হজে পাঠানোর নামে মানব পাচার, বছরে শতকোটি টাকার বাণিজ্য

598

রোজিনা ইসলাম | মে ২২, ২০১৩

পবিত্র হজে পাঠানোর নামে একশ্রেণীর হজ এজেন্সি সৌদি আরবে মানব পাচারে জড়িয়ে পড়েছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিবছরই হজের ভিসায় মানুষ পাচার করে কয়েক শ কোটি টাকার অবৈধ বাণিজ্য করে এই অসাধু চক্রগুলো।

ধর্ম মন্ত্রণালয় থেকে জানা গেছে, গত বছর হজে গিয়ে এক হাজার ৫১৩ জন বাংলাদেশি আর ফিরে আসেননি। প্রায় প্রতিবছরই এ ধরনের ঘটনায় কোনো না-কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু এর পরও থামানো যাচ্ছে না এ অবৈধ তৎপরতা।

জানতে চাইলে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সচিব কাজী হাবিবুল আউয়াল প্রথম আলোকে বলেন, হজের নামে মানব পাচার বন্ধ করতে ব্যবস্থা নিচ্ছে সরকার। যাঁরা হজে গিয়ে ফেরেননি, তাঁরা ভয়ানক কষ্টে রয়েছেন। পুলিশি আতঙ্কের মধ্যে পালিয়ে জীবন যাপন করছেন তাঁরা। তিনি আরও বলেন, যেসব হজ এজেন্সি এতে জড়িত বলে চিহ্নিত হচ্ছে, তাদের লাইসেন্স বাতিল এবং অভিবাসন ও মানব পাচার রোধ আইনের আওতায় মামলা করা হচ্ছে। এ ছাড়া এজেন্টগুলোর প্রতারণা ঠেকাতে চুক্তিবদ্ধ বাসাবাড়ি ছাড়া অন্য কোনো বাসায় হজযাত্রীদের না রাখার ওপর বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হচ্ছে। ধর্ম মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, হজের সময় মানব পাচার, অসাধুতা, নিম্নমানের সেবাসহ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ এনে ২৮৪টি হজ এজেন্সির তালিকা ধর্ম মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে সৌদি আরব সরকার। অভিযোগের ব্যাপারে তদন্ত করে এজেন্সিগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ধর্ম মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ২৮৪টি এজেন্সির মধ্যে পাঁচটি হজ এজেন্সির বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করবে সরকার। এর মধ্যে এসবি আগা অ্যান্ড কোম্পানির মাধ্যমে হজে যাওয়া ৯২ দশমিক ৯০ শতাংশ দেশে ফিরেননি। এ ছাড়া রব্বানি ওভারসিজ সার্ভিসেসের ৫৫ শতাংশ, ট্রাভেল স্কাই কানেকশনের ৫৫ শতাংশ, সেন্ট্রাল ট্রাভেলসের ৪৬ শতাংশ ও এয়ার কক্স ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের ৪০ শতাংশ হজযাত্রী ফিরে আসেননি। ইতিমধ্যে এই পাঁচ হজ এজেন্সির বিরুদ্ধে মামলা করাসহ ১০ লাখ টাকা জরিমানা, জামানত বাজেয়াপ্ত ও হজ লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে। জানতে চাইলে এয়ার কক্স ইন্টারন্যাশনালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বশির আহমেদ মানব পাচারে জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করে প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের সঙ্গে কথা না বলেই ধর্ম মন্ত্রণালয় আমাদের হজ লাইসেন্স বাতিল করে দিল। আমরা আদালতের সহায়তা নেব।’ ট্রাভেল স্কাই কানেকশনের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ শাহ আলী বলেন, ‘হজে গিয়ে কেউ যদি ফিরে না আসেন, আমাদের কীই-বা করার থাকে। সরকার পুলিশ প্রতিবেদন ও আধাসরকারি পত্র (ডিও লেটার) দেওয়ার পরই আমরা এসব ব্যক্তিদের হজে পাঠিয়েছি।’ তাঁর দাবি, তাঁদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা না করেই এভাবে লাইসেন্স বাতিল, জরিমানা, জামানত বাজেয়াপ্ত করা ঠিক হয়নি।

একই ধরনের অভিযোগে আরও ছয়টি হজ এজেন্সির লাইসেন্স বাতিল, জামানত বাজেয়াপ্ত ও জরিমানা করা হয়েছে। সেগুলোর মধ্যে ট্রাইটন ওভারসিজ লিমিটেডের ১৭ দশমিক ৩৫ শতাংশ, গালফ ট্রাভেলস অ্যান্ড টুরস ১১ দশমিক ২১, নিশান ওভারসিজের ১৩ দশমিক ৭৫, রাহাত ট্রাভেলস অ্যান্ড ট্যুরসের ১২ দশমিক ৬৫, গোল্ড জয় ট্রাভেলস অ্যান্ড ট্যুরসের ১১ দশমিক ৪৭ ও স্বপ্নপুরী ইন্টারন্যাশনালের ১৫ দশমিক ৪৩ শতাংশ হজযাত্রী ফিরে আসেননি। এ ছাড়া মানব পাচারসহ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে ৩৫টি হজ এজেন্সিকে এক লাখ টাকা করে জরিমানা, ৫১টি হজ এজেন্সিকে দুই লাখ টাকা করে, ৩৫টি হজ এজেন্সিকে তিন লাখ টাকা করে, সাতটি এজেন্সিকে পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এ ছাড়া ১৪০টি এজেন্সিকে তিরস্কার করা হয়েছে।

ধর্ম প্রতিমন্ত্রী মো. শাহজাহান মিয়া প্রথম আলোকে বলেন, যারা অন্যায় করেছে, তাদের শাস্তি দেওয়া হয়েছে। এতে বাকিরা সতর্ক হয়ে যাবে। যাদের লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে, তাদের ব্যাপারে হজযাত্রীদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।