা ও জাকির মৃধা: জহিরুল ইসলাম ওরফে জহির মৃধাকে হত্যার অপরাধে পটুয়াখালী জেলা কারাগারে সাজা ভোগ করছেন কালা মৃধা ও জাকির মৃধা। তাঁদের বাবা খবির মৃধা স্বরাষ্ট্রসচিবের কাছে বিশেষ ক্ষমার জন্য আবেদন করেছেন। আর তাঁদের সাজা মাফ করে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেছেন ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শাহজাহান মিয়া। আসামিরা প্রতিমন্ত্রীর দূর সম্পর্কের আত্মীয়।

এ বিষয়ে প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য জানতে তাঁর মুঠোফোনে কয়েকবার যোগাযোগের চেষ্টা করে তা বন্ধ পাওয়া যায়।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নথিপত্রে জানা গেছে, পটুয়াখালীর পৌরসভার টাউন কালিকাপুরে স্টেডিয়ামের পশ্চিম পাশে আসামিরা জহির মৃধাকে ধারালো অস্ত্রের আঘাতে গুরুতর আহত করে। পরে তাঁর মৃত্য হয়। ২০০৪ সালে হত্যার অভিযোগ প্রমাণিত হলে কালা মৃধা, জাকির মৃধাসহ আটজনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। আপিল করলে ওই মামলায় আদালত তাঁদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। সাজাপ্রাপ্ত আটজনের মধ্যে শুধু এই দুজনের জন্য রাষ্ট্রপতির অনুকম্পা চাওয়া হয়েছে।

রাষ্ট্রপতির ক্ষমার জন্য তৈরি করা নথিপত্রে বলা হয়েছে, যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামি কালা মৃধা ও জাকির মৃধা প্রায় আট বছর পাঁচ মাস জেল খেটেছেন। তাঁদের বয়স যথাক্রমে ৪৬ ও ৫১।

নিহত জহিরের মা ফিরোজা বেগম প্রথম আলোকে বলেন, ‘পরিকল্পনা করেই আমার ছেলেকে খুন করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী যদি এত বছর পর তাঁর বাবার হত্যাকারীদের বিচার করতে পারেন, তাহলে দিনে-দুপুরে সবার সামনে আমার ছেলেকে যারা হত্যা করল, তাদের বিচার অনুযায়ী সাজা খাটবে না কেন?’ তিনি আরও বলেন, ‘আমার স্বামীর বয়স ৮০ বছর। আমি খুব অসহায়। আমার এই কর্মক্ষম ছেলের খুনিরা যদি ছাড়া পেয়ে যায়, তাহলে আমি আর কার কাছে বিচার চাইব? আল্লাহর ওপর ছেড়ে দেব। তবে সরকারের ওপর থেকে দাবি ছাড়ব না আমি।’

জানতে চাইলে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, রাষ্ট্রপতির যে বিশেষ ক্ষমতা রয়েছে, তা প্রয়োগ করতে হবে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে। যাঁরা ফৌজদারি অপরাধ করেছেন, আদালত যাঁদের সর্বোচ্চ সাজা দিয়েছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে কোনোভাবেই এই বিশেষ ক্ষমা গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি বলেন, অপরাধীদের ক্ষমা করে দেওয়ার জন্য যখন কারা অধিদপ্তর বা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হয়, তখন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে, এ ধরনের আবেদন তাঁরা নথিভুক্ত করবেন কি না বা আমলে নেবেন কি না। কেননা, যখন আবেদন নথিভুক্ত হয়ে যায়, তখন সরকারসহ সবার দায়বদ্ধতা চলে আসে। সে ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির সম্মান রক্ষা করাও যে সরকারের দায়িত্ব, তাও বিবেচনায় রাখতে হবে।